প্রভাবশালীদের দাপটে বিপন্ন নদ-নদী

ব্যর্থতার দায় তদারকি সংস্থার

প্রভাবশালীদের দাপটে বিপন্ন দেশের নদ-নদী। ফলে পানিপ্রবাহ কমে ইতোমধ্যে অনেক নদী মরে গেছে। দখল হয়ে অস্তিত্ব হারিয়েছে অধিকাংশ নদ-নদী। সরকারি ও বেসরকারি একাধিক সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী বিপন্নের জন্য প্রধানত রাজনৈতিক প্রভাব, ভারত, বিভিন্ন সরকারি সংস্থা এবং ক্ষমতাশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থা দায়ী। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, পলি জমা, দূষণ এবং উজানে ভারতের একের পর এক বাঁধ নির্মাণের ফলে পানি সঙ্কটে দেশের নদীগুলো করুণ পরিণতির শিকার হয়েছে।

আবুল কালাম
Printed Edition
বুড়িগঙ্গা দখলের দৃশ্য  : নয়া দিগন্ত
বুড়িগঙ্গা দখলের দৃশ্য : নয়া দিগন্ত

প্রভাবশালীদের দাপটে বিপন্ন দেশের নদ-নদী। ফলে পানিপ্রবাহ কমে ইতোমধ্যে অনেক নদী মরে গেছে। দখল হয়ে অস্তিত্ব হারিয়েছে অধিকাংশ নদ-নদী। সরকারি ও বেসরকারি একাধিক সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী বিপন্নের জন্য প্রধানত রাজনৈতিক প্রভাব, ভারত, বিভিন্ন সরকারি সংস্থা এবং ক্ষমতাশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থা দায়ী। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, পলি জমা, দূষণ এবং উজানে ভারতের একের পর এক বাঁধ নির্মাণের ফলে পানি সঙ্কটে দেশের নদীগুলো করুণ পরিণতির শিকার হয়েছে।

তাদের ভাষ্য, সরকার পরিবর্তনের পর নতুন দখলদাররা দখলে নেমেছে। আর সরকার তাদের অসহায়ত্ব দেখাচ্ছে। এতে প্রভাবশালীরা শক্তির অপব্যবহার করে নদীরপাড় বা জমি দখল করে গড়ে তুলছেন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা আবাসন প্রকল্প। কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সংস্থাগুলোর যথাযথ তদারকি ও আইন প্রয়োগে ব্যর্থতায় এদের দমন সম্ভব হচ্ছে না। এতে মনে হচ্ছে ২০ কোটি মানুষের দেশে নদী কমিশন চালানোর মতো কোনও যোগ্য লোক নেই। তাই নদী রক্ষায় অবিলম্বে জাতিসঙ্ঘের পানি আইনে অনুস্বাক্ষর, ডেল্টা প্ল্যানের পর্যালোচনা এবং জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে শক্তিশালীর করার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

২৩ সালে প্রথমবারের মতো দেশে এক হাজার আটটি নদ-নদীর নাম প্রকাশ করে নদী রক্ষা কমিশন। এর আগে ২০২১ সালে ৬৩ হাজার ২৪৯ জন নদী দখলদারের তালিকা প্রকাশ করা হয়। কিন্তু প্রভাবশালী দখলদারদের চিহ্নিত হওয়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যার কারণে দখল দূষণে বিপন্ন নদ-নদীও উদ্ধার সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশের সব নদীর অবস্থা এখন সঙ্কটাপন্ন। দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তার ধারণা, দেশে এক সময় দেড় হাজারের বেশি নদী ছিল। দখল ও দূষণে এখন মাত্র আড়াইশোর মতো নদী কোনোভাবে টিকে আছে। অধিকাংশ নদীর জায়গা দখল করে সেখানে স্থাপনা গড়ে ওঠায় নদীর কোনো চিহ্নই আর নেই। ঢাকার সব নদী কার্যত খালে পরিণত হয়েছে।

এ বিষয়ে নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, শুধু তালিকা করলেই হবে না; তাদের উচ্ছেদ করতে হবে। নদী দখল ও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন তোলে তিনি বলেন, ডিসিদের তথ্যের ভিত্তিতে এ তালিকা হালনাগাদ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে তালিকা ত্রুটিপূর্ণ থাকে। আমরা স্যাটেলাইটভিত্তিক তালিকা তৈরির পদক্ষেপ নিয়েছিলাম, যা আলোর মুখ দেখেনি। তাই নদী দখল ও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে এ তালিকা তৈরি করে খুব একটা লাভ হবে না।

তিনি বলেন, দেশের দেড় হাজারের মতো নদীর প্রায় সবই দখল ও দূষণের শিকার। শুকনো মৌসুমে আড়াইশোর বেশি নদী প্রায় শুকিয়ে যায়। প্রবাহ কমে যাওয়া, সঙ্কোচন এবং পানির গুণগত মান নষ্ট হওয়ার কারণেই নদীগুলো ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছে। তার দায়িত্বকালে নদী দখলদারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬৫ হাজার। ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এর মধ্যে ৩৩ শতাংশ উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়েছিল। এরপর আর উল্লেখযোগ্য উচ্ছেদ হয়নি।

