গ্রিনল্যান্ডে অপদস্ত আমেরিকা

Printed Edition

আমেরিকাকে আবার গ্রেট বানানোর অঙ্গীকার করে জিতে আসা ট্রাম্প গদিতে বসার ৬০-৭০ দিনের মধ্যে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি শিখরে উঠার সোপানে নয়, আমেরিকাকে পাতালের সুড়ঙ্গে ঠেলে নামাচ্ছেন। এটি যে ঘটবে তার লক্ষণ স্পষ্ট ছিল ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে। আমলে নেননি ভোটাররা। ট্রাম্পের অপরাধ-প্রবণতা, স্বেচ্ছাচারিতা, নির্জলা অসত্য কথন, পররাষ্ট্র সম্পর্কে একতরফা সিদ্ধান্ত নেয়া, আমেরিকার বৈশ্বিক প্রভাব ক্ষুণœ করে এমন সব কর্মকাণ্ড, এমনকি ক্যাপিটাল হিলে হামলার মতো কর্মকাণ্ডে মদদ দেয়া; স্বাস্থ্যসেবা, জলবায়ুর মতো বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যায় অবৈজ্ঞানিক মানসিকতা লালন ইত্যাদি ভালোভাবে বোঝা গিয়েছিল। এমন মানসিকতার একজন ব্যক্তি বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তিকে সামনে এগিয়ে নেয়ার কতটা যোগ্য আমেরিকানরা ভাবেননি। ফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে...

আমেরিকার মুখে চুনকালি মাখাল ট্রাম্পের সরকার। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সফর প্রত্যাখ্যান করার মতো অচিন্তনীয় ঘটনা ঘটেছে গ্রিনল্যান্ডে। গ্রিনল্যান্ড উত্তর মেরু সাগরে অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম দ্বীপ। প্রায় ২১ লাখ ৭০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিশাল গ্রিনল্যান্ড কোনো স্বাধীন দেশ নয়। ডেনমার্কের একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত এলাকা। জনসংখ্যা মোটে ৫৭ হাজার হলেও এখানে নির্বাচিত সরকার আছে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা আছে। আছে পাঁচ হাজার বছরের জনসমাজ যা গড়ে উঠেছে আদিবাসী ইনুইটস জনজাতির সাথে উত্তর মেরু অঞ্চল ও ইউরোপীয় বাসিন্দাদের সমন্বয়ে। সদ্যই সেখানে সাধারণ নির্বাচন হয়েছে। গত ১১ মার্চের নির্বাচনে বিরোধী গণতান্ত্রিক দল বিজয়ী হয়েছে। এ মুহূর্তে মার্কিন আগ্রাসনের মুখে বিক্ষুব্ধ গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক। অথচ ডেনমার্ক মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো সামরিক জোটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

মূলত আমেরিকার সেকেন্ড লেডি ঊষাই বলেছিলেন, শিশুদের নিয়ে গ্রিনল্যান্ড যাবেন। সেখানে সেøজটানা কুকুরের দৌড় প্রতিযোগিতা উপভোগ করবেন। এটি গ্রিনল্যান্ডের সমৃদ্ধ আদিবাসী সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী অংশ। কিন্তু সমস্যা হলো- ঊষার সফরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার বেশ আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেন, গ্রিনল্যান্ড তার দরকার। আমেরিকার নিরাপত্তার জন্য এটি তিনি কিনে নেবেন। এ ঘোষণার পর গত জানুয়ারি মাসে নিজের ছেলে ট্রাম্প জুনিয়রকে গ্রিনল্যান্ডে পাঠান ট্রাম্প। পুত্র যদিও রাজনীতির সাথে সফরের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেন কিন্তু সেটি যে উদ্দেশ্যমূলক সফর ছিল তা বোঝা গেছে তার কর্মকাণ্ড থেকে। ছেলের মোবাইল ফোনে ভিডিওকল দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডারদের সমাবেশে ভাষণ দেন। বলেন, গ্রিনল্যান্ডকে আবার গ্রেট বানাবে আমেরিকা? উদ্বিগ্ন ডেনিস সরকার তখনই ট্রাম্পের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে জানায়, ওটা বিক্রির জন্য নয়। মার্কিন অনেক রাজনীতিকও ভ্যান্স দম্পতির সফরের বিরোধিতা করেন।

