স্থানীয় নেতা-সাংবাদিক ‘ম্যানেজে’ ২০ লাখ লেনদেনের অভিযোগ

খুলনা ওয়াসার ৩৩৯ কোটি টাকার প্রকল্প

Printed Edition

খুলনা ব্যুরো

খুলনা ওয়াসার আলোচিত পানি সরবরাহ প্রকল্প ফেজ-২-এর প্রথম প্যাকেজের কাজ শুরুর আগেই অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৩৩৯ কোটি টাকার প্রথম প্যাকেজের চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতা এবং সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করার কথা বলে ২০ লাখ টাকা নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। একই সাথে প্রকল্প পরিচালককে ঘিরেও বিতর্কিত নিয়োগে, বদলি, তদবির ও রাজনৈতিক প্রভাব অভিযোগ সামনে এসেছে।

খুলনা ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৩৩৯ কোটি টাকার এই প্যাকেজে ৩৮ কিলোমিটার ক্লিয়ার ওয়াটার ট্রান্সমিশন লাইন স্থাপনের কাজ যৌথভাবে পেয়েছে চীনের কনস্ট্রাকশন সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো লিমিটেড (সিসিএসইবি) ও আরএফএল প্লাস্টিক লিমিটেড। অভিযোগ অনুযায়ী, চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়ায় তাদের অতিরিক্ত ২০ লাখ টাকা দিতে হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় দুই হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প ফেজ-২ বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে শুরু থেকেই প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়। বদলি-পদায়ন, রাজনৈতিক তদবির, ঘুষ লেনদেন এবং সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে একাধিক ঘটনা ঘটে।

গত ২৪ মে সরকারের প্রশাসন ক্যাডারের যুগ্মসচিব ফিরোজ শাহ খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। পরে তাকে প্রকল্প পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্বও দেয়া হয়। ওয়াসার একাধিক সূত্রের দাবি, প্রকৌশলভিত্তিক এ ধরনের বড় প্রকল্পে সাধারণত জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের দায়িত্ব দেয়া হলেও এবার সেই রীতি অনুসরণ করা হয়নি।

এর আগে নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলামকে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। তাকে ঘিরে সংবাদ প্রকাশ ও বিতর্কের পর গত ২৬ এপ্রিল সেই দায়িত্ব প্রত্যাহার করা হয়। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নেতা রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে গভীর নলকূপ স্থাপন এবং আটরা রিজার্ভয়ার নির্মাণে দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ ছিল। এ ছাড়া তিনি ছিলেন ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা এবং অভিজ্ঞতাহীন। মন্ত্রণালয়ে ঘুষ প্রদান এবং বিএনপির এক নেতার সুপারিশে তিনি নিয়োগ পান বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে ওয়াসায় ক্ষোভ এবং গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হওয়ায় গত ২৬ এপ্রিল তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।

পরে প্রকল্প পরিচালক হওয়ার চেষ্টা করেন বিএনপি-সমর্থিত প্রকৌশলীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্সের (অ্যাব) নেতারাও। এ সময় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপপ্রধান প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জুয়েলকে প্রেষণে ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পাননি।

সূত্রগুলোর দাবি, অতীতে প্রকল্পসংক্রান্ত নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশের অভিজ্ঞতার কারণে এবার রাজনৈতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা এবং সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ওই অর্থ নেয়া হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম বলেন, “আমি ছোট কর্মচারী। এসব বিষয়ে স্যারেরা ভালো জানেন। তাদের সাথে কথা বলেন। না হলে অফিস টাইমের পরে নিরিবিলি সময়ে আসেন, আমি কথা বলিয়ে দেবো।” অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক ফিরোজ শাহর কার্যালয়ে গেলে সাংবাদিক পরিচয় জানার পর তিনি সাক্ষাৎ দেননি। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়েই তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। অন্য দিকে, চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য অতিরিক্ত অর্থ দেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে তাদের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় দুই হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প ফেজ-২ অনুমোদন পায়। প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এর আওতায় খুলনা মহানগরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।