সিলেট অঞ্চলে পতিত জমিতে সবুজ বিপ্লব

কাওসার আজম
Printed Edition
সিলেট অঞ্চলে পতিত জমিতে সবুজ বিপ্লব
সিলেট অঞ্চলে পতিত জমিতে সবুজ বিপ্লব

সিলেট অঞ্চলের দিগন্তজোড়া জমি পড়ে থাকত অনাবাদি আর অবহেলায়। বছরের পর বছর এসব জমি ছিল জঞ্জাল। কিন্তু সময় বদলেছে। সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার-প্রবাসী অধ্যুষিত এই চার জেলায় এখন বইছে কৃষি উন্নয়নের নতুন হাওয়া। আধুনিক প্রযুক্তি, সেচ সুবিধা এবং সরকারি উদ্যোগে সেই অনাবাদি জমিই আজ হয়ে উঠছে সোনালী ফসলের আধার।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) ‘আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন’ প্রকল্পের মাধ্যমে অনাবাদি জমিতে কৃষকের সবুজ বিপ্লব বদলে দিয়েছে ওই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য। ২০২২ সালের জুলাইয়ে যখন প্রকল্পটি শুরু হয়, সিলেট অঞ্চলের চার জেলায় আবাদযোগ্য অনাবাদি জমি ছিল প্রায় চার লাখ ৬১ হাজার হেক্টর। প্রকল্প মেয়াদে ৭১ হাজার ২৭২ হেক্টর জমি চাষাবাদের আওতায় আনার কথা। চলতি বছরের (২০২৬) ডিসেম্বরে এই প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা। বিগত ২০০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রায় ৫৮ হাজার হেক্টর অনাবাদি জমি আবাদের আওতায় এসেছে বলে জানা যায়। বাকি সময়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে উল্লেখ করে প্রকল্প পরিচালক মো: রাকিব উদ্দিন জানান, প্রকল্প মেয়াদে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে সিলেট অঞ্চলের কৃষি। প্রকল্পের মাধ্যমে এলএলপি পাম্প, ফিতা পাইপসহ আধুনিক সেচব্যবস্থা চালু হওয়ায় উৎপাদন খরচ কমেছে এবং সেচনির্ভরতা বেড়েছে। কৃষকরা এখন ধানের পাশাপাশি তরমুজ, নাগা মরিচ, ক্যাপসিকাম, মিষ্টি কুমড়া, মিষ্টি আলু, চিনাবাদাম, ভুট্টাসহ অল্প পানি চাহিদা সম্পন্ন স্বল্প জীবনকালের ফসলের বহুমুখীকরণে সফলতা এসেছে। প্রযুক্তি সহায়তার পাশাপাশি কৃষককে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা পরামর্শ দিচ্ছেন, সেই পরামর্শের আলোকে ফসলের বৈচিত্র্য এসেছে। ফলে কৃষকের আয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার রুস্তমপুর গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তারা মিলে ১৮ বিঘা জমিতে নাগা মরিচ চাষ করেছেন। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে তা রফতানি হচ্ছে যুক্তরাজ্যে। অথচ এই জমিতে ‘ভিন্না’ নামের আগাছার কারণে যুগের পর যুগ পতিত থাকত।

হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, আগে শুধু আমন ধান করতাম, তাও ঠিকমতো হতো না। এখন কৃষি অফিসের সহায়তায় বোরো ধান, ভুট্টা আর সবজি চাষ করছি। আয় আগের চেয়ে দ্বিগুণ হয়েছে। পরিবার নিয়ে এখন সচ্ছলভাবে চলতে পারছি।

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার কৃষক রহিম উদ্দিন জানান, এই এলাকায় আগে পানি আর সেচের সমস্যা ছিল। এখন পাম্প আর পাইপের মাধ্যমে সহজে সেচ দেয়া যায়। আগে যে জমি ফাঁকা পড়ে থাকত, এখন সেখানে ফসল হচ্ছে। এতে আমাদের জীবনে বড় পরিবর্তন এসেছে।

মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার কৃষক সেলিনা বেগম বলেন, আমি আগে শুধু ধান চাষে সীমাবদ্ধ ছিলাম। এখন প্রশিক্ষণ নিয়ে সবজি ও মসলা চাষ করছি। এতে কম খরচে বেশি লাভ হচ্ছে। নিজের পাশাপাশি অন্য নারীদেরও উৎসাহ দিচ্ছি।

