মিডল ইস্ট মনিটর
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে বলে সরকারের দাবিকে সমর্থন করার জন্য প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে যে অনুরোধ করা হয়েছিল, তা প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। গত শনিবার ইসরাইলি দৈনিক ইয়েদিওথ আহরোনথ এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
পত্রিকাটির বরাত দিয়ে আনাদোলু জানায়, ২০২৫ সালের জুনে ইরানের ওপর মার্কিন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে দাবি করেছিলেন, তাকে জোরালো করতে ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে এমন একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন জারির জন্য নিরাপত্তা, গোয়েন্দা এবং সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল নেতানিয়াহুর কার্যালয়। ইসরাইল ও ইরানের মধ্যকার ১২ দিনের যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১৩ থেকে ২৪ জুন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইরানের সামরিক অবকাঠামো, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং পরমাণু স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে একটি সামরিক অভিযান চালায় ইসরাইল। একই সাথে তারা ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার এবং পরমাণু বিজ্ঞানীদের হত্যা করে। এর জবাবে ইরান ইসরাইলের সামরিক ও গোয়েন্দা কেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে ৫৫০টিরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং শত শত ড্রোন নিক্ষেপ করেছিল।
পত্রিকাটি জানিয়েছে, ট্রাম্পই প্রথম দাবি করেছিলেন যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করা হয়েছে। পরবর্তীতে নেতানিয়াহু ঘোষণা করেন, ইসরাইলের জন্য দু’টি বড় অস্তিত্বের সঙ্কট ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি পুরোপুরি নির্মূল করা হয়েছে। ইয়েদিওথ আহরোনথ মন্তব্য করেছে, ওই বক্তব্যের পেছনে একটি ছোট সমস্যা ছিল এবং তা হলো তথ্যটি কেবল সত্য ছিল না। কারণ ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ তখনো সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেশাদারিত্ব বজায় রাখেন এমন কোনো গোয়েন্দা কর্মকর্তাই বিশ্বাস করেননি যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে।
পত্রিকাটির মতে, এরপরই স্থাপনাগুলো ধ্বংস হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করতে নিরাপত্তাব্যবস্থা, সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ওপর চাপ বাড়ায় নেতানিয়াহুর কার্যালয়। অথচ স্যাটেলাইট ইমেজ, ড্রোন নজরদারি এবং অন্যান্য গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ইসরাইলের প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে যে, ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্য হলেও তা কোনোভাবেই সম্পূর্ণ বা চূড়ান্ত ধ্বংসের পর্যায়ে পড়ে না। এমন পরিস্থিতিতে একজন শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা এই অনুরোধ করা মূল্যায়নপত্রে সই করতে অস্বীকৃতি জানান এবং তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বলেন, তিনি এটিতে সই করতে পারবেন না। ওই কর্মকর্তার যুক্তি ছিল, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ পরিমাপ নির্ধারণের জন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে পর্যাপ্ত তথ্য নেই এবং একটি ভুল মূল্যায়নকে সমর্থন করলে তাদের পেশাদার নির্ভরযোগ্যতা নষ্ট হবে।
প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানের পরমাণু স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি চূড়ান্ত বা নির্ণায়ক কিছু নয় বলে পেন্টাগনের একটি অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে উঠে এসেছিল, যা প্রথম নিউ ইয়র্ক টাইমস প্রকাশ করে। হোয়াইট হাউজ পেন্টাগনের সেই মূল্যায়নকে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য প্রমাণ খুঁজছিল। আর মার্কিন অবস্থানকে শক্তিশালী করতেই নেতানিয়াহুর কার্যালয় ইসরাইলি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করে। ইসরাইল পরমাণু শক্তি কমিশনের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোশে আদ্রি একটি নথির খসড়া তৈরিতে সাহায্য করতে রাজি হলেও কমিশনের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে অনুমোদনের আহ্বান জানান। পত্রিকাটির বরাত দিয়ে একটি সূত্র জানায়, বিজ্ঞানীরা শুরুতে এই খসড়াকে একটি অত্যন্ত বিকৃত নথি হিসেবে আখ্যা দিয়ে সই করতে অস্বীকৃতি জানান। তারা ফোরদো সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাটি অকেজো হয়ে গেছে এবং ইরানের পরমাণু সক্ষমতা বহু বছর পিছিয়ে গেছে এমন দাবি সংবলিত ভাষা প্রত্যাখ্যান করেন।
পরবর্তীতে একটি আপসতামূলক ভাষায় নথির খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়, মার্কিন হামলায় ফোরদোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে এবং এর সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রটি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সেই সাথে মার্কিন ও ইসরাইলি যৌথ হামলায় ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা বহু বছর পিছিয়ে গেছে বলে মূল্যায়ন করা হয়। ইয়েদিওথ আহরোনথ জানায়, এই নথিতে ট্রাম্পের সেই দাবিকে সরাসরি সমর্থন করা হয়নি যেখানে তিনি বলেছিলেন তিনটি পরমাণু ব্যবস্থাপনাই সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে; তবে সামরিক অভিযানটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লাভ এনেছে এমন বিস্তৃত মূল্যায়নকে সমর্থন করা হয়। পত্রিকাটি আরও যোগ করেছে, ইসরাইলি বিজ্ঞানীরা নথিতে একটি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে জোর দেন, যেখানে বলা হয় যে এই অর্জনগুলো কেবল তখনই স্থায়ী হবে যদি ইরানকে পুনরায় পরমাণু সামগ্রী পাওয়ার সুযোগ থেকে বিরত রাখা যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিজ্ঞানীরা যুক্তি দেন যে ইরানের কাছে এখনো ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বাদে প্রায় ৪৪০ কেজি ফিসাইল উপাদান বা পরমাণু জ্বালানি রয়েছে, যা দিয়ে প্রায় ১১টি পরমাণু অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব। ফলে দেশটির পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে বলে দাবি করার কোনো সুযোগ নেই। এই প্রতিবেদনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত নেতানিয়াহুর কার্যালয় বা ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।



