- টিকা দেয়া শিখতে বিদেশ যাবেন ৪ জন
- ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালট্যান্সিতে ১৯.৭৩ লাখ টাকা
পরামর্শক ও বিদেশে প্রশিক্ষণ ছাড়া বাংলাদেশের কোনো উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা এবং বাস্তবায়ন হয় না। অবাক করা বিষয় হলো- জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধে পথকুকুরে গণটিকা প্রদানে ৪২ কোটি ৬৫ লাখ টাকার প্রকল্পে পরামর্শক খাতেই যাবে ১৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। আর টিকা দেয়া শিখতে বিদেশ যাবেন চারজন। তাদের পেছনে ব্যয় হবে ২৮ লাখ টাকা। তবে প্রকল্পের ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালট্যান্সিতে ফি ধরা হয়েছে ২ শতাংশ বা ১৯ লাখ ৭৩ হাজার টাকা।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনার তথ্য থেকে জানা গেছে, জলাতঙ্ক একটি মারাত্মক ভাইরাস জনিত রোগ, যা প্রধানত কুকুরের মাধ্যমে প্রাণীসহ মানুষের মধ্যে ছড়ায়। এ রোগের কোনো চিকিৎসা নেই। আক্রান্ত প্রাণী ও মানুষের শতভাগ মৃত্যু হয়ে থাকে। প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ জলাতঙ্ক রোগে মারা যায়। আর বাংলাদেশে প্রতি বছর কুকুর, বিড়াল, শিয়ালের কামড় বা আঁচড়ের শিকার হয় প্রায় ২.৫ লাখ মানুষ, যাদের মধ্যে বেশির ভাগই শিশু। গবাদি প্রাণীর ক্ষেত্রে কুকুর বা বিড়ালের কামড়ের শিকারের সঠিক পরিসংখ্যান নাই। তবে ২০২৩ সালে এক হাজার ২৩২টি গবাদিপশু এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধে বৈশ্বিক কর্মকৌশলের অংশ হিসেবে বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে এই অবহেলিত রোগটির বিরুদ্ধে জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচি পরিচালনা করেছে।
জানা গেছে, দেশের ১৯টি জেলায় আনুমানিক পাঁচ লাখ কুকুরকে টিকা প্রদান করা হয়েছে। ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে জলাতঙ্কমুক্ত করার লক্ষ্যে ২০১০ সাল থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে জাতীয় জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ এবং নির্মূল কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করছে। দেশের সব জেলায় মোট ৬৭টি জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলকেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত রোগীর আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা বিনামূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অর্জনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০৩০ সালের মধ্যে কুকুরের কামড়জনিত জলাতঙ্কমুক্ত বিশ্ব হবে এ অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করছে। আর এ জন্য জুলাই ২০২৫ থেকে জুন ২০২৮ মেয়াদে ৪২ কোটি ৬৪ লাখ ৪৯ হাজার টাকা খরচে পথকুকুরের গণটিকা দেয়ার মাধ্যমে জলাতঙ্ক রোগ বিস্তার রোধ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদফতর ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে।
প্রকল্পটি কেন নেয়া হচ্ছে : রাজধানীতে পথকুকুরে গণটিকা প্রদানের মাধ্যমে জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধ করে প্রাণিস্বাস্থ্যসহ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা করা, বন্ধ্যাত্বকরণের মাধ্যমে পথকুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্য উন্নয়ন, জনগণের মধ্যে প্রাণীর প্রতি মানবিকতাবোধ এবং জলাতঙ্ক রোগ ও তার প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করাই এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য।
২০৩০ সালের মধ্যে জলাতঙ্কমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কুকুরের গণটিকাদান কার্যক্রমকে তরান্বিত করতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সমন্বয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর প্রাথমিকভাবে ঢাকা সিটি করপোরেশনে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব করছে।
