সাক্ষাৎকার : ড. হোসেন জিল্লুর রহমান

রাজনৈতিক বিভক্তি দূর করতে সাংস্কৃতিক উত্তরণ প্রয়োজন

এখন অনেক উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, অনেক কথাবার্তা হচ্ছে, অনেক ভালো ভালো উদ্দেশ্য উচ্চারিত হচ্ছে। কিন্তু সামগ্রিক অর্থে একটা অনিশ্চয়তার আবহ বিরাজ করছে।

রাশিদুল ইসলাম
Printed Edition
সাক্ষাৎকার : ড. হোসেন জিল্লুর রহমান
সাক্ষাৎকার : ড. হোসেন জিল্লুর রহমান

শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, রাজনৈতিকদলগুলোর বিভক্তি দূর করতে রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটা উত্তরণ দরকার। বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ এক অর্থে বিভাজনের চেয়েও সুবোধভাবে একটা ঐকমত্যের জায়গায় আছে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্ব একাট্টা হয়ে দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। এমনকি পেশাজীবীদের মধ্যে নিচুমানের বিভাজন রয়েছে অথচ বেশির ভাগ মানুষ দেশকে এগিয়ে নেয়ার ব্যাপারে একমত পোষণ করে। নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, প্রস্তুতি ও সক্ষমতার অভাবে আমরা জাতীয় স্বার্থে অন্য দেশের সাথে দরকষাকষিতে পেরে উঠছি না। এতে জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিতে হচ্ছে।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, এখন অনেক উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, অনেক কথাবার্তা হচ্ছে, অনেক ভালো ভালো উদ্দেশ্য উচ্চারিত হচ্ছে। কিন্তু সামগ্রিক অর্থে একটা অনিশ্চয়তার আবহ বিরাজ করছে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার যে একটা বিষয় সেখানে ঐক্যবদ্ধ করার সফলতার ঘাটতি দেখছি।

বিদ্যুৎ ও অংশীদারিত্ব গবেষণা কেন্দ্রের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন এবং বাণিজ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, যুক্তরাজ্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগ, ডেনিশ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, সুইডিশ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা, টেকসই উন্নয়ন কমিশন, অ্যাকশন এইড, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সংস্থার পরামর্শদাতা হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। বাংলাদেশের নীতি নির্ধারক ও সুশীলদের অন্যতম ড. হোসেন জিল্লুর রহমান ব্র্যাকের গ্লোবাল বোর্ডের সিনিয়র ট্রাস্টি।

নয়া দিগন্ত : আপনারা পিপিআরসির নেতৃত্বে পানি সম্পদ, পয়ঃনিষ্কাশন ও বিশুদ্ধতা নিয়ে বড় ধরনের কাজ করছেন, কিন্তু এ ধরনের উদ্যোগের ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি থাকায় ইতোমধ্যে অন্তত ঢাকার চার পাশের নদীগুলোর দূষণ মারাত্মক আকারে পৌঁছে গেছে। এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা কিভাবে সম্ভব?

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান : আপনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের এ্যাঙ্গেলটা নিয়ে আসছেন, সেটা হচ্ছে যে, আমরা ওয়াশ (ধিংয) নিয়ে যে আলোচনাটা হচ্ছে ওয়াটার সোর্স বা একসময়ে পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও বিশুদ্ধতার কথা বলতে গেলে টিউবওয়েলের কথাই বলা হতো। নব্বই দশক পর্যন্ত মূলত হ্যান্ডটিউবওয়েল আরো কোথায় বসানো যাবে, কিভাবে বসানো যাবে এগুলো ছিল আলোচনা। এখন একটা হলিস্টিক আলোচনাটা খুব জরুরি হয়ে উঠছে। ওভারঅল এ লিংকটা করা ওয়াটারের সাথে পার্টিকুলার ল্যান্ড এটা খুব জরুরি। সেটা করলেই আমাদের যেটা আসছে আমরা কিভাবে আমাদের সারফেস ওয়াটারের উৎস যেগুলো আছে ব্যাসিকেলি নদনদী তো এগুলোর ব্যবহারটা কী, সার্বিকভাবে পানির প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা কি? এখানে আমরা যেটা দেখি যে সার্বিকভাবে দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে কয়েকটা উপাদান আছে, একটা হচ্ছে আমাদের একধরনের অপরিকল্পিত উন্নয়ন, রাস্তা বানায় দাও, সেতু বানিয়ে দাও, ওই পরিকল্পনাগুলো আছে কিন্তু এটার সাথে ভারসাম্যমূলক চিন্তাটা নেই। প্রথমে যেটা প্রয়োজন সেটাকে প্রাধান্য দিয়ে উন্নয়ন, আমরা এটা করছি না যে ভারসাম্য যে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নদী, জল, পানি এবং জমি এগুলোর সবগুলোর ব্যবহারে ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তা করা, ভূমির ব্যবহার এ বিষয়গুলোর এখানে ঘাটতি আছে। সো একটা পার্ট হচ্ছে যে ধরনের উন্নয়ন চিন্তার মধ্যে আমরা ডুবে আছি তার ফলে সারফেস ওয়াটার বা পানির স্তরগুলো একধরনের ড্যামেজ হচ্ছে।

