প্রাথমিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পাঠদান বন্ধ ঘোষণা

শিক্ষকদের মিছিলে হামলার প্রতিবাদ; আন্দোলনকে অযৌক্তিক বলছেন উপদেষ্টা

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনে থাকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর হামলা ও গুলি চালানোর প্রতিবাদে আজ রোববার থেকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য পাঠদান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষক নেতারা। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় শিক্ষক সংগঠনের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা দেয়া হয়েছে। নেতারা জানান, প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের ১০তম গ্রেডসহ তিন দফা দাবি আদায় এবং শাহবাগে পুলিশি হামলার প্রতিবাদে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি (পাঠদান বন্ধ) পালন করা হবে। একই সাথে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দেয়া হয়েছে। অন্য দিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের একবারে ১৩তম থেকে ১০তম গ্রেডে আসার কোনো যুক্তিই নেই। তাদের এ মুহূর্তে আন্দোলনে যাওয়াটাও অযৌক্তিক বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা: বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার।

গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি শামসুদ্দিন মাসুদ বলেন, ‘দাবি বাস্তবায়ন ও পুলিশের হামলার প্রতিবাদে রোববার থেকে শহীদ মিনারে অবস্থানের পাশাপাশি সারা দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পূর্ণদিবস কর্মবিরতি চলবে’। এর আগে তিনি বলেন, ‘পুলিশ শিক্ষকদের ওপর রাবার বুলেট ছুড়েছে। আমাদের অনেক শিক্ষক গুলিবিদ্ধ। সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেলের আঘাতে শতাধিক শিক্ষক আহত হয়েছেন।’ অনেকের হাতে পায়ে, পেটে রাবার বুলেট ঢুকেছে। পিজি হাসপাতালে ভর্তি একজনের কপালের পাশে রাবার বুলেট বিদ্ধ। সাংবাদিক ভাইয়েরা আপনারা দয়া করে ঢাকা মেডিক্যালে আসুন। আমাদের অনেক শিক্ষক ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি।’

এর আগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত অবস্থান কর্মসূচি থেকে ‘কলম বিসর্জন কর্মসূচি’ পালনের ঘোষণা দেন শিক্ষকরা। এরপরই তিন দফা দাবিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শাহবাগের দিকে যাত্রা করেন প্রাথমিকের এ শিক্ষকরা। পরে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। তারা জানান, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের পর শিক্ষকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থান নেন। সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ফলে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

শিক্ষকদের দাবিগুলো হলো : দশম গ্রেড প্রদান : সহকারী শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি দশম গ্রেডে বেতন-ভাতা প্রদান। উচ্চতর গ্রেড সমস্যার সমাধান: ১০ বছর ও ১৬ বছর চাকরি পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড প্রদানসংক্রান্ত জটিলতা ও সমস্যার স্থায়ী সমাধান। শতভাগ পদোন্নতি : সহকারী শিক্ষকদের জন্য শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতির নিশ্চয়তা প্রদান।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৭টি এবং এসব বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক সংখ্যা প্রায় তিন লাখ ৮৪ হাজার। গত ২৪ এপ্রিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রধান শিক্ষকদের বেতন ১১তম থেকে ১০তম গ্রেডে এবং ১৩তম গ্রেডে থাকা শিক্ষকদের বেতন ১২তম গ্রেডে উন্নীত করার উদ্যোগ নেয়। তবে এ পদক্ষেপে সহকারী শিক্ষকরা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

এ দিকে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের আরেক অংশ ‘প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদ’-এর ব্যানারে একাদশ গ্রেডে বেতন, উচ্চতর গ্রেডের জটিলতা নিরসন ও শতভাগ পদোন্নতির দাবিতে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সরকারকে সময়সীমা দিয়েছে। তাদের তিন দফা দাবি মানা না হলে ২৩ ও ২৪ নভেম্বর অর্ধদিবস কর্মবিরতি, ২৫ ও ২৬ নভেম্বর পূর্ণদিবস কর্মবিরতি এবং ২৭ নভেম্বর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। এ ছাড়া ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে তারা পরীক্ষা বর্জন ও আমরণ অনশন কর্মসূচি শুরু করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন।

শিক্ষকদের আন্দোলন অযৌক্তিক -উপদেষ্টা

অবশ্য সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের একবারে ১৩তম থেকে ১০তম গ্রেডে আসার কোনো যুক্তিই নেই। তাদের এ মুহূর্তে আন্দোলনে যাওয়াটাও অযৌক্তিক বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা: বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার। গতকাল শনিবার খুলনা জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বেশির ভাগ শিক্ষক মনে করেন ১০তম গ্রেডের এ দাবি যৌক্তিক নয়। প্রধান শিক্ষকদের ১০তম গ্রেডে উন্নীত করা হয়েছে। সাধারণ শিক্ষকদের সংখ্যা অনেক বেশি, এটি সম্ভব নয়। একবারে ১৩তম থেকে ১০তম গ্রেডে আসার কোনো যুক্তিই নেই। তারা যেন ১১তম গ্রেড পেতে পারেন সেজন্য আমরা কাজ করছি। তাদের এ মুহূর্তে আন্দোলনে যাওয়াও যৌক্তিক নয়। উপদেষ্টা আরো বলেন, পদোন্নতির বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বলেছে সরকারের নীতি শতভাগ না দিয়ে ৮০ পার্সেন্ট দেয়া, ২০ পার্সেন্ট নতুন নিয়োগের জন্য রাখা হয়েছে। এর আগে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগতমান উন্নয়নে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অংশীজনের ভূমিকা বিষয়ে মতবিনিময়সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় মন্ত্রণালয়, বিভাগীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় শিক্ষকদের নৈতিক, ব্যবহারিক, সহশিক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়।