আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রথমবারের বিদেশে থাকা বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট প্রদানের সুযোগ করে দিয়েছে ড. মোহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনে প্রবাসীরা তাদের ভোটাধিকার পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে কিভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করবেন তার সব কার্যক্রমই ইতোমধ্যে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন থেকে সম্পন্ন করা হয়েছে।
সেই লক্ষ্য সামনে রেখে আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রবাসীদের ভোট প্রদান কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে। তবে কোনো কোনো দেশে অবস্থান করা প্রবাসী ভোটাররা বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের পাঠানো এ সংক্রান্ত মোবাইল ম্যাসেজ পেলেও এখনো পোস্টাল ব্যালট পেপার তারা হাতে পাননি বলে সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে।
এ দিকে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, মালয়েশিয়া, ওমান, আবুধাবি, জর্দান, লেবানন, জাপান, ইউরোপের দেশ ইতালি, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, লন্ডনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস এবং হাইকমিশনের পক্ষ থেকে গণভোটের পক্ষে হ্যাঁ ভোট প্রদানের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে প্রচারণা চলছে জোরেশোরেই। পাশাপাশি পোস্টাল ভোট দেয়ার তথ্য ফেসবুকে শেয়ার করার বিষয়ে ভোটারদেরকে সর্তক করা হচ্ছে।
ইতালির রোমের বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে গত শুক্রবার গণভোট-২০২৬, ‘দেশকে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুলে দিন, হ্যাঁতে সিল দিন’ সেøাগান দিয়ে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেয়া সংক্রান্ত বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের উদ্ধৃতি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, পোস্টাল ভোটের গোপনীয়তা রক্ষা করা আপনার অধিকার ও দায়িত্ব। ভোট দেয়ার তথ্য বা ব্যালটের ছবি/ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। যে কোনো ধরনের পোস্ট বা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন। নতুবা আপনার ঘওউ কার্ড ব্লক ছাড়াও অন্যান্য আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একইভাবে কুয়েতের বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে গণভোট ২০২৬, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন বিষয়ে বলা হয়, দেশের চাবি আপনার হাতে। আপনি কি এমন বাংলাদেশ চান, যেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) গঠনে সরকারি দল ও বিরোধী দল একত্রে কাজ করবে। সরকারি দল ইচ্ছে মতো সংবিধান সংশোধন করতে পারবে না। সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান চালু হবে। বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটিগুলোর সভাপতি নির্বাচিত হবেন। যত মেয়াদই হোক, কেউ সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব পর্যায়ক্রমে বাড়বে। দেশের বিচার ব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করবে। দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকে রাষ্ট্রপতি ইচ্ছেমতো ক্ষমা করতে পারবেন না। ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে এর সব কিছু পাবেন, ‘না’ ভোট দিলে কিছুই পাবেন না। মনে রাখবেন পরিবর্তনের চাবি এবার আপনারই হাতে। গণভোট বিষয়ে জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ঢাকার পাঠানো প্রচারণাগুলো দেশে দেশে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা প্রতিদিন প্রচারণা চালাচ্ছেন এবং যারা এ বিষয়ে আপডেট তথ্য জানতে চাচ্ছেন তাদেরকে দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় উত্তর দিয়ে জানানো হচ্ছে। শুধু কুয়েত অথবা ইউরোপের দেশ ইতালি নয়, মধ্যপ্রাচ্যে, ইউরোপ আমেরিকাসহ পৃথিবীর যেসব দেশে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং কনসাল জেনারেল অফিস রয়েছে সেখান থেকেই প্রবাসীদের গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেয়ার জন্য প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।