আরেকটা জিনিস হচ্ছে এটার ফলে অনেক নেগেটিভ প্রভাব আছে, সে বিষয়গুলো আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে আরেকটা প্রবণতা এবং সেটা হচ্ছে এসেনসিয়ালি আমরা এখন নদীখেঁকো একটা শব্দের সাথে পরিচিত, অনেক কিছু খেঁকোর মধ্যে নদীখেঁকো শব্দটা এসেছে, এ যে আমরা বালু উত্তোলন এটাতো রীতিমতো একেবারে পরিষ্কার দেখা যায় পাড় ভেঙে যাচ্ছে, নদীগুলোর প্রতি উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটা ভারসাম্যের ধারণাটা বাদ দিয়েছি, দুই নম্বর হচ্ছে দূষণের ধারণাটা আমাদের মধ্যে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। বুড়িগঙ্গা যেমন একেবারে দূষণের অন্য স্তরে চলে গেছে, তৃতীয়ত এটার সাথে সুশাসনের বিষয়টা জড়িত আছে। সিম্পলি আমরা নদীকে খেয়ে ফেলছি। সীমানা পিলার দিলে দেখা যাবে ওটা নিয়ে কত ধরনের খেলা চলে। অফিসিয়াল এবং নন-অফিসিয়ান নেক্সাসগুলো মিলেই এগুলো করে।

নয়া দিগন্ত : কিন্তু ঢাকার মতো শহরের চারপাশে এতগুলো নদী, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু, এটাতো একটা সৌভাগ্য নয়কি, নদীভিত্তিক যাতায়াত, পর্যটন, পরিবেশ উন্নয়ন, বিনিয়োগ সবই তো হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে...

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান : এটাতো আমরা একেবারেই করতে পারি নাই কারণ নদীগুলো নিয়ে আমরা যে উদ্দেশ্যে উন্নয়নের চিন্তা করেছি সেটাও কিন্তু আরো বহুগুণ ভালো হতে পারত। কিন্তু অপরিকল্পিত এবং সার্বিক চিন্তা না করে একধরনের উন্নয়ন মাইন্ডসেট, বিশ্বের নামকরা সব শহরের দিকে তাকান দেখবেন নদীটা হচ্ছে অন্যতম সেন্ট্রাল একটা দিক, আপনি লন্ডন, প্যারিস, টোকিও, ব্যাংকক, নিউ ইয়র্ক বলেন এসব শহরে নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা গড়ে উঠেছে। নদীগুলো আমরা ধ্বংস করে দিয়ে, জায়গা সঙ্কোচন করে এবং এগুলো যে বৃহৎ কোনো পরিকল্পনা তা না, এ হচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থ তার নিজের প্রয়োজনে এটা অ্যাকোমেট করতে করতে এ পর্যন্ত আসলেও এখানে সেই অর্থে আমাদের রাষ্ট্র কোনো জোড়ালো অবস্থান নিতে পারে নাই। নদী কমিশন আছে একটা, তারাই হয়তো নদী খাওয়ার বিষয়গুলোকে একধরনের কাভার দেয়।

