কক্সবাজারে পুলিশের গুলিতে দুই ভাইয়ের মৃত্যু

অদৃশ্য কারণে ৬ বছরেও শুরু হচ্ছে না বিচার

চাঁদা না পেয়ে ওসি প্রদীপ-কেশব চক্র তাদের হত্যা করে, দাবি পরিবারের

Printed Edition

আরফাত বিপ্লব চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রামের দুই সহোদর মো: আজাদুল ইসলাম আজাদ ও মো: মোহাম্মদ ফারুক। একজন প্রবাসী, আরেকজন পেয়ারা চাষি। ২০২০ সালের জুলাই মাসে পুলিশের ক্রসফায়ারে নিহত হয় দুইজনই। এক রাতে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে চাঁদার টাকা না পেয়ে পরিকল্পিতভাবে ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের। সেসময় এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম দীর্ঘ ছয় বছরেও শুরু হয়নি। মামলায় টেকনাফ থানার সাবেক ওসি, মেজর সিনহা হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি প্রদীপ কুমার দাশসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলেও তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া বারবার স্থগিত থাকায় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বজনরা।

মামলার বাদি নিহতদের বোন রিনাত সুলতানা শাহীন জানান, ২০২০ সালের ১৩ জুলাই রাতে চন্দনাইশ এলাকা থেকে তার ছোট ভাই মো: আজাদুল ইসলামকে আটক করে টেকনাফ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ১৫ জুলাই বড় ভাই মো: ফারুককেও আটক করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, আজাদের মুক্তির জন্য আট লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বড় ভাই ফারুককেও আটক করে টেকনাফে নেয়া হয়।

তিনি অভিযোগ করেন, চন্দনাইশ থানার তৎকালীন ওসি কেশব চক্রবর্তী চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে তাদের আটক করেন এবং পরে টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপের মাধ্যমে ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে দুই ভাইকে হত্যা করা হয়।

পরিবারের দাবি, চাঁদা না দেয়ায় ২০২০ সালের ১৬ জুলাই সকালে ওসি প্রদীপ নিজেই ফোন করে লাশ নিয়ে যেতে বলেন। পরে ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে দুই ভাই নিহত হয়েছে বলে প্রচার করা হয়। পরদিন মাদক উদ্ধারের একটি মামলার অভিযানে নিহত হিসেবে তাদের দেখানো হয়।

নিহত দুই ভাই চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার কাঞ্চননগরের ফকির পাড়ার আমিনুল হকের ছেলে।

একসাথে দুই সন্তানকে হারিয়ে পাগলপ্রায় বাবা আমিনুল হক বলেন, ছয় বছর ধরে আদালতে ঘুরছি, কিন্তু বিচার পাচ্ছি না।’ ‘আমার ছোট ছেলে প্রবাসে থাকতো। করোনার সময় বাহরাইন থেকে দেশে এসেছিল। ওই চক্রটি ধারণা করেছিল, আমার ছেলেদের ধরলে বিপুল অর্থ পাওয়া যাবে। এজন্য নিজবাড়ি থেকে আটক করে টেকনাফে নিয়ে গিয়ে চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দেয়নি বলে পুলিশ আমার ছেলেদের ক্রসফায়ার করে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২০ সালের ২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নিহতদের বোন রিনাত সুলতানা শাহীন মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের সহায়তায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমারসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য এবং চন্দনাইশ থানার আরো কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। আদালত বিষয়টি তদন্তের জন্য কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপারের কাছে প্রতিবেদন তলব করেন।

পরে কক্সবাজার পুলিশের প্রতিবেদনে টেকনাফ থানার মাদক উদ্ধার মামলায় নিহত দুইজনের তথ্য উল্লেখ থাকায় চট্টগ্রামে দায়ের করা হত্যা মামলার কার্যক্রম স্থগিত রাখেন আদালত। একই সাথে টেকনাফ থানার ওই মাদক মামলার তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মামলার কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে টেকনাফ থানার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মোহাম্মদ সোহেল আহমদ খান আদালতে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতে বলা হয়, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট ও কক্সবাজার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নির্বাহী তদন্ত প্রতিবেদন এখনো না পাওয়ায় মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলে বিলম্ব হচ্ছে। ফলে মামলার বিচার কার্যক্রমও স্থগিত রয়েছে।

এদিকে ভুক্তভোগী পরিবার ও আইনজীবীর অভিযোগ, সাবেক ওসি প্রদীপ ও তার সহযোগীদের রায় একটি প্রভাবশালী মহল ইচ্ছাকৃতভাবে তদন্ত প্রক্রিয়া বিলম্বিত করছে।

মামলার আইনজীবী ও মানবাধিকার সংগঠক অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, ‘ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ ধারা অনুযায়ী তদন্ত প্রতিবেদন জমা না দেয়ার অজুহাতে মামলাটি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। নির্বাহী তদন্তের অজুহাতে বিচারিক কার্যক্রম বিলম্বিত করা আইনের অপব্যবহার।’

তিনি বলেন, ‘আদালতে পূর্বে দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা জিডির তথ্য পাওয়া যায়নি। তারপরও তাদের চন্দনাইশ থেকে তুলে নিয়ে টেকনাফে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে সাজিয়ে হত্যা করা হয়েছে।’

এদিকে নিহতদের বোন সম্প্রতি কক্সবাজার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নির্বাহী তদন্ত প্রতিবেদন চেয়ে আবেদন করেছেন। পরিবারের দাবি, দ্রুত তদন্ত শেষ করে বিচার কার্যক্রম শুরু করা হোক।