প্রতিবাদের মুখে ট্রাম্প প্রশাসন সুর পাল্টে গ্রিনল্যান্ড যেকোনো উপায়ে দখলের কথা বলছে। বলছে, বিশ্বের নিরাপত্তায় এটি দরকার। উভয়ের মধ্যে সম্পর্কে নিম্নচাপ ছিলই। এর মধ্যে ঊষার সফরের ঘোষণা এলে অনেকে সেটিকে রীতিমতো উসকানি হিসেবে দেখেন। তার পরও গ্রিনল্যান্ডের পর্যটন বিভাগ ঊষাকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু সফরের সময় ঘনিয়ে এলে শেষ মুহূর্তে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও স্ত্রীর সঙ্গী হবেন বলে জানান। সফরসঙ্গী হবেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল ওয়াল্টজ এবং খনিজসম্পদ মন্ত্রী ক্রিস রাইট। এতে করে সফরটি আর নিছক পারিবারিক বিনোদন ভ্রমণ নয়; বরং আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় বিষয়ে পরিণত হয়। গ্রিনল্যান্ড সরকার শঙ্কা বোধ করে এবং মার্কিন পর্যটকদের স্বাগত জানাতে অস্বীকৃতি জানায়। গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুকের পর্যটন সংস্থা টুপিলাক ট্রাভেল জানায়, ‘সফরের যে অন্তর্নিহিত লক্ষ্য আমরা তা সমর্থন করি না এবং এ প্রচারণার অংশ হতে চাই না। জনমনেও মার্কিনবিরোধী ক্ষোভ তীব্র। শতকরা ৮৫ শতাংশ মানুষ চান না আমেরিকার রাজ্য হতে। যে ৬ শতাংশ মানুষ আমেরিকার সাথে যোগ দিতে চান তারাও কেউ মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট দম্পতিকে স্বাগত জানাতে যাননি। এতেই শেষ নয়, দেশের দ্বিতীয় শীর্ষ ব্যক্তি ও সেকেন্ড লেডির মান বাঁচাতে কর্মকর্তারা নাকি মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে অনুরোধ করেন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। কেউ সাড়া দেননি। এর আগে পৃথিবীর কোনো দেশে আর কোনো মার্কিন নেতার এমন বেইজ্জত হওয়ার রেকর্ড সম্ভবত নেই।

জানা দরকার গ্রিনল্যান্ডে আগে থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আছে। ছোটখাটো ঘাঁটি আছে। গত শুক্রবার ২৮ মার্চ ভ্যান্স দম্পতি গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিম উপকূলের সেই ঘাঁটি পরিদর্শন করেন। ডেনিস সরকার এ সফরে কোনো অভব্যতা করেনি, তবে কড়া সমালোচনা করেছে।

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মিজ ফ্রেডেরিকসেন বলেছেন, ‘গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের ওপর এ ধরনের চাপ আমরা মেনে নেবো না। এটি অগ্রহণযোগ্য ও চরম আগ্রাসী।’

মূলত ভ্যান্স দম্পতির সফরের পুরো ব্যাপারটিই যে পূর্বপরিকল্পিত আগ্রাসী উদ্যোগ- তা স্পষ্ট।

গ্রিনল্যান্ডের বড় অংশ চির বরফের রাজ্য মেরু বলয়ের (আর্কটিক সার্কেল) ভেতরে পড়েছে। কিন্তু বিশ্বের উষ্ণায়নে সেখানে এখন বরফ গলছে। যেখানে পুরু বরফ স্তরের কারণে সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে নতুন বাণিজ্যিক নৌপথ এবং অমিত খনিজ অনুসন্ধানের সুযোগ সৃষ্টির। এটি হয়ে উঠতে যাচ্ছে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল।

আর্কটিক অঞ্চলের খনিজসম্পদ ও সম্ভাব্য নতুন বাণিজ্য পথই যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের কারণ। বিশেষ করে চীনকে ঠেকাতে মরিয়া ট্রাম্প প্রশাসন। জেডি ভ্যান্স গ্রিনল্যান্ডের পিটুফিকে মার্কিন স্পেস ফোর্স ঘাঁটি দেখতে গিয়ে সেনাদের উদ্দেশে বলেন, ‘যদি যুক্তরাষ্ট্র আর্কটিকের নেতৃত্ব না নেয়, তবে চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিগুলো জায়গাটা দখল করবে।’

মজার ব্যাপার হলো- আমেরিকা, নির্দিষ্ট করে বললে, ট্রাম্প প্রশাসন কোনো ক্ষেত্রে প্রতিযোগী সহ্য করতে রাজি নয়। সেটি যেমন বৈশ্বিক প্রভাববলয় বিস্তারে-তেমনি শিল্প-বাণিজ্য-বিজ্ঞান প্রযুক্তি সর্বক্ষেত্রে।

