বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ডব্লিউএআইআর প্রতিবেদন ইঙ্গিত দিচ্ছে, দীর্ঘ সময়ের ঊর্ধ্বমুখী সুদের হার এখন ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পর্যায়ে প্রবেশ করছে। তবে নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি স্বস্তির খবর হলেও চ্যালেঞ্জের অবসান ঘটেনি। কারণ সুদের হার, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, ব্যাংকগুলোর তারল্য ও আর্থিক স্থিতিশীলতা- এই পাঁচটি বিষয় এখন পরস্পরের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু সুদের হার কমলেই বাংলাদেশে বেসরকারি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে- এমনটি নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারণ বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত কেবল অর্থায়নের ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে না; বরং এটি সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, ব্যবসার পরিবেশ, জ্বালানি নিরাপত্তা, নীতিগত পূর্বানুমানযোগ্যতা ও আর্থিক খাতের সক্ষমতার মতো একাধিক বিষয়ের সমন্বিত ফল।
অবশ্যই ঋণের সুদ কমলে উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন ব্যয় হ্রাস পায়। বর্তমানে শিল্প ও এসএমই খাতে ঋণের সুদ প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি, যা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বড় ব্যয়। এই হার যদি ধীরে ধীরে ১০ থেকে ১১ শতাংশের মধ্যে নেমে আসে, তা হলে নতুন প্রকল্পের আর্থিক সম্ভাব্যতা উন্নত হবে, উৎপাদন ব্যয় কিছুটা কমবে এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়বে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা তুলনামূলকভাবে কম খরচে মূলধন সংগ্রহ করতে পারবেন। তবে এই ইতিবাচক প্রভাব তখনই কার্যকর হবে, যখন ব্যবসার সামগ্রিক পরিবেশও বিনিয়োগের অনুকূলে থাকবে।
মূল্যস্ফীতিকে আরো নিয়ন্ত্রণ
এক দিকে মূল্যস্ফীতিকে আরো নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে মুদ্রানীতিতে সতর্ক অবস্থান বজায় রাখতে হবে। অন্য দিকে অতিরিক্ত উচ্চ সুদের হার দীর্ঘ সময় ধরে বহাল থাকলে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি আরো মন্থর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রবৃদ্ধির মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরবর্তী নীতিগত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে শুধু মূল্যস্ফীতির ওপর নয়; বরং বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিময় হার, তারল্য পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক অর্থবাজারের গতি-প্রকৃতির ওপরও।
অনেকের ধারণা, ঋণের সুদ কমলেই বিনিয়োগ দ্রুত বাড়বে। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে সুদের হার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই একমাত্র নির্ধারক নয়। উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের আগে বাজারের চাহিদা, রাজনৈতিক ও নীতিগত স্থিতিশীলতা, জ্বালানি সরবরাহ, বিদ্যুতের প্রাপ্যতা, কাঁচামালের মূল্য, করনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেন; অর্থাৎ ঋণের সুদ যদি ১২ থেকে ১১ শতাংশেও নেমে আসে, তবুও সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশ অনুকূল না হলে বিনিয়োগ প্রত্যাশিত হারে বাড়বে না। আবার বিপরীতভাবে অর্থনীতিতে আস্থা ফিরে এলে তুলনামূলক উচ্চ সুদের পরিবেশেও অনেক উদ্যোক্তা বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে পারেন।
তাই সুদের হার কমানো যেমন প্রয়োজন, তেমনি বিনিয়োগবান্ধব সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংকগুলোর জন্যও সহজ সময় নয়
বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু ঋণগ্রহীতারাই নয়, ব্যাংকগুলোকেও একাধিক চাপের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। গত কয়েক মাসে উচ্চ সুদে সংগ্রহ করা মেয়াদি আমানতের দায় এখনো অনেক ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে রয়েছে। ফলে নতুন আমানতের সুদ কমলেও তহবিল খরচ তাৎক্ষণিকভাবে কমছে না। একই সাথে খেলাপি ঋণের বিপরীতে অতিরিক্ত প্রভিশন সংরক্ষণ, মূলধন পর্যাপ্ততা বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড অনুসরণ করাও ব্যাংকগুলোর ব্যয় বাড়াচ্ছে।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে আমানত সংগ্রহে প্রতিযোগিতা। গ্রাহক ধরে রাখতে ব্যাংকগুলোকে এখনো তুলনামূলক আকর্ষণীয় সুদ দিতে হচ্ছে। আবার ঋণের সুদ বেশি রাখলে ভালো গ্রাহকরা বিকল্প অর্থায়নের দিকে ঝুঁকতে পারেন। ফলে আমানত, ঋণ ও মুনাফার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা ব্যাংকগুলোর জন্য ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
ডব্লিউএআইআর মে ২০২৬-এর তথ্য থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বার্তা পাওয়া যায়। প্রথমত, সুদের হার বৃদ্ধির দীর্ঘ চক্র সম্ভবত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে এখন স্থিতিশীলতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে উচ্চ সুদের আমানত থেকে বেরিয়ে এসে তহবিল সংগ্রহের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ দিচ্ছে। বিশেষ করে এফডিআর ও ডিপিএসের সুদ কমার প্রবণতা সেই ইঙ্গিতই বহন করছে। তৃতীয়ত, ঋণের সুদ কমলেও তা এখনো শিল্প ও এসএমই খাতের জন্য তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল। ফলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ও নতুন বিনিয়োগে দ্রুত গতি ফেরার সম্ভাবনা এখনো সীমিত।