জাতীয় নদী সম্মেলনে ২৪ সালে প্রকাশিত তথ্যে জানানো হয়, প্রাথমিক তালিকা অনুযায়ী, দেশের ২২৯টি নদী সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় পৌঁছে গেছে। সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি নদী সঙ্কটাপন্ন রংপুর বিভাগে, ৪৩টি। এরপর সিলেটের ৪২টি, খুলনায় ৩৭টি, বরিশালে ৩০টি, ঢাকায় ২৮টি, রাজশাহীতে ১৯টি, চট্টগ্রামে ১৭টি ও ময়মনসিংহে ১৩টি।

সরকারি তথ্য মতে, দেশে নদীর সংখ্যা এক হাজার ৪১৫টি। এসব নদীর কোনোটি অচল নয়; সবগুলোই জীবিত। তবে শুকনো মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীগুলো সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে বলে দাবি করা হয়।

অন্য দিকে, একাধিক বেসরকারি সংস্থা ও নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে এক সময় দেড় হাজারেরও বেশি নদী ছিল। গত কয়েক দশকে তার প্রায় ৮০ শতাংশই প্রাণ হারিয়েছে। বহু নদীর কোনো চিহ্নই আর নেই। দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণের ফলে এসব নদী পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে। আর যেসব নদী এখনো অস্তিত্বশীল, সেগুলোর সবই দখল ও দূষণে নাব্যতা হারিয়ে সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় মৃত্যুর প্রহর গুনছে।

২০২২ সালের নভেম্বরে দেশের নদীর সঠিক সংখ্যা নির্ধারণে নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করে পরিবেশবাদী আইনজীবীদের সংগঠন বেলা। রিটে দেশের নদ-নদীর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির নির্দেশনা চাওয়া হয়। কিন্তু তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সে পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত হয়নি। অথচ নদী রক্ষার দায়িত্বে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট, যৌথ নদী কমিশন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের একাধিক সংস্থা রয়েছে। তারপরও দেশের নদী নিয়ে একটি সমন্বিত ও নির্ভরযোগ্য তালিকা তৈরি করা সম্ভব হয়নি। বরং এসব সংস্থার তথ্যেই রয়েছে বিস্তর গরমিল। বলা হচ্ছে এসব তদারকি সংস্থার গাফিলতিতেই নদীর এ বিপন্ন অবস্থা হয়েছে।

২০২৩ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন এক প্রতিবেদনে দেশে নদ-নদীর সংখ্যা এক হাজার আটটি বলে উল্লেখ করে। একই সংস্থা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সে সংখ্যা জানায় এক হাজার ১৫৬টি। সর্বশেষ ২০২৫ সালে বলা হয়, দেশে নদীর সংখ্যা এক হাজার ৪১৫টি। অন্য দিকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ২০২৩ সালে হালনাগাদ তথ্যে নদীর সংখ্যা এক হাজার আটটি উল্লেখ করলেও ২০২৪ সালে তা বাড়িয়ে এক হাজার ১৫৬ এবং ২০২৫ সালে এক হাজার ২৯৪টি নদীর একটি খসড়া তালিকা প্রকাশ করে। সরকারি প্রতিবেদনে নদীর সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি থাকলেও কোন নদীর কী অবস্থা, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

নদী নিয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি) ২০২৩ সালে স্যাটেলাইট ইমেজ, জেলা প্রশাসনের তথ্য এবং নদী রক্ষা কমিটির প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দাবি করে, বর্তমানে দেশে জীবিত নদীর সংখ্যা ৭৫৪টি। সর্বশেষ পরিসংখ্যানে তারা জানায়, দেশের ৮১টি নদী শুষ্ক মৌসুমে প্রায় পুরোপুরি শুকিয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান (সিনিয়র সচিব) মকসুমুল হাকিম চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, তার কাছে সর্বশেষ কোনো নতুন পরিসংখ্যান নেই। ২০২১-২২ সালের তথ্য অনুযায়ী দেশে নদীর সংখ্যা এক হাজার ৪১৫টি। তবে শুকনো মৌসুমে প্রায় সব নদীতেই পানিপ্রবাহ কমে যায়। কতগুলো নদী মৃতপ্রায়, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি। দখল-দূষণের বিষয়ে তিনি জানান, প্রভাবশালীদের দখলের তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং উচ্ছেদ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

বিরাজমান পরিস্তিতিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ ড. আনু মুহাম্মদের ভাষ্য, মূলত রাজনৈতিক প্রভাব, ভারত, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি তদারকি সংস্থা এবং ক্ষমতাশালী ব্যক্তি, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নদী বিপন্নের কারণ। তাই নদী রক্ষায় অবিলম্বে জাতিসঙ্ঘের পানি আইনে অনুস্বাক্ষর, ডেল্টা প্ল্যানের পর্যালোচনা এবং জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, সরকারি বিভিন্ন পরিকল্পনায় প্রসারিত নদীকে সরু করা হচ্ছে, বিভিন্ন নদী বিনাশী প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। এসব বন্ধ করতে হবে। একইভাবে দেশের মানুষের ক্যানসারসহ বিভিন্ন যে মরণঘাতী রোগ হচ্ছে, এর জন্যেও নদীদূষণ দায়ী।

পরিবেশ বিজ্ঞানী ও স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত বাঁধ, পলি জমা, দূষণ এবং উজানে ভারতের বাঁধ, এ পাঁচটি প্রধান কারণে নদীগুলো সঙ্কটাপন্ন। গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই দশকে নদীর পানিতে ভারী ধাতুর দূষণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, বিশেষ করে বুড়িগঙ্গা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।