মকবুল হোসেন সরদার। স্ত্রী জান্নাত জাহান চামেলি ওরফে লুনা হোসেন। এই লুনা হোসেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। যে কারণে আওয়ামী আমলের পুরোটাই তিনি ছিলেন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী। রাজধানীর নিউমার্কেটে চাঁদাবাজি-মার্কেট দখল, দোকান দখলসহ নানা অপরাধের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে পটপরিবর্তনের পর এখন মকবুল হোসেন নিয়ন্ত্রণ করছেন নিউমার্কেট ও আশপাশের এলাকা। নিউমার্কেটের ব্যবসায়ীদের দোকান, মার্কেট সমিতিও দখল করে নিয়েছেন। তার ভয়ে নিউমার্কেটসহ আশপাশের ব্যবসায়ীরা তটস্থ।
বিগত ১৬ বছর ফ্যাসিস্ট শাসনামলে স্ত্রীর গুণে মকবুল ছিলেন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ও দখল বাণিজ্যে অদ্বিতীয়। ফ্যাসিস্ট পতনের পর নিজ গুণে তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতা অপব্যবহার করে একাধিপত্য গড়ে তুলেছেন। ঢাকা মহানগরীর প্রাণকেন্দ্র নিউমার্কেট-এলিফ্যান্ট রোড-মিরপুর রোড-ধানমন্ডি এলাকার অঘোষিত গডফাদার। মকবুল হোসেন সর্দার-নিউমার্কেট থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। রাজনৈতিক ক্ষমতাকে অবৈধ সম্পদ, বিত্ত-বৈভব অর্জনের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। রাজনৈতিক পরিচয়ে তার নিজস্ব বাহিনী রয়েছে, আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাথেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন ও মাসিক চাঁদা দিয়ে একাধিপত্য কায়েম রেখেছেন। এলাকার ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের প্রশ্ন- ঢাকা গভ. নিউমার্কেট দোকান মালিক সমিতির অফিসে কর্মরত একজন কেরানি কিভাবে বিপুল ক্ষমতাধর ও ৮-১০টি দোকানের মালিক হলেন।
রাজনীতির নামে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসীদের লালন ও আন্ডার ওয়ার্ল্ড কানেকশনে তিনি চরম বেপরোয়া। ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর ঢাকা গভ. নিউমার্কেট দোকান মালিক সমিতির সভাপতির পদটিও তিনি জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছেন। যারা তার অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারেন সম্ভাব্য সেসব ব্যক্তির নামে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক হত্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছেন। এলাকার রাজনীতি, চাঁদাবাজি, দোকান-রাস্তা-ফুটপাথ-কার পার্কিং-হকার সবকিছুই তার নিয়ন্ত্রণে, তার অঙ্গুলি হেলন ছাড়া কোনো কিছুই ঘটে না। শুধু নিজের স্বার্থসিদ্ধি ও আখের গোছানোর জন্য তিনি চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী বাহিনী লালন করেন, ফ্যাসিস্ট দোসরদের সম্পত্তি ও দোকান-ব্যবসা দেখভাল করেন পক্ষান্তরে সন্ত্রাসী বাহিনী ব্যবহার করে অসহায় মানুষের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ও দোকান দখল করেন; প্রশাসন ও আইন-আদালতকে ব্যবহার করে দীর্ঘস্থায়ী করেন সেই দখল। নিউমার্কেট থানা তার কথায় উঠ-বস করে, তার বিরুদ্ধে মামলা তো দূরের কথা, সাধারণ ডাইরিও নিতে চায় না। সর্বশেষ ভুক্তভোগী এক নারী উদ্যোক্তা লিপিকা দাস গুপ্তা তার নিউমার্কেটস্থ দোকান উদ্ধারের চেষ্টা চালালে মকবুল সর্দার ক্ষিপ্ত হন। এরপর গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় শিল্প সমিতি লি. ১২/ডি মতিঝিলস্থ কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে সমিতির সভাপতি লিপিকা দাস গুপ্তাকে অবরুদ্ধ করে নগদ অর্থ ও মূল্যবান কাগজপত্র নিয়ে যান। এ বিষয়ে মতিঝিল থানায় গেলে পুলিশ কোনো মামলা নেয়নি এবং জিডিও গ্রহণ করেনি। পরে অনলাইনে জিডি করা হয়।