বছরের পর বছর বিশ্ব জেনেছে, আমেরিকা মুক্তবাজার চায়, অবাধ প্রতিযোগিতা চায়, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার চায়। কিন্তু ট্রাম্প ০.২ প্রশাসনের যুগে বিষয়টি পুরোপুরি ঘুরে গেছে। এখন তারা নতুন করে মধ্যযুগীয় সামন্ততন্ত্রের প্রবর্তন করেছেন। ট্রাম্প যেমন কানাডা, গ্রিনল্যান্ড, পানামা, ফিলিস্তিনের গাজা দখলের কথা বলছেন, গায়ের জোরে ইউক্রেনকে তার মূল্যবান খনিজসম্পদ আমেরিকার হাতে তুলে দিতে বাধ্য করছেন শুধু তাতেই দেশটির সামন্ত প্রভুসুলভ মনোভাব বোঝা সম্ভব তা কিন্তু নয়; বরং তারা তাদের গণতান্ত্রিক আদর্শের মুখোশটা এখন খুলে ফেলেছেন। রীতিমতো নীতিনির্ধারণী বক্তৃতায়ও বিশ্বে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ্যে ঘোষণা করছেন এবং যারা নিচে ছিল তারা যেন উঠে আসতে না পারে সে জন্য সব প্রতিযোগীকে দাবিয়ে রাখার আগ্রাসী পরিকল্পনা ঘোষণা করছেন।

আগ্রহীরা পড়ে অথবা ইউটিউবে শুনে নিতে পারেন সম্প্রতি আমেরিকার টেক সাম্রাজ্যের রাজধানী সিলিকন ভ্যালিতে টেকজায়ান্টদের সামিটে জেডির ভাষণ। জেডি বলেন, প্রযুক্তি খাতে মার্কিন শ্রেষ্ঠত্ব কাউকে খর্ব করতে দেয়া হবে না।

অনেকে জানেন না, গ্রিনল্যান্ড দখলের এ উদ্যোগের পেছনে কলকাঠি নাড়ছেন ইলন মাস্কের মতো আরেক বিলিয়নিয়ার টেকজায়ান্ট পিটার থিয়েল, যিনি পেপ্যালের মালিক এবং জেডির পুরনো পৃষ্ঠপোষক। পিটার গ্রিনল্যান্ডের সব সম্পদ কব্জা করতে চান ট্রাম্প জেডির সরকারের সহায়তায়। ভ্যান্স দম্পতির বেইজ্জতির পর এখন দেখার বিষয়, আমেরিকা সামরিক পদক্ষেপ নেয় কি না। পরিস্থিতি কিন্তু কোনো দিক থেকে দেশটির অনুকূলে নয়।

কারণ আমেরিকা ডুবছে

আমেরিকাকে আবার গ্রেট বানানোর অঙ্গীকার করে জিতে আসা ট্রাম্প গদিতে বসার ৬০-৭০ দিনের মধ্যে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি শিখরে উঠার সোপানে নয়, আমেরিকাকে পাতালের সুড়ঙ্গে ঠেলে নামাচ্ছেন। এটি যে ঘটবে তার লক্ষণ স্পষ্ট ছিল ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে। আমলে নেননি ভোটাররা।

ট্রাম্পের অপরাধ-প্রবণতা, স্বেচ্ছাচারিতা, নির্জলা অসত্য কথন, পররাষ্ট্র সম্পর্কে একতরফা সিদ্ধান্ত নেয়া, আমেরিকার বৈশ্বিক প্রভাব ক্ষুণœ করে এমন সব কর্মকাণ্ড, এমনকি ক্যাপিটাল হিলে হামলার মতো কর্মকাণ্ডে মদদ দেয়া; স্বাস্থ্যসেবা, জলবায়ুর মতো বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যায় অবৈজ্ঞানিক মানসিকতা লালন ইত্যাদি ভালোভাবে বোঝা গিয়েছিল। এমন মানসিকতার একজন ব্যক্তি বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তিকে সামনে এগিয়ে নেয়ার কতটা যোগ্য আমেরিকানরা ভাবেননি। ফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে।

দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে ফিরে ক্ষমতার তাপে হিতাহিতের বোধ হারিয়েছেন, পেশিকে নৈতিকতার উৎস ভাবছেন এবং সেটি মেনে নিতে সবাইকে বাধ্য করতে চাইছেন।

ট্রাম্পের নেতৃত্বে শুধু যে দেশের অর্থনীতিতে ধস নামছে তা নয়, বৈশ্বিক সব দিক থেকে ডুবতে বসেছে এই একক পরাশক্তি।

[email protected]