নিজস্ব প্রতিবেদক
পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ মোতায়েন ও প্রবেশাধিকার সীমিত
রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়ায় ছাত্রদলের ছত্রছায়ায় বহিরাগতদের সশস্ত্র অনুপ্রবেশে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিটি ক্যাম্পাসে এখন বিরাজ করছে এক ভীতিকর ও থমথমে পরিস্থিতি। বিশেষ করে গত মঙ্গলবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে প্রশাসনের সামনেই ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ছাত্রশক্তি, শিবির ও ছাত্রফ্রন্টের ওপর হামলা চালায়। হামলায় অন্তত ৭০ জন নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।
এই ঘটনার পর বর্তমানে পুরো জবি ক্যাম্পাসে এক গুমোট ও থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ক্যাম্পাসজুড়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের প্রবেশাধিকার সীমিত করে পরিচয়পত্র যাচাই করা হচ্ছে। এমনকি নিরাপত্তার অজুহাতে কেন্দ্রীয় ও উন্মুক্ত লাইব্রেরি বন্ধ করে দেয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলাম অভিযোগ করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সরাসরি সহায়তায় ১০ হাজার কোটি টাকার টেন্ডার আত্মসাৎ করার লক্ষ্যেই ছাত্রদল এই পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছে। ছাত্রশক্তির নেতাদের দাবি, বর্তমান সরকার ছাত্রদলকে দিয়ে ক্যাম্পাস দখল করিয়ে পুনরায় একটি ‘ফ্যাসিবাদী’ ব্যবস্থা কায়েম করতে চাইছে, যার পেছনে আওয়ামী লীগের ঘাপটি মেরে থাকা লোকজনের ইন্ধন রয়েছে।
এ দিকে এ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো: নাসিরউদ্দীন বলেন, ‘সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’
হল দখল করতেই আলিয়ায় হামলা
সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়ায় যুবদলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব রবিউল ইসলাম নয়নের নেতৃত্বে কয়েক শ’ বহিরাগত ও যুবদল-ছাত্রদল কর্মী আল্লামা কাশগরী (রহ:) হলে ঢুকে হলে তাণ্ডব চালায়। তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের রুম থেকে ল্যাপটপ, পিসি ও মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এই হামলা থামাতে গিয়ে ছাত্রদল ও বহিরাগতদের হাতে রক্তাক্ত হয়েছেন মাদরাসার অধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহমুদ ওবায়দুল হক; তার মাথায় ১২টি সেলাই দিতে হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আলিয়া মাদরাসার এক শিক্ষার্থী বলেন, শিবিরের ওপর হামলার শুরুতে একদল বহিরাগত ক্যাম্পাসে ঢুকে প্রথমেই সিসি ক্যামেরাগুলো বন্ধ করে দেয়। এরপর তারা প্রতিটি রুমে গিয়ে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য চাপ দিতে থাকে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল না করলে হলে থাকা যাবে না, এমন হুমকি দেয়া হয় এবং অন্য ছাত্র সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে অনেককে হল থেকে বের করে দেয়া হয়। এই অরাজকতা দমনে সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করলেও পরে যুবদলের মতো সংগঠনের নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে তারা পিছিয়ে যায়।
আহত শিক্ষার্থী মাহবুব আলম বলেন, আমি আসরের নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বের হতেই সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ পাই। তখন কয়েকজন লোক এসে কিছু বুঝার আগেই আমাকে অতর্কিত হামলা চালায়। তারপর আমাকে সবাই মিলে মেরে মারাত্মকভাবে জখম করে।
বর্তমানে আলিয়া মাদরাসা ক্যাম্পাসে ছাত্রদল তালা ঝুলিয়ে দিয়ে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের হলে ঢুকতে বাধা দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন থাকলেও সেখানে এক চরম অনিশ্চিত ও থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। জানা যায়, ক্যাম্পাস থেকে শিবিরের নেতাকর্মীদের বের করে দেয়া হয়েছে।
ঢাকা কলেজে জুলাই যোদ্ধা শিক্ষার্থীকেও ছাড়া হয়নি
ছাত্রদল একক আধিপত্য বিস্তারের জন্য হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা। জুলাই আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে আয়োজিত দোয়া মাহফিলের প্রস্তুতি নেয়ার সময় ছাত্রশিবিরের কর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় ছাত্রদল নেতা পারভেজ মোশাররফের অনুসারীরা। উদ্বেগের বিষয় হলো, জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারির এক ‘আহত জুলাই যোদ্ধা’ সাধারণ শিক্ষার্থীকে কেবল তার রাজনৈতিক ভিন্ন মতের কারণে ‘ছাত্রলীগ’ আখ্যা দিয়ে পিটিয়ে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ছাত্রদল এখন লাঠিসোঁটা ও রড নিয়ে ক্যাম্পাসে মহড়া দিচ্ছে এবং ভিন্নমতাবলম্বী কাউকে সহ্য করছে না।
আহত ছাত্রশিবিরের ঢাকা কলেজ শাখার অফিস সম্পাদক মো: আব্দুল মালেক বলেন, ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের নেতা শেখ পারভেজ মোশাররফের নেতৃত্বে ১৪ থেকে ১৫ জন ব্যক্তি কোনো ধরনের পূর্ববর্তী কথা-কাটাকাটি ছাড়াই আমাদের চারজনের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এর আগে তাদের সাথে আমাদের কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আমি এই ঘটনার সাথে জড়িতদের দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।
মধ্যরাতে গ্রাফিক আর্টসের হল থেকে ছাত্রশিবিরকে বের করে দেয় ছাত্রদল
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে গ্রাফিক্স আর্টস কলেজ এলাকায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার রাতে শিবির কর্মীদের হল থেকে বের করে দেয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এই ঘটনায় মেহেদী নামে এক শিবির কর্মী আহত হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গ্রাফিক আর্টস ছাত্রদলের আহ্বায়ক তামিম মাতুব্বর ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের সহ-সভাপতি মোতাহার হোসেনের নেতৃত্বে ছাত্রশিবিরের ১০ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থীকে হল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। এ সময় তাদের কাঁধে ব্যাগ ও কম্পিউটার নিয়ে বের হতে দেখা যায়। পরে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা তাদের মারতে মারতে ইনস্টিটিউটের সামনে থেকে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের দিকে নিয়ে যায়। এ সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউটের শিবিরের এক কর্মী বলেন, হলের ভেতরে আমাদের ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা মারধর করে। পরে আমাদের তারা জোরপূর্বক হল থেকে বের করে দেয়। মধ্যরাতে এখন আমরা কোথায় যাই। হল থেকে আমাদের ১৫ জনের মতো শিক্ষার্থীকে তারা মারধর করে বের হয়ে যেতে বাধ্য করে।
সরকারি গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউটের ছাত্রদলের আহ্বায়ক তামিম মাতুব্বর জানান, প্রথমে হল থেকে রোহান নামে এক ছাত্রলীগের কর্মীকে বের করতে গেলে শিবির কর্মীরা বাধা দেয়। পরে তাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্কের একপর্যায়ে ছাত্রলীগের রোহান পালিয়ে যায়।