নয়া দিগন্ত : নদী কমিশনের সাথে আবার যৌথ নদী কমিশনের কথাও আসে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ও অভিন্ন নদীর পানি হিস্যার বিষয়টি। চীনের সাথে ব্রহ্মপুত্রের পানি নিয়ে বেসিনভিত্তিক হিস্যার ব্যাপারে আলোচনা চলছে, আমরা এখানে কিভাবে পানির নায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে পারি।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান : এটা যে একটা ইস্যু সে হিসেবে তো চিন্তা করতে হবে, তা না হলে নিশ্চিত করতে পারব না। বেসিনভিত্তিক পানির হিস্যা যেমন মেকং ডেল্টা সেখানে হয়েছে, ইউরোপে অনেক যুদ্ধ হয়েছে নদীর পানি হিস্যা নিয়ে, কিন্তু সমাধান হয়েছে পরে, তার ফলশ্রুতিতে ওরা উন্নতিও করেছে। আমাদের এখানে ডেফিনিটলি বেসিনভিত্তিক চিন্তাটা খুবই জরুরি। চায়না এমনকি ভারতবর্ষের সাথেও আমাদের এখানে গুরুত্বপূর্ণ এবং অন্যান্য যে নেপাল, ভুটান আছে, তাদের সাথেও আমাদের আলোচনা খুবই প্রয়োজন। আর এটার সাথে তো অন্যান্য অনেক কিছুই আছে, নদীগুলোতো অ্যাক্টিভ, অনেক জায়গায় দেখা যায় নদীগুলো মৃতপ্রায়, কিন্তু আমাদের এখানে প্রতিবছর বৃষ্টি হচ্ছে, প্রতিবছরই নদীগুলো নবায়ন হচ্ছে, কন্টিনিউয়াসলি নবায়ন হচ্ছে, তাই আমাদের এখানে অ্যাক্টিভ ডেল্টা কনটেক্সে এটাকে আরো দ্বিগুণ গুরুত্ব দিয়েই বেসিন ওয়ার্কগুলো চিন্তা করতে হবে। কিন্তু এ চিন্তাগুলো কারা করবে? এ চিন্তা করার জন্যে তো সক্ষমতা লাগবে। চিন্তার সক্ষমতা তৈরিতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ওই ধরনের বিষয়গুলো পড়াতে পারছি না। কোর্স আছে কি না, স্পেশালাইজড বডি আছে কি না, যারা নদীগুলোর বেসিন ওয়াইড ডিসকাসন করবে, পানির বিভিন্ন ডাইমেনশন তুলে ধরবে, গবেষণা করে দেখাবে? আমরা পিপিআরসি থেকে একবার ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফ ফান্ড করেছিলাম পানি নিয়ে, এ ধরনের সক্ষমতার একাধারে অনেক ডাইমেনশন আছে, একটা অর্থনৈতিক, আরেকটা সামাজিক ও আরেকটা সাইন্টিফিক মানে মরফোলজি রিভার কারেন্টস মানে এটা হচ্ছে সাইন্টিফিক টার্ম, আরেকটা হচ্ছে যে রাজনৈতিক। এটাতো সার্বিকভাবে আবার ভূরাজনৈতিক একটা বিষয়। ভূরাজনৈতিক এসব বিষয়ে সক্ষমতা খুব জরুরি।

নয়া দিগন্ত : তো এ সক্ষমতা অর্জন করতে না পারলে চীন বা ভারতের মতো দেশগুলোর সাথে নদীর পানি নিয়ে ন্যায্য হিস্যা আদায়ে দর কষাকষিতে কিভাবে যাবো?

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান : সক্ষমতা তৈরির বিষয়টা তো আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা আমলাতন্ত্রের পদের জন্যে যেভাবে প্রচণ্ড উৎসাহী, এ যে সিনিয়র সচিব একটা পদ উদ্ভাবন করলাম, এটার সাথে পেশাদারিত্বের কী সম্পর্ক আছে? এটাতো হচ্ছে পদ বাগাবার বিষয়। জ্ঞানভিত্তিক যে পেশাদারিত্ব খুব জরুরি, এটাতে যদি আমরা নজর না দেই তাহলে মিটিংয়ে কী নিয়ে যাবো, এসব মিটিং বা দরকষাকষিতে তারাই এগিয়ে যায় যারা প্রিপেয়ারড হয়ে আসে। তাদের নোটসগুলো টু দি পয়েন্ট আপডেটেড ডেটাভিত্তিক এবং সবাই একসাথে কথা বলে।

নয়া দিগন্ত : আগামী বছর ভারতের সাথে গঙ্গা চুক্তি নবায়ন হবার কথা, আমাদের কী ধরনের প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন?

