বরাদ্দ অপর্যাপ্ত, শিক্ষাকে বিনিয়োগ ভাবার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ নিয়ে প্রতিক্রিয়া

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition

  • শুধু বরাদ্দ নয়, প্রয়োজন কার্যকর ব্যয় ও জবাবদিহিতা
  • বাজেটে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চরম উপেক্ষা হতাশাজনক

জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির ঘোষণা এলেও তা দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এবং সামগ্রিক বাজেটের অনুপাতে এখনো অত্যন্ত অপর্যাপ্ত ও হতাশাজনক বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষক নেতারা। গত ১১ জুন পেশকৃত এই বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সম্মিলিতভাবে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রাখা হলেও দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশের আশপাশে সীমাবদ্ধ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষা খাতে বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানোই একমাত্র সমাধান নয়; বরং এর সুশাসনভিত্তিক কার্যকর ব্যবহার, দুর্নীতি-অপচয় রোধ, মানোন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিনিয়োগ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রফেসর ড. এম কোরবান আলী এবং জেনারেল সেক্রেটারি অধ্যাপক এ বি এম ফজলুল করীম প্রস্তাবিত বাজেটের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি হলো মানসম্মত শিক্ষা। অথচ এই বাজেটে দীর্ঘদিনের যৌক্তিক প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি। ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষা খাতে জাতীয় জিডিপির অন্তত ৪ থেকে ৬ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া আবশ্যক হলেও, প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মাত্র এক লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা- যা মোট জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ।

শিক্ষক নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন ভুটান (৬%) বা নেপাল (৪.৫%) যেখানে শিক্ষার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করে, সেই তুলনায় বাংলাদেশের এই বরাদ্দ অত্যন্ত হতাশাজনক। এই দীর্ঘমেয়াদি কম বরাদ্দের কারণে শিক্ষার মোট ব্যয়ের প্রায় ৭১ শতাংশই বহন করতে হচ্ছে সাধারণ অভিভাবককে। ফলে দরিদ্র পরিবারের মেধাবী সন্তানরা উচ্চশিক্ষা থেকে ক্রমান্বয়ে বঞ্চিত হচ্ছে।

বাজেট বিশ্লেষণ করে বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা খাতের তীব্র অভাব এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে আধুনিক ল্যাব ও লাইব্রেরির সঙ্কটের কারণে দেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থা আজ এক গভীর সঙ্কটে নিমজ্জিত। শিক্ষক ফেডারেশনের নেতৃদ্বয় স্পষ্ট করে বলেন, শুধু ভৌত অবকাঠামো বা দালানকোঠা নির্মাণ করে একটি উন্নত ও ‘স্মার্ট দেশ’ গঠন করা অসম্ভব। নতুন সরকারের পেশ করা এই বিশাল বাজেটের অন্তত ৫ শতাংশ যদি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলায় ব্যয় না করা হয়, তবে সামগ্রিক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ভেস্তে যাবে।

নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, শিক্ষা খাতের বাজেট যেন কেবল অবকাঠামো নির্মাণে শেষ না হয়ে শিক্ষা উপকরণ, গবেষণা ও বৃত্তির মতো গুণগত খাতে সঠিকভাবে ব্যয় হয়, তা কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। দুর্নীতি, অপচয়, সঠিক পরিকল্পনার অভাব এবং প্রশাসনিক জটিলতা কঠোর হস্তে দমন করতে হবে; তা না হলে বরাদ্দ বাড়ালেও চূড়ান্ত ফলাফল শূন্যই থাকবে।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম গণমাধ্যমে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে আরো বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষাকে ‘ব্যয়’ নয়, বরং দেশের সবচেয়ে বড় ‘বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখতে হবে।”

একই সুরে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন শিক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার ভাষায়, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, সেই অর্থ কতটা দক্ষতার সাথে ব্যয় করা হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শিক্ষা খাতে জবাবদিহি ও ফলাফলভিত্তিক ব্যয় ব্যবস্থাপনার ওপর জোরালো গুরুত্বারোপ করেন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশের জনমিতিক সুবিধা (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) কাজে লাগাতে হলে মানবসম্পদ উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তার মতে, বাজেটে শিক্ষাখাতে আরো উচ্চাভিলাষী বিনিয়োগের প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সম্প্রসারণে রাষ্ট্রকে বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষকরা মনে করছেন, শিক্ষা খাতে বরাদ্দের সিংহভাগ অংশই শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পরিচালন ব্যয়ে চলে যাচ্ছে। ফলে গবেষণা, নতুন উদ্ভাবন এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রকৃত বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাবে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে।

শিক্ষক সংগঠন ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের নেতারা বলেছেন, বর্তমানের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষাখাতে আরো বেশি অর্থ বরাদ্দ রাখা অত্যন্ত জরুরি ছিল। তারা সরকারি বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ এবং গবেষণার জন্য পৃথক বিশেষ তহবিল গঠনের দাবি জানিয়েছেন।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের তুলনায় বাংলাদেশে শিক্ষাখাতে সরকারি ব্যয় এখনো তলানিতে। ফলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন এবং স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্য বাস্তবায়নে শিক্ষাখাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।