নয়া দিগন্ত ডেস্ক
নিষ্ফল আলোচনা শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৭ জুন স্বাক্ষরিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ গতকাল শেষ হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ওয়াশিংটন-তেহরান সঙ্ঘাতের তীব্রতা সাময়িকভাবে কমলেও স্থায়ী শান্তির পথ এখনো অনিশ্চিত। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া ওই সমঝোতার প্রধান লক্ষ্য ছিল ৬০ দিনের মধ্যে স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানো এবং যুদ্ধের কারণে অচল হয়ে পড়া হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা। কিন্তু চুক্তির কয়েকটি ধারার অস্পষ্টতা, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ, লেবাননে ইসরাইলের সামরিক অবস্থান এবং ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। পরে পাল্টাপাল্টি হামলায় সমঝোতাটি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
সমঝোতার আওতায় উভয় পক্ষ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধে সম্মত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল ৩০ দিনের মধ্যে নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, চূড়ান্ত চুক্তির পর ইরান থেকে সেনা প্রত্যাহার, পুনর্গঠনে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন প্যাকেজের কাজ শুরু এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে ইরানের আটকে থাকা আন্তর্জাতিক তহবিল ব্যবহারের সুযোগ দেয়া।
অন্যদিকে ইরানের প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল হরমুজ প্রণালী থেকে মাইন অপসারণ, ৬০ দিনের জন্য বিনামূল্যে জাহাজ চলাচলের সুযোগ, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে আলোচনায় বসা।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের ইরানবিষয়ক সাবেক ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জয় হুডের মতে, পেশাদার কূটনীতিকদের অনুপস্থিতিতে তৈরি নথিতে এমন ফাঁক ছিল, যা ইরানকে হরমুজ প্রণালী ও লেবানন বিষয়ে নিজস্ব সার্বভৌমত্বের দাবি করার সুযোগ দেয়। সবচেয়ে বড় বিরোধ দেখা দেয় তিনটি ধারায়।
সমঝোতার পঞ্চম ধারায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথ নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়। ওমানের উপকূল ঘেঁষে বিকল্প পথ নির্ধারণ করা হলেও ইরান নিজেদের উপকূলীয় পথকে প্রধান রুট হিসেবে দাবি করে। এরপর ইরানের নির্ধারিত পথ অনুসরণ না করা কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়।
প্রথম ধারায় সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতির কথা থাকলেও লেবাননে অবস্থানরত ইসরাইলি বাহিনীর বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল না। ফলে ইরান লেবাননে ইসরাইলি হামলা বন্ধকে সমঝোতার অংশ হিসেবে দাবি করলেও ইসরাইল তা মানেনি। ষষ্ঠ ধারায় ইরানের পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিলের কথা বলা হলেও অর্থের উৎস ও ব্যবহারের শর্ত স্পষ্ট ছিল না।
গত ২৫ জুন সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এভার লাভলি’ ওমান উপকূলের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়। যুক্তরাষ্ট্র এর জন্য ইরানকে দায়ী করে। ২৭ জুন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে হামলা চালায়। তেহরান একে সমঝোতা লঙ্ঘন বলে পাল্টা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায়। পরে ইরান জানায়, নতুন মার্কিন হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছে এবং এর পর তারা সমঝোতার বাধ্যবাধকতা স্থগিত করেছে।
সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালী খুলতে বাধা দিলে ওমানেও হামলা হতে পারে। অন্যদিকে ইরানের আইআরজিসির ডেপুটি কমান্ডার ইন চিফ মেজর জেনারেল মোস্তফা ইজাদি দাবি করেছেন, সঙ্ঘাত শুরুর পর ইরান ২০০টির বেশি শত্রু বিমান ভূপাতিত করেছে।
এদিকে ইয়েমেনের হাউছিরা বাব আল-মানদেব প্রণালীর নিকটবর্তী মোখা বন্দরের কাছে একটি সৌদি সামরিক জাহাজ ও চারটি এসকর্ট জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ এ দাবি নিশ্চিত করেনি। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক উত্তেজনাও অব্যাহত রয়েছে।