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর ইউনিয়নের হাসনাবাদ গ্রামের কৃষক পাখি মিয়া দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জাতের শাকসবজির আবাদ করেছেন। এবার তিনি এক বিঘা পতিত জমি বর্গা নিয়ে আপেল ও বলসুন্দরী কুলের বাগান করেন। প্রথমবারই তার এই বাগানে ব্যাপক ফলন এসেছে। কুলগাছের সারির ফাঁকে ফাঁকে ডাঁটাশাকের আবাদও করেন পাখি মিয়া। তার এই সফলতায় আশপাশের অনেকেই এখন পতিত জমিতে কুলবাগান তৈরিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো: আব্দুর রহিমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তার বাগান পরিদর্শন করে মুগ্ধ হন।

স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রতন পাল বলেন, জুড়ীতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আগে কেউ আপেল কুল ও বলসুন্দরী কুলের চাষ করেননি। পাখি মিয়া সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন এবং এ কাজে তাকে অনেক শ্রমও দিতে হয়েছে। হাসনাবাদ ও পাশের বাহাদুরপুর এলাকায় অনেক পতিত টিলাভূমি আছে। পাখি মিয়ার সফলতা দেখে অনেকেই পতিত টিলাভূমিতে বরই চাষে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এ ব্যাপারে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সিলেট কৃষি অঞ্চল প্রকল্পটির মাঠ পরিদর্শন করে প্রকল্পটিকে অত্যন্ত সফল হিসেবে উল্লেখ করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম। তিনি বলেন, কৃষি উন্নয়নের জন্য যেসব কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে, তার মধ্যে উচ্চমূল্যের ফসল সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এই এলাকায় সেচের অভাবে জমি পতিত থাকত। কৃষককে সেচযন্ত্রসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষিতে ব্যাপক পরিবর্তন দেখতে পেলাম। সেচ পাম্পের পাশাপাশি সোলার যাতে এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করা যায় সেজন্য কৃষকদের আরো সহযোগিতা দিতে পারব।

প্রকল্পটির কার্যক্রম আরো বৃদ্ধি করা দরকার উল্লেখ করে ডিজি বলেন, এই প্রকল্পটিতে আরো ব্যাপক আকারে আরো অন্যান্য টেকনোলজি অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

জানা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে বোরো ধানের আবাদি এলাকা ছিল চার লাখ ৭৩ হাজার ২২২ হেক্টর, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে চার লাখ ৯৭ হাজার ২১৯ হেক্টরে-অর্থাৎ ২৪ হাজার হেক্টর বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে বোরো ধান উৎপাদন বেড়েছে এক লাখ ৩২ হাজার ২৩৩ মেট্রিক টন।

শুধু বোরো নয়, আমন ধানের আবাদ বেড়েছে ২০ হাজার ২৮৭ হেক্টর এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে ৯৫ হাজার ৮৯৬ টন। পাশাপাশি ভুট্টা, সরিষা, তিল ও তিসির চাষ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এ ছাড়া মাসকলাই, চিনাবাদাম, তরমুজ, পেঁয়াজ, আদা, হলুদ, ধনিয়া, মরিচ, লতিকচু, মিষ্টি আলু, বিভিন্ন সবজি ও ফল বাগানের আওতায় এসেছে হাজার হাজার হেক্টর জমি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল পতিত জমিকে চাষের আওতায় আনা, কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত করা এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা। মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে।

আইএমইডি’র (বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ) ২০২৫ সালের প্রতিবেদন বলছে, প্রকল্পটি প্রায় দুই শ’ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদিত হয়, যা পরবর্তীতে সংশোধিত হয়ে ২৩০ কোটি ২৯ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। সিলেট বিভাগের চারটি জেলার ৪০টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নাধীন। আইএমইডি’র মূল্যায়নে প্রকল্পটি সামগ্রিকভাবে সন্তোষজনক অগ্রগতি অর্জন করেছে। যথাযথ মনিটরিং, প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি এবং কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ জোরদার করা হলে প্রকল্পটির কার্যকারিতা আরো বৃদ্ধি পাবে। সার্বিকভাবে সিলেট অঞ্চলে কৃষি সম্প্রসারণ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে এই প্রকল্পটি একটি কার্যকর ও অনুসরণযোগ্য মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।