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান : গঙ্গা চুক্তি নবায়ন নিয়ে এখন থেকেই সার্বিক একটা প্রস্তুতি দরকার এ অর্থে যে আমাদের ইস্যুগুলো কী কী? এই যে আমাদের যে একটা পানির হিস্যা, এটা হচ্ছে একটা ন্যারো লেনদেনের বিষয়, দুই স্তরে জিনিসটাকে অ্যাড্রেস করা দরকার। একটা হচ্ছে হিস্যাভিত্তিক আলোচনা, যেটা লেনদেনের বিষয়, আরেকটা হচ্ছে, যৌথ স্বার্থের ব্যাপার, সার্বিকভাবে পুরো এলাকার উন্নয়নের জন্যে আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের সময়কালে কী কী ধরনের যৌথ উদ্যোগ নিতে পারি। সেটা শুধু হিস্যাভিত্তিক আলোচনার মধ্যে আটকে থাকলে হবে না। উইন্ড উইন্ড সিচুয়েশন তৈরি করা, আমরা এখানে নদীগুলোর নানামুখী অর্থনৈতিক দিকগুলো, নেভিগেশনের বিষয়, পর্যটনের বিষয় আছে, ভূকৌশলগত একটা ব্যাপার আছে।

নয়া দিগন্ত : সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর ভারতীয় সর্বদলীয় ৭টি প্রতিনিধিদল বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করতে যাচ্ছে, দেশটির অবস্থান তুলে ধরতে, তো নদীর পানির হিস্যা বা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আমাদের দেশে এ ধরনের সর্বদলীয় উদ্যোগ তো হতে পারে, অন্তত একাট্টা হয়ে জাতীয় ইস্যুতে লড়াইয়ের অবস্থানে দাঁড়ানো...

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান : এমন উদ্যোগ নিতে পারি এবং এটাতো নেয়া উচিত ছিল। এটা রাজনৈতিক সরকার বা স্বৈরাচার সরকার যে পড়ে গেল তারা তো তাদের টিম গেছে বাইরে, কিন্তু তাদের টিম কী উদ্দেশ্যে গেছে? ওইযে গুণগান করা এবং রোড শো’র নামে পয়সা অপচয় করা। আজকের বিশ্বে রাষ্ট্রীয় যে একটা সক্ষমতা তার দু’টি দিক আছে, একটা হচ্ছে হার্ড পাওয়ার, আমার মিলিটারি মাইট কেমন ইত্যাদি, আরেকটা হচ্ছে সফট পাওয়ার, একটা তো অর্থনৈতিক ক্ষমতা, সেটার বাইরেও একটা সফটপাওয়ার। এ সফট পাওয়ার হচ্ছে এসব বিষয়, আমি দক্ষতার সাথে আমার বিষয়গুলোকে কিভাবে বিশ্বকে বুঝাতে পারছি, আমি কোথায় সেখানে খুবই গ্রহণযোগ্যভাবে লিখছি, আমি কিভাবে কাদের সাথে শুধু সরকারি পর্যায়ে নয়, তাদের এক্সপার্টগ্রুপের সাথে আলোচনা করতে পারছি, এখানে তো আপনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বলেছেন, এসব জায়গায় যে সফট পাওয়ার এ জায়গায় কিন্তু আমাদের চিন্তা নাই এবং আমাদের অন্তর্বর্তী সরকার উদ্যোগ নিতে পারতেন, নেয়নি ওনাদের হয়তো অন্য অনেক কিছুর মধ্যে ওনারা আটকে আছেন সে জন্য পারেননি, কিন্তু শুধু রাজনৈতিক নয়, সক্ষম ও মর্যাদার জায়গায় বিশ্বে বাংলাদেশকে যেতে হবে, আমাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করতে হবে, আমাদের হার্ডপাওয়ারকে, হার্ডপাওয়ার বলতে কখনো কোনো দেশকে আক্রমণ করতে নয়, কিন্তু আমরা আমাদের যেন ডিফেন্ড করতে পারি সে ধরনের বোথ ডাইনামিক ওয়েতে এবং থার্ডটা হচ্ছে ভেরি ইমপরটেন্ড ওয়ে সফট পাওয়ার, এ সফট পাওয়ারের মধ্যে এটা একটা বিষয়, যেটাকে বলব আমরা ব্রান্ডিং ডিপ্লোমেসি, ব্রান্ডিং শব্দটা অবশ্য হাসিনার যুগে বেশি অপব্যবহার করা হয়েছে, আমি এটাকে বলব যে, একটা কার্যকর কূটনীতি গড়ে তুলতে হবে।