জাপানের টোকিও এর বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আপনি কিভাবে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রদান করবেন সে ব্যাপারে দূতাবাসের নিজস্ব ওয়েবসাইটে বিস্তারিত উল্লেখ করে একটি ভিডিও বার্তা দিয়ে প্রচারণা শুরু হয়েছে। এই ভিডিও দেখে ১০ জন ব্যক্তি তাদের মন্তব্য প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে মুন্সী ইফতেখারুল ইসলাম নামের একজন মন্তব্য করেন, আমি দেশে বেড়াতে যাওয়ার কারণে আমার পোস্টাল ব্যালট রিসিভ করতে পারিনি। যেটা রিটার্ন গিয়েছে। এখন কিভাবে পেতে পারি। এর বিপরীতে দূতাবাস উত্তরে জানিয়েছে, ‘আমার পোস্টাল ব্যালট পেতে সাহায্য করার জন্য অগ্রিম ধন্যবাদ।’ তবে আনিস মাহমুদ নামের একজন এ বিষয়ে মন্তব্য করেন, ‘দেশটা ধ্বংস করে ফেলেছে এই সরকার!! কেউ ভোট দিতে যাবেন না। এই মব ভায়োলেন্স সরকারকে বিচারের আওতায় আনার জন্য সবাই ‘না’ ভোট দিন। তবে অপর এক পোস্টে দূতাবাস থেকে বলা হয়েছে, পরিবর্তনের জন্য হ্যাঁ বলুন।
গতকাল শনিবার মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে আরিফ হোসেন নামের একজন ভোটার নয়া দিগন্তকে পোস্টাল ব্যালট সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তরে বলেন, আমি নির্বাচন কমিশন থেকে এখন পর্যন্ত কোনো মোবাইল ম্যাসেজ পাইনি। তবে আমার এ সংক্রান্ত একটি এ্যাপস আছে। সেখান থেকে আমি আমার পোস্টাল ব্যালটটি এখন কোথায় আছে সেটি আমি জানতে পারছি। পোস্টাল ব্যালটে ভোট প্রদানের নিয়মকানুন সম্পর্কে তিনি বলেন, একটা খামের ভেতর আরো দুটি খাম থাকবে। ব্যালট পেপার, হ্যাঁ এবং না ভোট আর নির্দেশনা। ভোট দেয়ার পর আমার পাশে (পোস লাসু) পোস্ট অফিস আছে। সেটি কর্মকর্তার হাতে দিয়ে আসবো। তিনি আমাকে রিসিভ কপি দেবেন কি না তা বলতে পারবো না। কারণ আমি এখনো ভোট দিতে যাইনি। তবে সিঙ্গাপুরে গিয়ে বাংলাদেশীদের কাছে আমি জেনেছি, আমাদের পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে শুরু হতে যাওয়া ভোট প্রদান কার্যক্রমটি একটু জটিলই। এর আগে গত শুক্রবার রাতে কুয়েত থেকে দোহারের বাসিন্দা মো: জালাল উদ্দিন নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, আমি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন থেকে মোবাইলে ভোট প্রদান সংক্রান্ত একটি ম্যাসেজ পেয়েছি। তবে আমি এখনো পোস্টাল ব্যালট পেপার হাতে পাইনি। ম্যাসেজে বলা হয়েছে, ‘অভিনন্দন’। আপনার পোস্টাল ব্যালটের আবেদন অনুমোদন হয়েছে। পোস্টাল ব্যালট পেপারে স্ট্যাটাস দেখুন। তিনি বলেন, কুয়েতে মোট ৩৫ হাজার ভোটার পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট প্রদান করবেন বলে শুনেছি। এর জন্য কুয়েতের ২০টি পোস্ট অফিস থেকে বস্তায় ভরে ভোটারদের কাছে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হবে। এর মধ্যে শুনছি অনেকে পাইছে। কিন্তু আমারটা এখনো পাইনি।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে মোট সাত লাখ ৭২ হাজার ৫৪২ জন প্রবাসী বাংলাদেশী নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে মালয়েশিয়ায় ৮৪ হাজার ২৯২ জন, সৌদি আরবে দুই লাখ ৩৯ হাজার ১৮৬ জন, কাতারে ৭৬ হাজার ১০৯ জন এবং ওমানে ৫৬ হাজার ২০৭ জন। তাদের পাঠানো ব্যালট ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের দিন বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত গ্রহণ করা হবে।



