সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী

নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন অসম্ভব

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং সর্বোপরি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার ওপরই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন রেখেছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসন শুরুর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

গতকাল বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের নবম দিনে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট একটি অত্যন্ত জটিল, সংবেদনশীল ও বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক সমস্যা। রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান জাতিগত সঙ্ঘাত ও যুদ্ধাবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী জোরপূর্বক বা অনিরাপদ পরিবেশে কাউকে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়। তবে রাখাইনে স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির মধ্যে কার্যকর সংলাপ প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

তিনি জানান, বাংলাদেশে বর্তমানে আশ্রয় নেয়া বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ৮৯ হাজার ২১৩ জন। ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে জাতিগত সহিংসতার মুখে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় এবং পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন দফায় নতুন করে অনুপ্রবেশ ঘটেছে।

ড. খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ সরকার এ পর্যন্ত ছয় ধাপে মোট ৮ লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জন রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমার সরকারের কাছে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৫০৩ জনের তথ্য যাচাই সম্পন্ন হয়েছে এবং ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮৬ জনকে ‘পূর্বে মিয়ানমারে বসবাসকারী ব্যক্তি’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে মিয়ানমার। তিনি বলেন, উপযুক্ত পরিস্থিতি তৈরি হলেই নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসন শুরু করা সরকারের লক্ষ্য।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল রোহিঙ্গা সঙ্কটকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুনরায় অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ইস্যু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এ লক্ষ্যে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। ২০২৫ সালে তার বাংলাদেশ সফর এবং কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের মাধ্যমে সঙ্কটটি নতুন করে বৈশ্বিক মনোযোগ পায়।

এ ছাড়া ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট কক্সবাজারে দেশী-বিদেশী অংশীজনদের নিয়ে বিশেষ স্টেকহোল্ডার সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সাত দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে ৩০ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ সদর দফতরে দিনব্যাপী বিশেষ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়, যা রোহিঙ্গা সঙ্কটকে আবারো বৈশ্বিক মানবিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

তিনি আরো জানান, বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিষয়ে সর্বসম্মতিক্রমে একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। ওআইসি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথভাবে উত্থাপিত ওই প্রস্তাবে ১০৫টি দেশসহ উত্থাপক হিসেবে যুক্ত হয় এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনে কার্যকর বৈশ্বিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানানো হয়। একই সাথে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলায় বাংলাদেশ সমর্থন অব্যাহত রেখেছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোহিঙ্গাদের তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের কার্যক্রমও পরিচালনা করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এবং ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির (আইআরসি) সহযোগিতায় এ পর্যন্ত আইওএমের মাধ্যমে ৫ হাজার ৭১২ জন এবং আইআরসির মাধ্যমে ৬৯৭ জন রোহিঙ্গাকে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে পুনর্বাসন করা হয়েছে।

শুধু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত আইওএমের মাধ্যমে ১৯১ জনকে কানাডা, যুক্তরাজ্য ও নিউজিল্যান্ডে এবং আইআরসির মাধ্যমে ১৪৫ জনকে অস্ট্রেলিয়ায় পুনর্বাসন করা হয়েছে।

তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন স্থায়ী সমাধান নয়; রোহিঙ্গাদের নিজভূমি রাখাইনে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনই এই সঙ্কটের একমাত্র কার্যকর সমাধান।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিশেষ টাস্কফোর্স নিয়মিত যৌথ অভিযান পরিচালনা করছে। পাশাপাশি ক্যাম্প ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ‘বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক (এফডিএমএন) ক্যাম্পসমূহের নিরাপত্তা সংক্রান্ত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরস’ প্রণয়ন করা হয়েছে।

এসব পদক্ষেপের ফলে ক্যাম্পে খুন, গুম, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে খুনের ঘটনা ছিল ৬৬টি, ২০২৪ সালে তা কমে ৪৯টিতে এবং ২০২৫ সালে ৩৫টিতে নেমে আসে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে এ সংখ্যা আরো কমে মাত্র ৬টিতে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যচুক্তি বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখবে:

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সই হওয়া অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) চুক্তি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, জ্বালানিনিরাপত্তা জোরদার এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। গাজীপুর-৫ আসনের সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলনের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ আশাবাদের কথা জানান।

রফতানি বাজার সম্প্রসারণে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্প্রতি অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন তুলা ব্যবহার করে উৎপাদিত তৈরী পোশাকের ক্ষেত্রে শূন্য শুল্কসুবিধা নিশ্চিত হয়েছে। চুক্তিটি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, জ্বালানিনিরাপত্তা জোরদার এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।’

খলিলুর রহমান বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে সিইপিএ বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে; মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের সাথে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে। একই সাথে জিসিসি (উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা), মারকোসুর (দক্ষিণ আমেরিকার বাণিজ্যিক জোট) এবং অন্যান্য আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্মের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রফতানি বাজার সম্প্রসারণ, রফতানি বহুমুখীকরণ, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কর্মসংস্থানমুখী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাথে আরো ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করা এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতির গতিশীলতা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে সরকার অর্থনৈতিক কূটনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করছে। এ লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবদিনের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উপস্থিতি, অর্থনৈতিক কূটনীতি ও প্রবাসী বাংলাদেশীদের সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কূটনৈতিক মিশন পরিচালনা করে আসছে। বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতি এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির আলোকে বিদেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবকাঠামোকে আরো শক্তিশালী, কার্যকর ও ব্যয়সাশ্রয়ী করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।