নয়া দিগন্ত : কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে বিভাজন তাতে আমরা কতদূর যেতে পারব? রাজনৈতিক বিভক্তির জন্যে জাতীয় ইস্যু একসাথে অ্যাডড্রেস করা যাচ্ছে না, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য স্বৈরতন্ত্রে পরিণত হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো, গণহত্যার মতো জঘন্য ঘটনা ঘটানো হয়েছে, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করতে হচ্ছে তো এগুলো তো মানুষের ওপর আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের ওপর প্রচণ্ড নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি করছে।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান : এসব হচ্ছে কারণ রাজনৈতিক বিভাজনগুলো ঠিক করতে রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটা উত্তরণ দরকার। আরেকটি বিষয়, বাংলাদেশে একটা দুঃখজনক হচ্ছে ঠিক আছে রাজনৈতিক বিভাজন থাকতে পারে বা আছে কিন্তু দক্ষ একটা পেশাদারিত্বের আরেকটা জগৎ আছে রাজনীতির বাইরে সেখানেও তো চরম নিচুমানের বিভাজনগুলো বিরাজ করছে। ডাক্তারদের অ্যাসোসিয়েশনে ডাক্তারি নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না, কার প্রভাব কত, ইঞ্জিনিয়ারদের অ্যাসোসিয়েশনে ইঞ্জিনিয়ারিং আইডিয়া নিয়ে আলোচনা হয় না। শিক্ষাবিদ শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করেন না। সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তাই মতপার্থকের বাইরেও একটা গ্ল্যামার জগৎ আছে, এমন না যে আমরা শূন্য থেকে শুরু করছি, শুরু করা দরকার, এমন না যে শুরু করতে কেউ চায় না, বহু মানুষ আছে যারা শুধু বিভাজনের মধ্যে পড়ে আছে এমনটা নয়। আপনি দেখবেন। আমার পার্সোনাল বিলিফ হচ্ছে বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ এক অর্থে বিভাজনের চেয়েও একটা সুবোধভাবে একটা ঐকমত্যের জায়গায় আছে। মনের ভেতরে আর কী। বাংলাদেশ আরো উন্নত হোক। আমাদের সম্মান বাড়–ক। মর্যাদা হোক, আমাদের পরের প্রজন্ম যেনো আরো একটা উন্নত দেশে বসবাস করতে পারে। নিজের দেশটা আরো উন্নত হয়, এসব ব্যাপারে একটা প্রচ্ছন্ন ঐক্যবোধ মানুষের মনের মধ্যে আছে। কিন্তু সেটাকে আমরা প্রাধান্যে আনতে পারছি না। প্রাধান্যে থাকলে সেটা হচ্ছে কুৎসিত প্রতিযোগিতা অথবা অহেতুক বিভাজন অথবা পেশাদারিত্ব মনোভাবের অভাবের মহামারী। শুধু রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের জন্য এটা হচ্ছে তা নয়, আমি বলছি এটা পেশাজীবী জগতেরও একটা কমপ্লিট ব্যর্থতা।

নয়া দিগন্ত : আপনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা আছে, এখনো অনেকে সেই দায়িত্ব পালন করছে, কোনো পার্থক্য টের পাচ্ছেন?

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান : আমি ওটার সাথে এটার তুলনা করব না কারণ ওটা একটা ভিন্ন প্রেক্ষিত ছিল, এখন তো ডেফিনিট একটা ইয়ে আছে যে আমাদের অনেক উদ্যোগ হচ্ছে, অনেক কথাবার্তা হচ্ছে, অনেক ভালো ভালো উদ্দেশ্য উচ্চারিত হচ্ছে। কিন্তু সামগ্রিক অর্থে একটা অনিশ্চয়তার আবহ কিন্তু বিরাজ করছে। অনিশ্চয়তা হচ্ছে কী হবে, আবার সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার যে একটা বিষয় সেখানে ঐক্যবদ্ধ করার সফলতার ঘাটতি দেখছি।

নয়া দিগন্ত : এই অনিশ্চয়তা কেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে কি রাজনৈতিক দলগুলোর দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে, সংস্কার, নির্বাচন-স্থানীয় নির্বাচন আগে নাকি জাতীয় নির্বাচন আগে এমন সব মতপার্থক্য তো স্পষ্ট হয়ে উঠছে?

