মুক্তিকামী ছাত্রদের ‘দুর্বৃত্ত’ বলার ন্যারেটিভ বানিয়েছিলেন সালমান

জুলাই আন্দোলনকে অবজ্ঞা করে বক্তব্য দেয়া ধৃষ্টতা : চিফ প্রসিকিউটর

গণ-অভ্যুত্থানের সময় মুক্তিকামী ছাত্রদের ‘দুর্বৃত্ত’ বলার ন্যারেটিভ তৈরি করেছিলেন পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। তিনি নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে মন্ত্রীদেরও কমান্ড করতেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

  • জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
  • মানবতাবিরোধী অপরাধ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় মুক্তিকামী ছাত্রদের ‘দুর্বৃত্ত’ বলার ন্যারেটিভ তৈরি করেছিলেন পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। তিনি নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে মন্ত্রীদেরও কমান্ড করতেন।

গতকাল মঙ্গলবার মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের শুনানির সময় এই অভিযোগ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।

ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন প্যানেলে এই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় ট্রাইব্যুনালের অপর বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন। এদিন সকাল ১০টার পর কারাগার থেকে কড়া পাহারায় প্রিজনভ্যানে করে সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হককে ট্রাইব্যুনালে নিয়ে আসে পুলিশ। আসামিপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাডভোকেট মনসুরুল হক চৌধুরী ও হারুন উর রশিদ।

শুনানিতে প্রসিকিউশন জানায়, জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের সময় আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমান টেলিফোনে আলাপ করেন। সেই ফোনালাপের একপর্যায়ে তারা বলেন, ‘কারফিউ চলাকালেই আন্দোলনকারীদের শেষ করে দিতে হবে।’ এই বক্তব্যের পর দেশে কারফিউ জারি করে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতাকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রসিকিউশন এই উসকানিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মূল উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করে বিচার শুরুর প্রার্থনা জানিয়েছে।

অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী অভিযোগ গঠনের বিরোধিতা করে আসামিদের অব্যাহতির আবেদন করেন। তিনি দাবি করেন, প্রসিকিউশনের শোনানো ফোনালাপটি সালমান এফ রহমান বা আনিসুল হকের নয়। এছাড়া জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সাথে তাদের সম্পৃক্ততা না থাকা এবং ফোনালাপের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমার আসামিদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ (সাফিসিয়েন্ট ডকুমেন্ট) নেই। তাই এই মামলা থেকে আমি আমার আসামিদের অব্যাহতি চাচ্ছি।’

এ সময় আসামিপক্ষ ও প্রসিকিউশন টিমের মধ্যকার সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের প্রশংসা করেন বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘এরকম পরিবেশ থাকলে আমাদেরও কাজ করতে ভালো লাগে।’ মনসুরুল হক চৌধুরী তখন বলেন, ‘মাননীয় ট্রাইব্যুনাল, ওনারা (প্রসিকিউশন টিম) ন্যায়বিচার চাচ্ছেন, আমরাও ন্যায়বিচার চাচ্ছি।’ এরপর আনিসুল হকের পক্ষে কথা বলার জন্য অনুমতি চান আইনজীবী হারুন উর রশিদ। তিনি বলেন, সালমান এফ রহমানের সাথে আনিসুল হকের যে কথোপকথন আদালতে উপস্থাপিত হয়েছে, সেটি ২০২৪ সালের ১৯ জুলাইয়ের। সেখানে আন্দোলন দমনের জন্য দু’টি পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে, যা ‘টু স্কুল অব থট’ হিসেবে আলোচনায় এসেছে। এটি কোনোভাবেই আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার নির্দেশ নয়; বরং ওটা ছিল একটি ‘একাডেমিক ডিসকাশন’ (তাত্ত্বিক আলোচনা)। সুতরাং এখানে আসামির কোনো অপরাধ নেই এবং তিনি আনিসুল হকের নাম মামলা থেকে প্রত্যাহারের আবেদন জানান।