ভুক্তভোগী লিপিকা দাস গুপ্তা জানান, তিনি এখন প্রাণভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তার নামে মিথ্যা হত্যা মামলা দিয়েও হয়রানি করা হচ্ছে। বিগত ২৭-১০-২০২৪ ইং তারিখে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মকবুল হোসেন সর্দার, তার স্ত্রী জান্নাত জাহান চামেলি, মমিনুল হক পাঠান (ইছা পাঠান) ও মাজহারুল হক পাঠানোর (তুষার) নামে তিনি সিআর (চাঁদাবাজি) মামলা করেন। মামলার তদন্ত ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার রমনা বিভাগের এস আই মো: ইরফান খানের ওপর অর্পিত হয়। তিনি গত বছরের ১৩ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। সেই প্রতিবেদনে অপরাধ সত্য বলে প্রমাণিত হওয়ায় আসামিদের বিরুদ্ধে বর্ণিত ধারা মোতাবেক প্রকাশ্য বিচারের সুপারিশ করেন।
বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় শিল্প সমিতি লি. একটি নিবন্ধিত সমবায় সংগঠন। যার ৮৮ শতাংশ মালিকানা বাংলাদেশ সরকারের এবং অবশিষ্ট ১২ শতাংশ মালিকানা বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় শিল্প সমিতি লিমিটেডের ক্ষুদ্র সমবায়ীদের। ক্ষুদ্র তাঁতীদের উৎপাদিত তাঁতবস্ত্র প্রদর্শনী ও বিক্রির জন্য ঢাকা গভ. নিউমার্কেটে তিনটি দোকান ১৯৬৩ খ্রি. ঢাকা সিটি করপোরেশন থেকে বরাদ্দ পেয়ে নিয়মিত পাওনা পরিশোধ করে আসছে। এক সময় দোকানগুলোতে ক্ষুদ্র তাঁতী সমবায়ীদের উৎপাদিত বস্ত্র প্রদর্শনীর জন্য ‘সমবায় বিপণি বিতান’ চালু ছিল। পরে মকবুল হোসেন সর্দার ও তার স্ত্রী যুব মহিলা লীগ নেত্রী জান্নাত জাহান চামেলীর (লুনা হোসেন) লোলুপ দৃষ্টি পড়ে ওই তিনটি দোকান, অন্যান্য বিভিন্ন সমিতি বা অ্যাসোসিয়েশনের নামে বরাদ্দপ্রাপ্ত দোকানগুলোর দিকে। বর্তমানে ওই দোকানগুলো দখল করে মকবুল ও তার পেটোয়া বাহিনী জোরপূর্বক ভাড়া আদায় করছে।
ক্ষুদ্র তাঁতী সমবায়ীদের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের সহায় সম্পত্তি দেখভাল ও সংরক্ষণে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বাংলাদেশ জাতীয় শিল্প সমবায় সমিতির সভাপতি লিপিকা দাস গুপ্তা বিভিন্ন দফতরে ও প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন। বাংলাদেশ জাতীয় শিল্প সমবায় সমিতির মালিকানাধীন দোকান ফিরে পেতে ক্ষুদ্র তাঁতী ও সমবায়ীরা গত বছরের ৬ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বরাবর চিঠি এবং ১৫ এপ্রিল স্মারকলিপি দিয়েছে ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার দফতরে দোকান বরাদ্দের সাথে সংশ্লিষ্ট মূল কাগজাদিসহ ১৮ মার্চ শুনানির জন্য ডাকা হলেও মকবুল হোসেন সর্দার ও তার স্ত্রী লুনা হোসেন উপস্থিত হননি। এরপর ভুক্তভোগীরা মকবুল হোসেন সর্দার ও তার স্ত্রী লুনা হোসেনের অবৈধ কর্মকাণ্ড ও অন্যায়ের বিষয়ে কোনো প্রতিকার পাননি ও দোকান ফেরৎ পাননি। সুবিচারের আশায় গত ২৭ অক্টোবর নিউমার্কেট থানায় তারা সিআর (চাঁদাবাজি) মামলা করেন।
চব্বিশের ৫ আগস্টের পর আগে বন্ধ থাকা ১৮নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি বিপ্লব সরকারের কয়েকটি দোকান পরে খুলে দিয়ে প্রায় তিন কোটি টাকা হাতিয়ে নেন মকবুল সর্দার, যা মার্কেটের ব্যবসায়ীদের মুখে মুখে। প্রতি মাসে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে বৈধ অবৈধ দোকান প্রায় ৬০ লাখ টাকা আদায় করা হয়। অথচ পরিশোধ করা হয় ২৮-৩০ লাখ টাকা। নিউমার্কেটের অভ্যন্তরে ফুটপাথের প্রায় ৬০০ দোকান থেকে কমপক্ষে মাসে আট লাখ টাকা আদায় করা হয়। এ ছাড়া মিরপুর রোডের দুই পাশের ফুটপাথ থেকে প্রতিদিন প্রায় চার লাখ টাকা আদায় করা হয়। এসব বিষয়ে মকবুলের মোবাইলে ফোন দেয়া হলে তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা। ৫ আগস্টের পর আমার বিরুদ্ধে দুইটি মিথ্যা মামলা করা হয়। তাতে পুলিশ ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছে। একই কথা বলে বারবার মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে।