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান : উদ্দেশ্য আছে, উদ্যোগ হয়তো আছে, কিন্তু কার্যকরভাবে আমি তো দেখছি বিভাজনগুলো আরো উঠে আসছে কিন্তু আমি আবারো বলব যে মানুষ কিন্তু ওইটাই চায়, যে একটা ঐক্যবদ্ধভাবে কিন্তু ঐক্যবদ্ধ ওইভাবে হবে না যদি এমন বলা হয় আপনার আমার কথা শোনেন।

নয়া দিগন্ত : তাহলে রোডম্যাপটা কি আমাদের জানা নেই?

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান : রোডম্যাপ নিয়ে তো সার্বিক একটা অনিশ্চয়তা আছেই। এবং রোডম্যাপ যখন উচ্চারিত হচ্ছে, তখন রোডম্যাপের পেছনের উদ্দেশ্যগুলো নিয়ে এক ধরনের আস্থার ঘাটতি আছে।

নয়া দিগন্ত : এ ধরনের আস্থার মধ্যে তো আবার এমন কিছু ইস্যু আসছে যেমন করিডোর ইস্যু, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন দীর্ঘদিন ধরে সম্ভব হয়নি, মিয়ানমার শুধুই আশ্বাস দিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশী বিনিয়োগ, রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের এসব বিষয় বাস্তবায়নের ব্যাপারে কোনো ম্যান্ডেট নেই।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান : না সরকারের ম্যান্ডেট বলতে দেখুন, এই মূহূর্তে যদি একটা সমস্যা থাকে এবং একটা ফাংশনাল সরকার থাকে তাহলে এটা সমাধান করতে হবে। করিডোর বলেন এ ধরনের বিষয়গুলো তো জাস্ট এক কথায় বলার বিষয় না। বহু দিক আছে, সার্বিক বিবেচনার ব্যাপার আছে। মূলকথা হচ্ছে ভূরাজনৈতিক ভূকৌশলগত যে চিন্তাভাবনা সেখানে সক্ষমতার দরকার। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এখন অস্থিরতা চলছে। আপনি ভূরাজনৈতিক কথা বলছেন কিন্তু সেইটা যারা ডিল করবে, তো অস্থিরতা নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটা ডিল করবে কিভাবে। এই জায়গাগুলো আমাদের একটু উচ্চারণ করা দরকার।

নয়া দিগন্ত : মাতারবাড়ি ডিপ সি পোর্ট হচ্ছে, সেখানে সাধারণ মানুষ হয়তো বেশি দামে জমি বিক্রি করেছেন তো এখন তারা ভূমিহীন, জেলেরা সহজে মাছ পাচ্ছে না। নদীর অনেক দূরে যেতে হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে প্রাণবৈচিত্র্য বিনষ্ট হওয়ার। এ ধরনের মেগাপ্রকল্প এমনভাবে করা হচ্ছে এর সাথে রংপুর থেকে চারলেনের মহাসড়ক এসে যুক্ত হচ্ছে। যার মাধ্যমে উত্তর-পূর্ব ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার জন্যে হাসিনা সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়েছে, এখন ভারত তো আমাদের ট্রান্সশিপমেন্ট দিচ্ছে না।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান : না একমুখী সুবিধা তো দেয়া যাবে না। একমুখী হওয়ার একটা প্রবল প্রবণতা ছিল। এটা আমাদের পতিত সরকার যারা তাদের সময়কালে সব বিষয়গুলো তো একমুখীভাবেই হচ্ছিল। এখন একমুখী যে হচ্ছিল সেই উপলব্ধি তো আমাদের হচ্ছে। এবং আমরা এখানে আমাদেরকে খুবই পরিষ্কার অবস্থান নিতে হবে যে এসব জায়গায় একমুখী কিছু করার স্কোপ নেই। আমাদেরও স্বার্থ আছে তাদেরও স্বার্থ আছে। সেই স্বার্থগুলোর একটা সঠিক বোঝাপড়া হচ্ছে কি না। এবং বোঝাপড়ার মাধ্যমে যে সমাধানগুলো নিতে হবে সেগুলো নেয়া দরকার।

নয়া দিগন্ত : ভারত-বাংলাদেশের জনগণের সাথে জনগণের সম্পর্ক হওয়া কী প্রয়োজন নয়, কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতি মনোযোগ না দিয়ে...

