নাইকো মামলায় ঐতিহাসিক জয়

টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র বিস্ফোরণে বাংলাদেশ ক্ষতিপূরণ পাবে ৫১৬ কোটি টাকা

Printed Edition
নাইকো মামলায় ঐতিহাসিক জয়
নাইকো মামলায় ঐতিহাসিক জয়

বিশেষ সংবাদদাতা

টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে ২০০৫ সালে সংঘটিত ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের আইনি লড়াইয়ের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করেছে বাংলাদেশ। ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল- ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটস (আইসিএসআইডি)- কানাডিয়ান জ্বালানি কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেস লিমিটেডকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংস্থা পেট্রোবাংলাকে চার কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা) অনুযায়ী এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫১৬ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণ নয়; বরং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তির ইতিহাসে বাংলাদেশের জন্য একটি দৃষ্টান্তমূলক আইনি সাফল্য।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম গতকাল বৃহস্পতিবার রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আইসিএসআইডির রায়ে টেংরাটিলার বিস্ফোরণের জন্য নাইকোর অবহেলা, ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক শিল্পমান লঙ্ঘনকেই সরাসরি দায়ী করা হয়েছে।

কী বলেছে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল

আইসিএসআইডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, গ্যাসকূপ খনন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পেট্রোলিয়াম শিল্পের স্বীকৃত নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রস্তুতি না থাকা এবং অদক্ষ তত্ত্বাবধানের কারণেই টেংরাটিলায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। ফলে আইনি ও নৈতিক- দুই বিবেচনাতেই নাইকোকে দায়ী করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের দায় নির্ধারণে আইসিএসআইডির এই অবস্থান ভবিষ্যতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি শক্তিশালী নজির হিসেবে কাজ করবে।

ক্ষতিপূরণের কাঠামো

রায়ে ক্ষতিপূরণকে দুটি প্রধান খাতে ভাগ করা হয়েছে- বিস্ফোরণে প্রায় ৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুড়ে যাওয়ার ক্ষতিপূরণ বাবদ চার কোটি মার্কিন ডলার এবং পরিবেশগত ক্ষতি, অবকাঠামো ধ্বংস এবং অন্যান্য প্রত্যক্ষ ক্ষতির জন্য অতিরিক্ত ২০ লাখ মার্কিন ডলার।

আইনজীবীরা বলছেন, পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টি স্বীকৃতি দেয়ায় রায়টি আন্তর্জাতিক পরিবেশ আইন ও বিনিয়োগ আইনের সংযোগস্থলেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র : পটভূমি

সুনামগঞ্জ জেলার ছাতকে অবস্থিত টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রটি ১৯৫৯ সালে আবিষ্কৃত হয়। কূপ খননের মাধ্যমে প্রায় ১,০৯০ থেকে ১,৯৭৫ মিটার গভীরে ৯টি গ্যাস স্তর শনাক্ত করা হয়। এখানকার গ্যাস ছাতক সিমেন্ট কারখানা ও পেপার মিলসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হতো।

দীর্ঘদিন গ্যাস উত্তোলনের ফলে কূপে পানি উঠে আসায় একপর্যায়ে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০০৩ সালে নতুন করে অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কাজের জন্য গ্যাসক্ষেত্রটি কানাডিয়ান কোম্পানি নাইকোর কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও জনজীবনের বিপর্যয়

নাইকোর খননকাজ শুরুর পর ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন টেংরাটিলায় পরপর দুটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে বিপুল পরিমাণ গ্যাস পুড়ে যায়, ধ্বংস হয় কূপ এলাকা ও আশপাশের অবকাঠামো, ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি। মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই আজও ওই বিপর্যয়ের ক্ষত বহন করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

দুই দশকের আইনি লড়াই

বিস্ফোরণের পর পেট্রোবাংলা নাইকোর কাছে প্রায় ৭৪৬ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে। নাইকো তা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ২০০৭ সালে বাংলাদেশের নিম্ন আদালতে মামলা করা হয়। একই সাথে ফেনী গ্যাসক্ষেত্রে নাইকোর গ্যাস বিল পরিশোধ স্থগিত করা হয়।

হাইকোর্ট বাংলাদেশে থাকা নাইকোর সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও তাদের সাথে করা চুক্তি বাতিলের নির্দেশ দেয়। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টেও বাংলাদেশের পক্ষেই রায় আসে।

এর পর ২০১০ সালে নাইকো আইসিএসআইডিতে দুটি মামলা করে- একটি গ্যাস বিল আটকে রাখার অভিযোগে, অন্যটি ক্ষতিপূরণ দাবিতে। ২০১৪ সালের এক রায়ে আইসিএসআইডি পেট্রোবাংলাকে ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের পাওনা বিল পরিশোধের নির্দেশ দেয়।

এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশ ২০১৬ সালে নাইকোর বিরুদ্ধে প্রায় ১১৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবিতে মামলা করে। সেই মামলার চূড়ান্ত রায়েই এবার বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত হলো।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও জ্বালানি নিরাপত্তা

টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রটি ছাতক পূর্ব ও ছাতক পশ্চিম (টেংরাটিলা) নামে দুটি অংশে বিভক্ত। বিস্ফোরণে ছাতক পশ্চিম অংশের একটি স্তরের গ্যাস পুড়ে গেলেও অন্যান্য স্তর এবং ছাতক পূর্ব অংশের গ্যাস মজুদ এখনো অক্ষত রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ গ্যাসক্ষেত্রে সম্ভাব্য দুই থেকে পাঁচ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদ থাকতে পারে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, টেংরাটিলায় নতুন কূপ খননের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। আইসিএসআইডির পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার পর আইনগত পরামর্শ নিয়ে দ্রুত পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বার্তা

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, টেংরাটিলা মামলার এই রায় শুধু একটি ক্ষতিপূরণ আদায়ের ঘটনা নয়। এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও আইনের শাসনের একটি শক্ত দৃষ্টান্ত।

দীর্ঘ আইনি সংগ্রামের পর এই রায় প্রমাণ করেছে- বাংলাদেশ কেবল দেশীয় আদালতেই নয়, আন্তর্জাতিক আইনি পরিসরেও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নিতে সক্ষম। একই সাথে এটি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তাও বহন করে: বাংলাদেশে বিনিয়োগ মানেই দায়িত্বশীলতা, নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ এবং আইনের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য।