অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
ব্যাংক ও বীমা খাতের মূল্যবৃদ্ধি দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মূলধনে যোগ করেছে চার হাজার ৩১৭ কোটি টাকা, যা পুঁজিবাজারটির মোট মূলধনের দশমিক ৬২ শতাংশ। গত রোববার ছয় লাখ ৯০ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা মূলধন নিয়ে সপ্তাহ শুরু করা ডিএসইর মূলধন বৃহস্পতিবার লেনদেন শেষে দাঁড়ায় ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকায়। পুঁজিবাজারটির সপ্তাহিক বাজার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। আর এভাবে জানুয়ারি মাসের শেষ দুই সপ্তাহে সাড়ে দশ হারায় কোটি টাকার বেশি মূলধন যোগ হলো ডিএসইর। আগের সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধন বৃদ্ধি পেয়েছিল ছয় হাজার ৩২৪ কোটি টাকা।
গত সপ্তাহের শুরুতে বাজারে কিছুটা নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও শেষদিকে এসে তা কাটিয়ে ওঠে। এ সময় বাজারে লেনদেনের পাশাপািশ সূচকেও বড় ধরনের উন্নতি ঘটে, যা দীর্ঘদিন মন্দায় আটকে থাকা বাজারটির হারানো মূলধন ফিরে পেতে সাহায্য করে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা গতি ফিরে পাওয়া বাজারের এ আচরণে বড় কোনো খারাপ পরিস্থিতি তৈরি না হলে ব্যত্যয় ঘটবে না। কারণ খুব ধীরে হলেও মন্দা বাজারে সাইড লাইনে থাকা বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ কম বেশি সক্রিয় হয়ে উঠছেন। বাজার আচরণ ভালো থাকলে নতুন করে যুক্ত হওয়া বিনিয়োগকারীর সংখ্যা দ্রুত আরো বাড়তে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে যেটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো নির্বাচন নিয়ে সহিংসতার মতো কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে তা বাজারে প্রভাব ফেলবে।
বিদায়ী সপ্তাহে (২৫-২৯ জানু) ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫৪ দশমিক ৭১ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। রোববার ৫ হাজার ৯৯ দশমিক ৬১ পয়েন্ট থেকে সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার সপ্তাহ শেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ১৫৪ দশমিক ৩২ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ২৩ দশমিক ৬৬ ও ৯ দশমিক ০৭ পয়েন্ট। সপ্তাহের প্রথম দু’টি কর্মদিবসে বাজার কিছুটা নেতিবাচক প্রবণতার শিকার হলেও তৃতীয় ও চতুর্থ দিন বাজর সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ঘটে, যা একদিকে লেনদেনে গতি ফিরিয়ে আনে অন্য দিকে বাজার মূলধনেও যোগ করে বড় অঙ্ক। এভাবে বাজারে এক দিকে মূল্যবৃদ্ধি অন্য দিকে যৌক্তিক সংশোধনের যে স্বাভাবিকতা তা বজায় থাকলে পুঁজিবাজার ধীরে ধীরে টেকসই হয়ে উঠেবে।
ডিএসইর সপ্তাহিক বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, ধারাবাহিক দরপতনের যে প্রবণতা তা থেকে কম বেশি স্থিতিশীলতার দিকে ফিরতে শুরু করেছে পুঁজিবাজার। গত দুই সপ্তাহের বাজার আচরণ তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। ব্যাংক ও বীমার মতো দুই প্রধান খাতে আবার বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। অন্যান্য খাতগুলোতে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোও গত ক’দিন ধরে ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ স্থান দখলে নিচ্ছে যা দীর্ঘ সময় ধরে দেখা যায়নি। সামনের দিনগুলোতে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা খাতে ফেলে আসা অর্থবছরের লভ্যাংশ ঘোষণার দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই এ দুই খাতে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকবে। এ তিনটি খাতের মধ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও অন্য দুই খাতেরই ভালো সম্ভাবনা দেখছেন ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা।
বিদায়ী সপ্তাহে সূচকের উন্নতির ফলে মূলধনের পাশাপাশি বৃদ্ধি পেয়েছে বাজারের মূল্য-আয় অনুপাত (পিই) ও। সপ্তাহ শেষে ডিএসই পিই দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৩৩, যা আাগের সপ্তাহ অপেক্ষা ১ দশমিক ১৬ শতাংশ বেশি। আগের সপ্তাহে বাজারটির পিই ছিল ৯ দশমিক ২২।
গত সপ্তাহে ডিএসইর মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা দশমিক ৬৩ শতাংশ বেশি। আগের সপ্তাহে বাজারটির মোট লেনদেন ছিল ২ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। সে হিসাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বাজারটির গড় লেনদেনও। আগের সপ্তাহের ৫৭৫ কোটি টাকা থেকে দশমিক ৬৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে গত সপ্তাহে ডিএসইর গড় লেনদেন দাঁড়ায় ৫৭৯ কোটি টাকা।
ডিএসইতে গত সপ্তাহে লেনদেনের শীর্ষস্থানটি দখলে রাখে ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। সপ্তাহটিতে প্রতিদিন গড়ে কোম্পানিটির শেয়ার বেচাকেনা হয়েছে ১৮ কোটি ৬২ লাখ টাকার, যা বাজারটির মোট লেনদেনের ৩ দশমিক ২১ শতাংশ। গড়ে ১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন করে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল প্রকৌশল খাতের ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস। সপ্তাহিক লেনদেনে কোম্পানিটির অবদান ছিল ২ দশমিক ৪০ শতাংশ। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ওরিয়ন ইনফিউশন, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, ফাইন ফুডস, ব্র্যাক ব্যাংক, শাহজিবাজার পাওয়ার, সোনালী পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস ও রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স।
গত সপ্তাহে ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে উঠে আসে মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। ৩০ দশমিক ৯২ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে জিএসপি ফিন্যান্স, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ইসলামী ব্যাংক, আরামিট সিমেন্ট, জিবিবি পাওয়ার, এশিয়া প্যাসিফিক জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, শ্যামপুর সুগার মিলস ও বে লিজিং।
এ সময় ডিএসইতে দরপতনে শীর্ষ কোম্পানি ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের এফএএস ফিন্যান্স। কোম্পানিটি গত সপ্তাহে ২৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ দর হারায়। একই হারে দর হারানো একই খাতের কোম্পানি পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স ছিল এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি। দরপতনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ফারইস্ট ফিন্যান্স, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশন্স, রানার অটোমোবাইলস, এনার্জি প্যাক পাওয়ার জেনারেশন, ভিএফএস থ্রেড লি., ইন্টারন্যাশনসাল লিজিং, প্রিমিয়ার লিজিং ও জি কিউ বলপেন ইন্ডাস্ট্রিজ।