এই পর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের অনুমতি নিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, যারা জনগণের রায় দখল করে গত ১৫ বছর নিপীড়ন চালিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলন ছিল ন্যায়সঙ্গত। আর ওই সময়ের মধ্যে আসামিরা কী করেছেন, সেটাই প্রমাণের বিষয়। তিনি বলেন, সালমান এফ রহমান নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে অনেক কাজ করেছেন। জুলাই আন্দোলন চলাকালে ইন্টারনেট দেখার কোনো দায়িত্বে তিনি ছিলেন না, তবুও তিনি জুনাইদ আহমেদ পলককে বলেছিলেন, ‘তুমি ইন্টারনেট রিস্টোর করবা না।’

চিফ প্রসিকিউটর আরো বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের যেমন সরকারের পক্ষ থেকে ‘দুষ্কৃতকারী’ বলা হয়েছিল, তেমনি জুলাই আন্দোলনের সময় মুক্তিকামী ছাত্রদের ‘দুর্বৃত্ত’ বলার ন্যারেটিভ তৈরি করেছিলেন সালমান এফ রহমান। কিন্তু তাদের দুর্বৃত্ত বলা যাবে না।

সালমান এফ রহমানের কর্মকাণ্ডের আরো তথ্য তুলে ধরে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ফেসবুক কিভাবে ব্লক করা যায়, সেই পরিকল্পনা তাদের ‘রুল অব বিজনেস’-এ পড়ে না। এ সময় ফেসবুক বন্ধ রাখা নিয়ে সালমান ও পলকের কথোপকথন ট্রাইব্যুনালে শোনানো হয়। তাজুল ইসলাম বলেন, ১৫ বছরের দীর্ঘ শাসনকে দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনা ছিল সালমানের। তিনিই এস আলম গ্রুপকে ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোন নেয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন এবং শেয়ারবাজার ধ্বংস করেছিলেন। এ সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয় ফেসবুক ওপেন করা প্রসঙ্গে জয় বলেছিলেন, ‘যখন মা (শেখ হাসিনা) বলবে ইয়েস, তখন ওপেন করে দিবা।’ তখন সালমান পলককে বলেছিলেন, ‘তুমি যখন ইন্টারনেট দিবা তখন কি সার্চ ইঞ্জিন গুগল বন্ধ থাকবে?’ এ ছাড়া সালমান এফ রহমানের অনুরোধে একজন গুম হওয়া ব্যক্তিকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল উল্লেখ করে প্রসিকিউটর বলেন, এতেই বোঝা যায় তার ক্ষমতা কতটুকু ছিল।

এ বিষয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তারা জনগণের জানমাল রক্ষায় কারফিউ দেননি; কারণ আন্দোলনকারীরা ছিলেন নিরস্ত্র মুক্তিকামী। জুলাই সনদ ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের মাধ্যমে এই আন্দোলন জাতির মুক্তির সংগ্রাম হিসেবে বিবেচিত। এই সংগ্রামকে ‘সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন’ বলার ধৃষ্টতা যেন কেউ না দেখায়। এটি মাথায় রেখেই আসামিপক্ষকে যুক্তি দিতে হবে। তিনি আরো বলেন, জুলাই-আগস্টের সংগ্রাম দমনে জারি করা কারফিউ আইনসম্মত ছিল না; এটি ছিল গণহত্যাকে সহজতর করার একটি পরিকল্পনা। কারণ নিরস্ত্র মানুষ ও শিশুদের পাখির মতো মারা হয়েছে। এসবই প্রমাণ করে কারফিউর উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ ছিল না।

তাজুল ইসলাম পরিশেষে বলেন, এনটিএমসি থেকে তাদের ফোনালাপের রেকর্ড উদ্ধার করা হয়েছে। আইনগত কর্তৃত্ব ছাড়াই তারা বিরোধী দল দমনে নজরদারি (সার্ভাইলেন্স) করত। অন্যের জন্য খুঁড়ে রাখা গর্তে তারা নিজেরাই এখন পতিত হয়েছেন। দুই কাঁধের দুই ফেরেশতা যেমন মানুষের আমলনামা লিখে রাখেন, এনটিএমসিও এই অপরাধীদের আমলনামা লিখে রেখেছিল, যা তারা বুঝতেই পারেননি।