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান : হ্যাঁ সে সমস্যাটা তো ছিলই। আমরা দেখেছি না ১৫ বছর ধরে। এখন অযাচিত বা অযৌক্তিক হস্তক্ষেপের ব্যাপারে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সর্বস্তরে একটা তো মনোভাব পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে। এবং সেটা সঠিকও। সেটা দরকার। আমাদের যদি এক জায়গায় নতুন অবস্থান নিয়ে আসতে হয়। ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্ককে রিডিফাইন্ড করা আমাদের স্বার্থকে সামনে রেখে যে প্রচেষ্টা এটা নিতে হবে। প্রতিবেশী আছে প্রতিবেশী থাকবেই। সেটা সুসম্পর্ক হওয়াই ভালো। কিন্তু সেটা হতে হবে আমাদের স্বার্থ সেখানে জলাঞ্জলি দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আমাদের স্বার্থকে সামনে রেখে চিন্তা করতে হবে। সেখানে সাম ইজ গ্রেটার দেন দি পার্টস ওই একটা উইন উইনের যে জায়গাটা এখানে তো আমাদের অনেকাংশেই ইয়ে হয়েছে একতরফা বিষয়গুলো হয়েছে। সেখান থেকে তো আমাদের অ্যাটলিস্ট একধরনের বিষয়টা এখন জনসমক্ষে খুবই পরিষ্কার। এবং হয়তো কিছুটা রাশ টেনে ধরাও হয়েছে। কিন্তু এটার একটা চলমান হওয়া প্রয়োজন। সবসময় নিজেদের স্বার্থ দৃষ্টির সামনে এবং আমাদের কৌশল তৈরির সময় আমাদের স্বার্থটা বুঝতে হবে ভালো করে। আমার স্বার্থ নিয়ে চিৎকার করলে তো হবে না। আমাদের স্বার্থটা কি সেটা খুব সক্ষমভাবে বুঝতে হবে। এবং সেই অনুযায়ী আমাদের এই সম্পর্কগুলো পুনর্নির্মাণ করতে হবে।

নয়া দিগন্ত : কলকাতা থেকে সিতুই বন্দর হয়ে আরাকানে কালাদান প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করছে ভারত। এ জন্য আরাকান থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হয়েছে। হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে, তাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, নারীদের ধর্ষণ করা হয়েছে। এ ধরনের বিনিয়োগের জন্যে আরাকানকে জনশূন্য করতেই রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে। এখন বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছে, জাতিসঙ্ঘ বলছে তাদের সহায়তা আর দেয়া সম্ভব নয়। মিয়ানমারও তাদের ফিরিয়ে নিচ্ছে না। তো পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিতে পারে।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান : এটা একটা জটিল রাজনৈতিক ও ভূকৌশলগত বিষয়। সেখানে আমরা একধরনের সক্ষমতাহীনভাবে প্রবেশ করা ঠিক হবে না। এখানে বহু খেলোয়াড় আছে। প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য খেলোয়াড়। নানামুখী তাদের প্রকল্পগুলো আছে, আমাদের স্বার্থ খুব পরিষ্কার। একটা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের ফেরত যেতে হবে। কারণ তারা ওই দেশের নাগরিক। আমরা সাময়িক আশ্রয় দিয়েছি, তাদের ফেরত যেতে হবে। দ্বিতীয়ত আমাদের সীমান্তগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ওই অঞ্চলে মাদক চোরকারবারিরা খুব সক্রিয়, যা আমাদের যুব সমাজকে ধংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ড্রাগ ট্রেডের অন্যতম একটা রুট বা ক্ষেত্র হয়েছে মিয়ানমার সীমান্ত। আমাদের সমাজে নেগেটিভ প্রভাব পড়ছে অলরেডি। আমাদের সীমান্ত সুরক্ষা রাখাটা অত্যন্ত জরুরি। তৃতীয়ত, এটাকে আমাদের খুবই নজরদারিতে রাখা যাতে আমরা একটা ওভারঅল ইভাল্যুয়েশনে এখানে কার্যকর পার্টনারশিপগুলো ডেভেলপ করতে পারি। চট্টগ্রাম বন্দরকে উন্নয়ন করার সাথে এ অঞ্চলে একটা সার্ভ করার বিষয় আছে। সেখানে বিস্তৃত উন্নয়ন হলে তার একটা প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়বে। আমাদের পণ্য সেখানে যেতে পারে। আরো অনেক ধরনের সুযোগ আছে।