নিজস্ব প্রতিবেদক
বিশ্বের পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কৌশলগত ও যুক্তিনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন কৌশলগত অক্ষ তৈরি হচ্ছে। লোহিত সাগরের মোচা বন্দর, সৌদি আরব, পাকিস্তান বিমানবাহিনী ও তুরস্ককে ঘিরে পরিবর্তিত সমীকরণের পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালী এবং ইউরেশিয়াকে কেন্দ্র করে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা চলছে। এসব পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান ও স্বার্থ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
গতকাল শনিবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের মওলানা আকরম খাঁ হলে সেন্টার ফর মিলিটারি হিস্ট্রির আয়োজনে এক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন।
সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশের সামরিক সম্পর্কের প্রসঙ্গে এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ভুল তথ্য ও পররাষ্ট্রনীতির কিছু ত্রুটির কারণে সৌদি আরবের সাথে সামরিক সম্পর্ক জোরদারের একটি সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। একই সাথে ভারতের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জটিল বাস্তবতাও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের ব্যবহারের জন্য ১৩টি সংযোগ বা ট্রানজিট দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রামগড় সংযোগ ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অন্যতম বড় ও স্পর্শকাতর পরিবর্তন। অন্য দিকে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা, মস্কো সফর এবং মিসরকে আহ্বান জানানোর মতো ঘটনাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার ভূরাজনীতিতে পরিবর্তন ঘটছে। কিন্তু বিশ্বমঞ্চের এসব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও জোটে বাংলাদেশকে ডাকা হচ্ছে না। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়াকে কেন্দ্র করে তিনটি প্রধান শক্তিকেন্দ্র গড়ে উঠছে। ইউক্রেন যুদ্ধ মূলত ইউরেশিয়ায় ভূকৌশলগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই। এ প্রসঙ্গে তিনি জবিগনিউ ব্রজেজিনস্কির ‘দ্য গ্র্যান্ড চেসবোর্ড’ এবং হ্যালফোর্ড ম্যাকিন্ডারের ভূকৌশলগত তত্ত্বের কথা উল্লেখ করেন। ইউরেশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র প্রভাব হারালে ইউরোপেও দেশটির অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দীর্ঘ সময় পর দেশে একটি ড্রোন কারখানা তৈরি করা হচ্ছে। সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে টিকে থাকতে হলে কারিগরি শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইরানের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা নিতে পারে।
রোহিঙ্গা সঙ্কটকে বাংলাদেশের অন্যতম বড় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমস্যা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বর্তমানে ১৩ থেকে ১৪ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এ বিপুল জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
জুলাই-আগস্টের অভিজ্ঞতার আলোকে প্রণীত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া না হলে জাতি বড় ধরনের সঙ্কটে পড়তে পারে। জাতীয় প্রতিরক্ষা কেবল সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল নয়; সাধারণ জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের স্বার্থে দাঁড়ালেই প্রকৃত জাতীয় প্রতিরক্ষা গড়ে ওঠে। তিনি আরো বলেন, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে হবে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, মক্কা চুক্তিকে শুধু সামরিক জোট হিসেবে দেখলে এর বহুমাত্রিক কৌশলগত গুরুত্ব অনুধাবন করা যাবে না। এ চুক্তি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, সাইবার ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা, জ্বালানি, শ্রমবাজার, বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, তুরস্কের বাইরাক্তার ড্রোন, পাকিস্তানের জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান এবং সৌদি আরবের আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির সাথে সহযোগিতা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। সৌদি আরব বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
অধ্যাপক লতিফ মাসুম বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ‘ডিটারেন্স’ বা নিবৃত্তি একটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা। শক্তিশালী কৌশলগত জোটের সাথে যুক্ত থাকলে সম্ভাব্য বহিঃশত্রুর আগ্রাসনের ঝুঁঁকি কমানো সম্ভব।
তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে মক্কা চুক্তিতে যোগদানের ঝুঁঁকি ও সম্ভাবনা গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। চুক্তির প্রতিটি শর্ত ও ধারা জাতীয় সংসদ, রাজনৈতিক দল, বিশেষজ্ঞ ও জনগণের আলোচনার মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে বিশিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) ফজলে এলাহি আকবর বলেন, দেশের স্বার্থে মক্কা প্যাক্ট থেকে বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন থাকা ঠিক হবে না। জাতীয় স্বার্থ ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে এ বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে নেতিবাচক বক্তব্য ও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এসব বক্তব্যে বিভ্রান্ত না হয়ে এর বাস্তবতা ও সম্ভাব্য সুফল নিয়ে জনগণকে সচেতন করা প্রয়োজন।
মক্কা প্যাক্টের আর্টিকেল ৫ নিয়ে আশঙ্কার বিষয়ে তিনি বলেন, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ হলে বাংলাদেশ এতে জড়িয়ে পড়বে-এমন আশঙ্কাকে ভিত্তি করে চুক্তি থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। ন্যাটোর ইতিহাস উল্লেখ করে তিনি বলেন, আর্টিকেল ৫ নিয়ে যে ধরনের ভয় দেখানো হচ্ছে, বাস্তবতার সাথে তার মিল রয়েছে কি না, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কমোডর জসিমউদ্দীন বলেন, মক্কা চুক্তির আওতায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের সামুদ্রিক ও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা সম্ভব। বাংলাদেশ সরাসরি সদস্য না হয়ে পর্যবেক্ষক হিসেবেও যুক্ত হয়ে সৌদি আরবসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে সহযোগিতা বাড়াতে পারে।
সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার বলেন, মুসলিম বিশ্বের অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করা উচিত। মক্কা চুক্তি বিষয়ে আরো আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। এর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা জোরদারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক রুহুল আমিন বলেন, কোনো চুক্তি না থাকার চেয়ে চুক্তি থাকা উত্তম। একটি রাষ্ট্র ছোট না বড়, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়; রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিই তাকে বড় করে।
সিনিয়র অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী বলেন, বিশ্বজুড়ে ইসলামোফোবিয়া রয়েছে। বাংলাদেশকে মক্কা চুক্তিতে নেয়া হবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তথ্য ফাঁস হলে বাংলাদেশকে চুক্তিতে নেয়া হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক লে. কর্নেল (অব:) ড. এস কে আকরাম আলী বলেন, ১৯৯৬ সাল থেকে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। মক্কা চুক্তির নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এতে ক্ষতির চেয়ে উপকার বেশি।
ইঞ্জিনিয়ার রেজাউল করিমের সঞ্চালনায় সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন প্রফেসর মিজানুর রহমান, তরুণ সঙ্ঘের সভাপতি ফজলুল হক, সাবেক সচিব আবুল হোসেন, নুরুল হুদা চৌধুরী, জসিম উদ্দিন, জুলাই আন্দোলনের সংগঠন খোমেনি এহসান, ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক ও প্রফেসর তারেক ফজল।