প্রকল্পের প্রধান প্রধান কার্যক্রম : প্রকল্পের অধীন ১০ জনকে অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ প্রদান, চারজনকে বৈদেশিক প্রশিক্ষণ প্রদান, সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজন, প্রাণী টিকা ও ওষুধ ক্রয়, পথকুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, নিউটারকৃত কুকুরের খাদ্য ক্রয় ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ। এছাড়া ডেক্সটপ কম্পিউটার (এক্সেসরিজসহ) তিনটি, ল্যাপটপ একটি, মাল্টিমিডিয়া, প্রজেক্টর স্ক্রিন ও অন্যান্য এক্সেসরিজ একটি, ফটেকপি মেশিন একটি, আইপিএস একটি, এয়ারকুলার ছয়টি এবং আসবাবপত্র ক্রয় করা হবে।
খরচের মধ্যে : আউট সোর্সিং জনবল ২০ জনের বেতন খাতে এক কোটি ৯৮ লাখ ৮৯ হাজার টাকা, অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণে ১০ জনের জন্য খরচ এক লাখ ১৬ হাজার টাকা, বৈদেশিক প্রশিক্ষণে চারজনের জন্য ২৮ লাখ টাকা, টিভি ফিলার ও ভিডিও ডকুমেন্টরিতে ২০ লাখ টাকা, ভেটেরিনারি সার্জনের সম্মানী (কুকুরের নিউটার করার কাজে) ৬৫ হাজার জনের জন্য তিন কোটি ২৫ লাখ টাকা, সেমিনার ও কর্মশালায় ১৯ লাখ ৪৭ হাজার টাকা, কার হায়ারিং একটির জন্য ৪৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা, প্রাণিটিকা ও ওষুধ পৌনে তিন কোটি টাকা, নিউটারকৃত কুকুরের খাদ্য এক কোটি ৩০ লাখ টাকা, অ্যাওয়ারনেস ক্যামপেইন ৪০টির জন্য ৭৪ লাখ টাকা,
পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে জানা গেছে, প্রকল্পটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অননুমোদিত নতুন প্রকল্প তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের আওতায় নির্মিতব্য সিভিএইচের পেট ক্লিনিকের আর্কিটেকচারাল ডিজাইন ডিপিপিতে সংযুক্ত করা হয়নি। ক্রয় পরিকল্পনায় সেবা-৩ হিসেবে ইঞ্জিয়ারিং কনসালট্যান্সি না ধরে ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালট্যান্সি ফি ২ শতাংশ ধরা হয়েছে, যা সংশোধন করা প্রয়োজন। কুকুরের নিউটার ও চিকিৎসাবিষয়ক প্রশিক্ষণ খাতে ১০ জন করে প্রশিক্ষণার্থী নিয়ে একটি প্রশিক্ষণ ও প্রতি কর্মশালায় ১০০ জন করে তিনটি সেমিনার আয়োজনের সংস্থান রাখা হয়েছে। কিন্তু ওই প্রশিক্ষণ বা সেমিনার/কর্মশালায় প্রশিক্ষণার্থী বা অংশগ্রহণকারী হিসেবে কারা উপস্থিত থাকবেন তা পরিশিষ্টে উল্লেখ করা হয়নি। প্রকল্পে চারজন ভেটেরিনারি সার্জন অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনজন ভেটেরিনারি সার্জন পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরেও কুকুরকে নিউটার করার কাজে নিয়োজিত ভেটেরিনারি সার্জনদের সম্মানী হিসেবে ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা সংস্থান রাখা হয়েছে। ওই অর্থ রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ দিকে সিভিএইচ পেট ক্লিনিকের জন্য সার্জারি ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ক্রয়ের জন্য দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা সংস্থান রাখা হলেও তার স্পেসিফিকেশন এবং বাজারদর যাচাই সংক্রান্ত কোনো তথ্য ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি তা ক্রয় পরিকল্পনাতেও সংযুক্ত করা হয়নি। প্রকল্পের আওতায় দুইটি মোবাইল পেট ক্লিনিকের জন্য এক কোটি ৬০ লাখ টাকার সংস্থান রাখা হলেও তার স্পেসিফিকেশন ডিপিপিতে পরিশিষ্ট আকারে সংযুক্ত করা হয়নি।
পরিকল্পনা কমিশনের অতিরিক্ত সচিব যা বললেন : পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. অঞ্জন কুমার দেব রায়ের সভাপতিত্বে মূল্যায়ন কমিটির সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়। প্রকল্পের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে ড. অঞ্জন কুমার দেব রায় নয়া দিগন্তকে বলেন, অনুমোদন হয়ে গেছে, হ্যাঁ অনুমোদন হয়ে গেছে। পরামর্শক খাতে ১৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কনসালট্যান্ট বলতে ওইটার মধ্যে ওদেরকে যে টিকা দেয়ানো। কুকুরকে ধরে আনা ও টেককেয়ার করা করতে হবে। সেটার জন্যও কিন্তু ওখানে ফান্ড আছে। এটা নট অনলি তার কনসালট্যান্সি। বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
চারজনের বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যাপারে ড. অঞ্জন কুমার বলেন, এই ব্যাপারে তাদের ট্রেইন করা হবে। প্রশিক্ষণ নেয়ার পর দে উইল কাম ব্যাক। সো দ্যাট দে ক্যান ইউজ দেয়ার নলেজ। আর ওরা তো ডিপার্টমেন্টেই থাকবে অফিসার হিসেবে। তারা সার্ভিস দিতে পারবে। তারা ওখান থেকে টেকনোলজিটা জেনে আসবে। তারা থাইল্যান্ডে ট্রেনিং নেবে মনে হয়।



