আর একদিন পর কাল দিনশেষে পর্দা নামছে প্রাণের একুশে গ্রন্থমেলার। পুরনো রেওয়াজ অনুযায়ী প্রতি বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুর দিনে মেলা শুরু ও মাস শেষের সাথে মেলা সমাপ্তির নিয়ম থাকলেও এবার তা হয়নি। জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সময় পরিবর্তন করে ২৬ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় প্রাণের মেলা। টানা ১৮ দিন শেষে কাল সাঙ্গ হবে এবারের একুশে গ্রন্থমেলা।
গতকাল শুক্রবার ছুটি দিনে মেলার শেষ সময়ে বিক্রি ছিল ভালো। তবে মেলাজুড়ে একটা বিদায়ের আবহ ছিল। ক্রেতারাও শেষ সময় তাদের পছন্দের বই কিনে বলা মেলা থেকে বিদায় নিয়েছেন।
গতকাল বেলা ১১টা থেকে মেলার গেট খুলে দেয়ার পর বিক্রেতাদের ভিড় বাড়তে থাকে। দুপুরে জুমার নামাজের পর বিকেলে ক্রেতাদের ব্যাপক সমাগম ঘটে। মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন প্রকাশনীর স্টলে পাঠকদের ভিড়। কেউ নতুন প্রকাশিত বই দেখছেন, আবার কেউ পছন্দের লেখকের বই কিনে নিচ্ছেন। বিশেষ করে বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মেলায় দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।
অমর একুশে বইমেলায় হাজারো বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেছে পাঁচ শতাধিক প্রকাশনা সংস্থা। গল্প, কবিতা, উপন্যাসের পাশাপাশি মেলায় এসেছে বিভিন্ন প্রবন্ধের বইও। সাধারণত শেষ দিনগুলোতে ক্রেতারা তালিকা নিয়ে এসে বই কেনেন। তবে এবার সেই চিত্র কিছুটা কম। যদিও এবারের মেলায় পাঠক কম এসেছেন। তবে যারা এসেছেন তাদের অনেকেই বই কিনেছেন। জনসমাগম কম থাকার কারণে বইপ্রেমীরা স্বাচ্ছন্দে তাদের পছন্দের বই সংগ্রহ করতে পারছেন।
বিক্রেতারা জানান, এবার প্রবন্ধের বইয়ের প্রতি বিশেষ শ্রেণীর পাঠকের আগ্রহ একটু বেশি থাকলেও প্রবন্ধের বই কম এসেছে।
এবারের বইমেলায় আয়োজকরা ঘোষণা দিয়েছিল, এবারের বইমেলা হবে ‘জিরো ওয়েস্ট বইমেলা’। বলা হয়েছিল মেলা প্রাঙ্গণকে পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত রাখা হবে। স্টল, দোকান, মঞ্চ, ব্যানার, লিফলেট ও খাবারের দোকানগুলোতে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব উপকরণ যেমন- পাট, কাপড় ও কাগজ ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে বাস্তবে তার উল্টোটাই ঘটেছে। ধুলার দাপটে আগতদের মুখে মাস্ক আর রুমাল চেপে চলাচল করতে হয়েছে।
মেলায় এসেছে নোবেল বিজয়ী নাগিব মাহফুজ এর উপন্যাস (আরশের সামনে আমাম আল আরশ)। এর অনুবাদ করেছেন আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু। বইটি প্রকাশ করেছে বিআইআইটি পাবলিকেসন্স। বইটির প্রকাশনা ও মোড়ক উন্মেচন গতকাল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হয়। নোবেল বিজয়ী মিসরীয় সাহিত্যিক নাগিব মাহফুজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস হলো ‘আমাম আল-আরশ’। এই কালজয়ী উপন্যাসে তিনি মিসরের ইতিহাসের বিভিন্ন শাসকদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। এটি একটি আত্মোপলব্ধিমূলক ও ঐতিহাসিক ধারার উপন্যাস।
এতে মিসরের প্রাচীন ফারাও থেকে শুরু করে আধুনিক আমলের শাসকরা (যেমন : সালাহউদ্দিন আইয়ুবী, মোহাম্মদ আলী, আনোয়ার সাদাত) মৃত্যুর পর আল্লাহর আরশের সামনে বিচারার্থ হাজির হন। মাহফুজ এই কাল্পনিক বিচারের মাধ্যমে ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের শাসনকালের ভালো-মন্দ এবং তাদের কৃতকর্মের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন।
প্রাবন্ধিক ও গবেষক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রবন্ধ সঙ্কলন ‘বিচ্ছিন্নতায় অসম্মতি’র মূলভাব বইটি নতুনভাবে বের করেছে পাঞ্জেরি পাবলিকেশন্স। এই গ্রন্থে লেখক আধুনিক মানুষের জীবনযাত্রায় ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার স্বরূপ এবং এর পেছনের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণগুলো অত্যন্ত নিপুণভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং লেখক সেলিম জাহানের অমর একুশে বইমেলা প্রকাশিত নতুন প্রবন্ধ সঙ্কলনটির নাম ‘সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতি : বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত’। বইটি প্রকাশ করেছে প্রকাশনী সংস্থা মাওলা ব্রাদার্স।
দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) থেকে এসেছে ইসরাইল খানের সংগ্রহ ও সম্পাদনায় ‘সাময়িকপত্রে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক (১৯০১-৪৭)’ বইটি। ১৯০১-৪৭ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের দলিল এই বই। সে সময়ের বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হওয়া কিছু প্রবন্ধ সঙ্কলিত হয়েছে এতে। সওগাত, বুলবুল, মোহাম্মদী, শিখা, নবনূর, প্রবাসীসহ তখনকার বিখ্যাত সাময়িকপত্রে লেখা প্রবন্ধ থেকে বাছাই করা হয়েছে লেখাগুলো।
গতকাল মেলা শুরু হয় বেলা ১১টায় এবং চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। মেলায় বেলা ১টা পর্যন্ত ছিল ‘শিশুপ্রহর’। সকাল সাড়ে ১০টায় শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার প্রদান করা হয়।
বেলা ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্মরণ : বদরুদ্দীন উমর’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফিরোজ আহমেদ। আলোচনায় অংশ নেন সুমন রহমান। সভাপতিত্ব করেন আনু মুহাম্মদ। বিকেল ৪টায় ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
আজ মেলা শুরু হবে বেলা ১১টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। মেলায় থাকবে শিশুপ্রহর, শিশু কিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সঙ্গীত প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার প্রদান। বেলা ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা অনুষ্ঠান ও প্রবন্ধ উপস্থাপন। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।