চতুর্থত, স্প্রেডে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি, যা ইঙ্গিত করে ব্যাংকগুলো এখনো তাদের সুদভিত্তিক আয়ের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ অনুভব করছে না; অর্থাৎ লাভজনকতা ধরে রাখার পাশাপাশি বাজার পরিস্থিতির সাথে সুদের হারও ধীরে ধীরে সমন্বয় করছে। সবশেষে প্রকৃত আমানত সুদের হার এখনো ঋণাত্মক, যা আমানতকারীদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। অন্য দিকে প্রকৃত ঋণ সুদের হার এখনো ইতিবাচক এবং তুলনামূলকভাবে উচ্চ, যা উৎপাদন ও বিনিয়োগের ব্যয় বাড়িয়ে রাখছে।
নীতিগত স্থিতিশীলতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা
বর্তমান বাস্তবতায় উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো নীতিগত স্থিতিশীলতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আগে তারা জানতে চান করনীতি কতটা স্থিতিশীল থাকবে, আমদানি ও শুল্কনীতিতে হঠাৎ পরিবর্তন হবে কি না, ডলারের বিনিময় হার কতটা স্থিতিশীল থাকবে এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন থাকবে কি না। এসব বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে শুধু কম সুদের ঋণ বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করতে পারে না।
এর পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের নিজস্ব কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। উচ্চ খেলাপি ঋণ, কিছু ব্যাংকের তারল্য সঙ্কট, মূলধন ঘাটতি ও দুর্বল সুশাসনের কারণে নীতিগত সুদহার কমলেও সব উদ্যোক্তার কাছে সহজে ঋণ পৌঁছাবে- এমন নিশ্চয়তা নেই। ঝুঁকি এড়াতে অনেক ব্যাংক নতুন ঋণ অনুমোদনে এখনো সতর্ক অবস্থান নিতে পারে, যা বিনিয়োগের গতি কমিয়ে দিতে পারে।
বিনিয়োগ বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো বাজারে চাহিদার আস্থা। উদ্যোক্তারা তখনই নতুন কারখানা স্থাপন বা উৎপাদন সম্প্রসারণে আগ্রহী হন, যখন তারা দেশীয় ভোগব্যয়, রফতানি বাজার এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পান। একই সাথে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, দক্ষ বন্দর ও লজিস্টিকস ব্যবস্থা এবং শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত না হলে সুদের হার কমার সুফলও সীমিত থেকে যেতে পারে।
তাই বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সুদের হার কমানো নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, তবে এটি বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয় শর্ত, একমাত্র শর্ত নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ কমানো, নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং জ্বালানি ও অবকাঠামো উন্নয়নের মতো সংস্কার একই সাথে এগিয়ে নিতে পারলেই সুদের হার হ্রাসের প্রকৃত সুফল পাওয়া যাবে; অন্যথায় ঋণের সুদ কিছুটা কমলেও বেসরকারি বিনিয়োগে তার প্রভাব সীমিত থাকার আশঙ্কাই বেশি।
আগামী কয়েক মাসে কী হতে পারে?
অর্থনীতিবিদদের ধারণা, যদি মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী থাকে এবং সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যান্য সূচক ইতিবাচক থাকে, তাহলে আগামী মাসগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিগত সুদহার পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ পেতে পারে। তবে সুদের হার কমানোর ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্ভবত ধীরে ও সতর্কতার সাথে এগোবে। কারণ মূল্যস্ফীতি আবার ঊর্ধ্বমুখী হলে দ্রুত সুদ কমানোর সিদ্ধান্ত উল্টো অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সে কারণে বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিবর্তে ধাপে ধাপে সুদের হার সমন্বয়ের সম্ভাবনাই বেশি। প্রথমে কমতে পারে আন্তঃব্যাংক সুদের হার, এরপর নতুন আমানতের সুদ এবং সবশেষে ঋণের সুদে তার প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মে ২০২৬-এর ডব্লিউএআইআর প্রতিবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে- দেশের ব্যাংকিং খাতে সুদের হার বৃদ্ধির দীর্ঘ চক্র সম্ভবত এখন স্থিতিশীলতার দিকে মোড় নিচ্ছে। আমানত, ঋণ ও স্প্রেড- তিন ক্ষেত্রেই সীমিত পরিসরে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে, যা বাজারে ভারসাম্য ফেরার প্রাথমিক ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে এই পরিবর্তনকে সুদের হার দ্রুত কমে যাওয়ার সূচনা হিসেবে দেখার সুযোগ এখনো নেই। কারণ মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, প্রকৃত আমানত সুদের হার এখনো ঋণাত্মক এবং শিল্প ও এসএমই খাতের জন্য ঋণের ব্যয় এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একই সাথে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংকগুলোর পরিচালন দক্ষতার মতো কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও বহাল রয়েছে।
সব মিলিয়ে মে মাসের ডব্লিউএআইআর প্রতিবেদন বলছে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে- যেখানে সুদের হার বৃদ্ধির পরিবর্তে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে সুদের হার কত দ্রুত এবং কতটা নিরাপদভাবে কমানো সম্ভব। সেই সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ধারাবাহিকতা, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের অগ্রগতির ওপর। আর এ তিনটি ক্ষেত্রেই ইতিবাচক অগ্রগতি নিশ্চিত করা গেলে সুদের হার শুধু কমবেই না, বরং তা সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্যও প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে।



