ফের ধারাবাহিক দরপতনের দিকে যাচ্ছে পুঁজিবাজার

বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ শুরু

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

নতুন করে দরপতনের শিকার হচ্ছে দেশের পুঁজিবাজার। সোমবারের পর গতকাল মঙ্গলবারও বড় ধরনের সূচক হারিয়েছে দেশের দুই পুঁজিবাজার। গতকালের বাজার আচরণে বাজার নিয়ে নতুন করে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিনিয়োগকারীরা। তারা মনে করছেন, আবারো ধারাবাহিক দরপতনের দিকেই যাচ্ছে পুঁজিবাজার। বাজারে সৃষ্ট নানা গুজব থেকে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তারা। সামনের দিনগুলোতে বিশেষ করে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে এমন সমীকরণ থেকেই বাজারের এ নিম্নমুখী আচরণ।

গতকাল লেনদেনের শুরু থেকেই বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে বাজারগুলো। একপর্যায়ে এ বিক্রয়চাপ সামলে নিলেও পরবর্তীতে এ চাপ আরো তীব্র আকার ধারণ করে। এতে দিনশেষে উভয় পুঁজিবাজারেই সব সূচকের বড় ধরনের অবনতি ঘটে। প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৪৬ দশমিক ৬৩ পয়েন্ট অবনতি ঘটে। ৫ হাজার ৪২৩ দশমিক ৬৪ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি নেমে আসে ৫ হাজার ৩৭৭ পয়েন্টে। ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ যথাক্রমে ২৩ দশমিক ৮৪ ও ১০ দশমিক ৩৫ পয়েন্ট হারায়।

দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক এদিন ১০৭ দশমিক ৪১ পয়েন্ট হারায়। সিএসইর অন্য দুই সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্সের অবনতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ১৩৪ দশমিক ৫৯ ও ৫৮ দশমিক ২৩ পয়েন্ট।

সূচকের অবনতি ঘটলেও গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেন বৃদ্ধি পায়। ডিএসই ৭৮৭ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিন অপেক্ষা ৫১ কোটি টাকা বেশি। সোমবার লেনদেন ছিল ৭৩৬ কোটি টাকা।

এ দিকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং আস্থা নিশ্চিত করার দৃঢ় বার্তা নিয়ে ৬ অক্টোবর শুরু হয়েছে বিশ^ বিনিয়োগকারী সপ্তাহ। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) উদ্যোগে বরাবরের মতো শুরু হয়েছে ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৫’। ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব সিকিউরিটিজ কমিশনের (আইয়োসকো) সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ ২০১৭ সাল থেকে এই সপ্তাহটি উদযাপন করে আসছে। বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য অবলম্বনে বিএসইসি এবার ‘প্রতারণা ও কেলেঙ্কারি প্রতিরোধ’ (ফ্রড অ্যান্ড স্কেম প্রিভেনশন) কে এর প্রতিপাদ্য হিসেবে বেছে নিয়েছে।

গতকাল বিএসইসি থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানা যায়। বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সভাপতিত্বে উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল মো: আসাদুজ্জামান। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ জিসান হায়দার এবং আর্থিক খাত বিশ্লেষক ইওয়ার সাইদ।

প্রধান অতিথি মো: আসাদুজ্জামান পুঁজিবাজারের জন্য একটি যুগোপযোগী ও আধুনিক আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩’ এবং ‘সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯’ একীভূত করে একটি নতুন আইন আনা সময়ের দাবি।’ আর্থিক জালিয়াতি রোধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে তিনি দুদক ও বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটসহ (বিএফআইইউ) অন্যান্য সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীতার কথা উল্লেখ করেন।

স্বাগত বক্তব্যে বিএসইসি কমিশনার মো: আলী আকবর জোর দিয়ে বলেন, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা কেবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা বিএসইসির দায়িত্ব নয়, এটি একটি নৈতিক কর্তব্য। জালিয়াতি প্রতিরোধে সচেতনতার পাশাপাশি জবাবদিহির সংস্কৃতিও তৈরি করতে হবে। তিনি জানান, বিনিয়োগকারীদের শিক্ষিত ও সক্ষম করতে কমিশন নানামুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

সভাপতির বক্তব্যে বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ জানান, কমিশন ইতোমধ্যেই উল্লিখিত দু’টি আইন একীভূত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। অতীতের অনিয়ম ও জালিয়াতি সংক্রান্ত তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে সাতটি মামলায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

প্রতারণা রোধে প্রযুক্তির ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে চেয়ারম্যান জানান, প্রতারণা প্রতিরোধে বিএসইসি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে। সব ব্রোকারকে এখন সমন্বিত ও অপরিবর্তনযোগ্য ব্যাক অফিস সফটওয়ারের আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি মিউচুয়াল ফান্ড খাতের সুশাসন এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানির জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেও কার্যক্রম চলছে। তিনি দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে বিনিয়োগের সাথে যুক্ত করার জন্য একটি আধুনিক, নিরাপদ ও প্রতারণামুক্ত শেয়ারবাজার গড়ে তোলার দৃঢ প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্য বক্তা পুঁজিবাজারে জালিয়াতির ধরন, প্রতিরোধে বিএসইসির পদক্ষেপ এবং এনফোর্সমেন্ট বা শাস্তিমূলক কার্যক্রমকে কঠোর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

গতকাল ডিএসইর বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, একমাত্র বীমা ছাড়া অন্য খাতগুলো ব্যাপক দরপতনের শিকার ছিল। সিমেন্ট, সিরামিকস, আইটি, জ¦ালানি খাদ্য খাতে শতভাগ কোম্পানির দরপতন হয়। ব্যাংক-নন ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রকৌশল ও টেক্সটাইল খাতে দরপতন ঘটেছে প্রায় ৮০ শতাংশ কোম্পানির। বাকি খাতগুলোতে মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় ছিল হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি। এদিন বীমা খাতে মূল্যবৃদ্ধি ঘটে প্রায় শতভাগ কোম্পানির। ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনে অংশ নেয়া ৪০১টি কোম্পানি ও ফান্ডের মধ্যে দর বাড়ে মাত্র ৮৫টির। বিপরীতে দরপতনের শিকার ছিল ২৮২টি। অপরিবর্তিত ছিল ৩৪টির দর। অপর দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেন হওয়া ২১৭টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ৬৩টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় ১৩৬টি। অপরিবর্তিত ছিল ১৮টি শেয়ারের।