ইরানের পরমাণু কেন্দ্রে মার্কিন বিমান হামলা

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition
  • ট্রাম্পের স্বাক্ষরের মূল্য নেই : খামেনি
  • ইরানের কিশমি দ্বীপে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি

পরমাণু চুক্তি নিয়ে টানাপড়েনের মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যে পুরোদমে শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক সঙ্ঘাত। ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নির্মাণাধীন দারখোভিন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র লক্ষ্য করে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। লিবিয়ার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে চিনের পেমেন্ট সিস্টেমে যুক্ত করার সিদ্ধান্তের পর বৈশ্বিক অর্থনীতির এই পরিবর্তনের আবহে মধ্যপ্রাচ্যের এই সামরিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা যোগ করল।

ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থা গতকাল রোববার এক বিবৃতিতে জানায়, আন্তর্জাতিক সুরক্ষাকবচের অধীনে থাকা একটি শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া ওই বিবৃতিতে হামলার ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট বিবরণ না দিলেও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটিয়ে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে গত জুন মাসে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু সেই শান্তি প্রচেষ্টাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে এই ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা শুরু হলো। মার্কিন হামলার পর বসে নেই তেহরানও; তারা বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক দেশে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত ঘাঁটি ও স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা জোরালো আঘাত হেনেছে বলে দাবি করেছে।

এ দিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম আইআরআইবি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশটির ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আহভাজ শহরের আকাশে একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে। তবে ইরানের এই চাঞ্চল্যকর দাবির বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

অন্য দিকে রোববার ভোরে ইরানের ওপর মার্কিন বাহিনীর নতুন দফা হামলায় দেশটির কিশমি দ্বীপে অন্তত ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। স্থানীয় সময় ভোর ৩টা ৩৮ মিনিট থেকে ৩টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে এই হামলায় দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়, যা কাঁপিয়ে তোলে দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর নগরী বন্দর আব্বাসকেও। মেহর নিউজ ও তাসনিম নিউজের তথ্য অনুযায়ী, ভোর আনুমানিক ৩টা ৪০ মিনিটে কিশমি দ্বীপের কাছের একটি স্থাপনায় এই হামলা চালানো হয় এবং এটি মূলত মার্কিন সামরিক বাহিনীরই আক্রমণ ছিল। তবে এই হামলায় ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক বিবৃতিতে জানায়, দেশের প্রধান সেনাপতির (প্রেসিডেন্ট) সরাসরি নির্দেশে শনিবার পূর্বদেশীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা থেকে ইরানের ওপর এই নতুন বিমান হামলা শুরু করা হয়। সেন্টকমের দাবি, হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হুমকি দেয়ার সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে এবং জর্দানে মার্কিন সামরিক সদস্যদের ওপর হামলা চালানো আইআরজিসি বাহিনীকে দ্রুত শাস্তি দিতেই এই আকস্মিক হামলা। উল্লেখ্য, গত শুক্রবার জর্ডানে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় বেশ কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত এবং একজন নিখোঁজ হন।

এই হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমঝোতা স্মারক বারবার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই। তিনি কড়া ভাষায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বারবার চুক্তি লঙ্ঘন আবারও প্রমাণ করেছে যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরের কোনো মূল্য বা বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। খামেনেই সতর্ক করে বলেন, মার্কিন শত্রুপক্ষ যেভাবে সঙ্ঘাতের তীব্রতা বাড়াতে চাইছে, তার জন্য তাদের আরো ভারী মূল্য দিতে হবে এবং আরো বেশি অপমানিত হতে হবে। ইরানি জনগণ এবং প্রতিরোধ ফ্রন্ট তাদের জন্য অবিস্মরণীয় শিক্ষা প্রস্তুত করে রেখেছে। এই ঐতিহাসিক ও সঙ্কটময় মুহূর্তে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও এক্সে লিখেছেন, পবিত্র ঐক্য বজায় রাখা এবং সব ধরনের বিভেদ এড়ানোই আমাদের বিজয়ের চাবিকাঠি। এর আগে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করায় তেহরানও এই সমঝোতা স্মারকের সমস্ত প্রতিশ্রুতি আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছে।