নিজস্ব প্রতিবেদক
জেলা সদর বাদে উপজেলা শহরে অধস্তন আদালত পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারণ হবে। একই সাথে নাগরিকের মৌলিক অধিকার খর্ব না করে রাষ্ট্রপতির জরুরি অবস্থা জারির বিধান সংশোধন করার বিষয়েও একমত হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। অতীতে জরুরি অবস্থা জারি রাজনৈতিক কারণে হয়েছে উল্লেখ করে বৈঠকে বিভিন্ন দলের নেতারা বলেন, রাজনৈতিক কারণে জরুরি আইনকে যেন ব্যবহার করা না হয়, সে ব্যাপারে সবাই একমত হয়েছেন।
গতকাল সোমবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভায় বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ অধিকাংশ দল এই দু’টি বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করে। রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দশম দিনের মতো অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ সভাপতিত্ব করেন। এ সময় কমিশনের সদস্য ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. বদিউল আলম মজুমদার, সফর রাজ হোসেন, ড. মো: আইয়ুব মিয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, নাগরিকের কাছে সুবিচার পৌঁছে দেয়ার জন্য উপজেলা পর্যায়ে অধস্তন আদালত সম্প্রসারণ করার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, তবে দল ও জোটগুলো অধস্তন আদালত সম্প্রসারণের জন্য কিছু বিষয় বিবেচনায় নেয়ার জন্য প্রয়োজন মনে করে। দলগুলো মনে করে, যেসব উপজেলা জেলা সদরে অবস্থিত অর্থাৎ সদর উপজেলা, সেসব উপজেলা জেলা জজ কোর্টের অধীন করে সুনির্দিষ্ট করতে হবে। বিদ্যমান চৌকি আদালত দ্বীপাঞ্চল ও এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত উপজেলা আদালত বহাল রেখে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। জেলা সদরের কাছাকাছি উপজেলাগুলোতে প্রয়োজন নেই, এজন্য প্রয়োজনীয় জরিপ করতে হবে। অবশিষ্ট যেসব উপজেলা থাকবে জনসংখ্যার ঘনত্ব অনুযায়ী যাতায়াত সুবিধা, অর্থনৈতিক অবস্থা ও মামলার সংখ্যা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে আদালত স্থাপন করার কথা বলা হয়েছে। অধস্তন আদালতের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ ও অর্থ বরাদ্দ এবং আইনগত সহায়তা উপজেলা পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া- এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ঐকমত্য কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলো আশা প্রকাশ করে সেটা ভবিষ্যতে বাস্তবায়িত হবে।
জরুরি অবস্থার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে উল্লেখ করে আলী রীয়াজ বলেন, দেশের বিদ্যমান সংবিধানে ১৪১ অনুচ্ছেদ নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। এই আলোচনায় দু’টি বিষয়ে একমত হওয়া গেছে। ১৪১ অনুচ্ছেদের ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’, ‘ঘ’ ধারা সংশোধন-বিয়োজনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে। জরুরি অবস্থা কোনোভাবে যেন রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার না হয় সে বিষয়ে একমত হওয়া গেছে। ১৪১ অনুচ্ছেদ নিয়ে আগামী বৃহস্পতিবার আলোচনা শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারব।
এর আগে বৈঠকের শুরুতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, কোনো কিছু চাপিয়ে দিচ্ছে না ঐকমত্য কমিশন। রাজনৈতিক দলগুলোর অনুভূতি এবং বক্তব্য ধারণ করে সংশোধন প্রস্তাব আনছে কমিশন। তিনি বলেন, জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল নিয়ে অধিকাংশ দলের আপত্তি থাকার কারণে ভিন্ন ভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে কমিশন। অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে যাতে কোনো ভুল বুঝাবুঝি না হয়, সেদিকে কমিশন নজর রাখছে। এর ফলে অনেক কিছু বাদ দিয়ে আমরা আলোচনায় অংশগ্রহণ করছি।
রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে ইতিবাচক আলোচনা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। যতটা সম্ভব বেশি সময় মিলিত হয়ে যেন দ্রুত কাজ শেষ করা যায়, সেজন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। আলোচনায় নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শন এই তিনটি বিষয়ে আলোচনা হওয়ার ক্ষমতা রয়েছে।
জরুরি অবস্থা আইন সংশোধনের বিষয়ে একমত বিএনপি : বৈঠক শেষে ব্রিফিংকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জরুরি অবস্থা আইন সংশোধন এবং পরিবর্তন আনয়নের ক্ষেত্রে আমরা সবাই একমত হয়েছি এবং জরুরি আইন যেন কোনোভাবে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত না হয় সে বিষয়েও আমরা সবাই একমত হয়েছি।’ তিনি বলেন, আজকের আলোচনা ছিল জেলা আদালত বিকেন্দ্রীকরণ। সে বিষয়ে একমত পোষণ করা হয়েছে, তবে কিছু বিষয় সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। জেলা সদরে উপজেলা আদালত প্রয়োজন নেই, জেলা আদালতে একটি সদর আদালত স্থাপন করা যেতে পারে। ব্রিটিশ আমলের চৌকি হিসেবে চিহ্নিত ছিল দ্বীপ অঞ্চল এবং কিছু কিছু উপজেলায় আদালত আছে। তার সংখ্যা ৬৭টি। সেগুলো প্রতিষ্ঠিত থাকবে। জেলা সদরে কাছের উপজেলাগুলো ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটারে মধ্যে থাকলে সে উপজেলায় আদালত স্থাপনের প্রয়োজন নেই। তবে সদর থেকে দূরে ১০০ কিলোমিটার এবং জনসংখ্যা বেশি সে উপজেলায় আদালত করা যায়।
‘আপনারা (বিএনপি) তো ১৯৯১ সালে উপজেলা আদালত বাতিল করেছেন, এখন আবার চাচ্ছেন কেন?’ এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসে এবং তখনকার জাতীয় সেন্টিমেন্টে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া উপজেলা আদালতগুলো তুলে দেয়ার ক্ষেত্রে একমত হয়। সে বিষয়ে জাতীয়ভাবে কোনো আপত্তি আসেনি। জনসংখ্যা, দ্বীপ অঞ্চল ভেদে সেই এলাকাগুলোতে এখনো অধস্তন আদালত আছে। যেটির সংখ্যা ৬৭। এখন একটা প্রেক্ষাপট এবং বিবর্তনের মধ্যে যাচ্ছি, বর্তমান প্রজন্মের প্রয়োজনে ও জনগণের স্বার্থে সেই বিবেচনা তো পাল্টাতেই হয়।
বিচারব্যবস্থাকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে চায় জামায়াত : জরুরি অবস্থা জারির বিধান সংশোধন এবং উপজেলা পর্যায়ে অধস্তন আদালন পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারণের বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছে জামায়াতে ইসলামী। কমিশনের সাথে বৈঠক শেষে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘জেলা পর্যায়ে আদালত আছে, এটা সম্প্রসারণ করার ব্যাপারে ঐকমত্য কমিশনের সাথে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে। উপজেলা পর্যায়েও পর্যায়ক্রমে অধস্তন আদালত চালু করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘৪৯৫টি উপজেলা, তার মধ্যে ডিস্ট্রিক্ট হেডকোয়ার্টারে বা সদর উপজেলায় প্রয়োজন নেই। কারণ এখানে মূল স্পিরিটটাই হলো বিচারপ্রার্থীর কষ্ট দূর করা।’
আযাদ বলেন, ৫ আগস্টের জন-আকাক্সক্ষা মোতাবেক এ চাওয়া। আমরা বিচারব্যবস্থাকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে চাই। কারণ একজন বিচারপ্রত্যাশীর উপজেলা থেকে জেলায় যেতে অর্থ, সময় বেশি খরচ হয়। আমরা বলেছি, ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ, দুর্ভোগ থেকে মুক্তি এবং বিচার সহজীকরণ ও মামলার চাপ কমানোর জন্য আমরা এটাকে সমর্থন করেছি। আমরা প্রস্তাব দিয়েছি, পর্যায়ক্রমে উপজেলা পর্যায়ে বিচার আদালত নিয়ে যাওয়া হয়। এবং উপজেলার চৌকি আদালতকে যেন স্থায়ী আদালতে পরিণত করা হয়। জনগণের আকাক্সক্ষাকে বাস্তবায়িত করতে হবে, সুনিশ্চিত বিচারব্যবস্থা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে।
জরুরি অবস্থা ঘোষণা সম্পর্কিত বিধান সম্পর্কে জামায়াতের এই নেতা বলেন, ‘বিদ্যমান সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে আর্টিকেল ১৪১-এর ক, খ, গ তিনটা জিনিস প্রস্তাবে আনা হয়েছে। প্রথম কথা হচ্ছে কোন কোন ক্ষেত্রে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা যাবে। এ বিষয়ে সবাই প্রায় একমত, দ্বিমত নেই। নীতিগতভাবে এই বিধানটা রাখা এবং সেই ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক গোলযোগ এবং মহামারী, যুদ্ধ, বহিরাক্রমণ এই জিনিসগুলোর ব্যাপারেও সবাই এই স্পিরিটের সাথে একমত।’
পরবর্তী সংসদের কাছে সংস্কারের কার্যভার ছেড়ে দেয়ার পক্ষে নয় এনসিপি : ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় সংস্কার বিষয়টাকে সংসদের দিকে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যসচিব আখতার হোসেন। তিনি বলেছেন, এনসিপি মনে করে সংস্কারের ম্যান্ডেট এ সরকারের হাতেই রয়েছে। আমরা যারা ঐকমত্য কমিশনে বসছি, জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছি। আমরা সংস্কারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার অধিকার রাখি। পরবর্তী সংসদের কাছে সংস্কারের কার্যভারকে ছেড়ে দেয়ার আমরা পক্ষপাতী নই।
কমিশনের সাথে বৈঠক শেষে ব্রিফিংকালে তিনি বলেন, জুলাই সনদকে নিছক ডকুমেন্ট, নিছক একটি দলিল হিসেবে উপস্থাপন করার যে চিন্তা অনেকের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে তার বিপক্ষে অবস্থান করি। আমরা মনে করি যে জুলাই সনদের মধ্য দিয়ে যে মৌলিক সংস্কারের রূপরেখা বাস্তবায়িত হবে, সেটা বাংলাদেশের সামনের রাজনীতিকে নির্ধারণ করবে। সামনের বাংলাদেশের কাঠামোকে নির্ধারণ করবে এবং সেই কাঠামোকে কিভাবে বাস্তবে রূপান্তরিত করা যায়, রেকটিফিকেশনের পদ্ধতি কী হতে পারে, সেই ব্যাপারে যদি কেউ শুধুমাত্র সংসদের ওপর নির্ভর করতে চায় এবং কমিশন যদি সংসদের দিকেই তাদের আলোচনাকে অগ্রগতি করতে থাকে, সেক্ষেত্রে অবশ্যই আমরা মনে করব যে ঐকমত্যের আলোচনা অবশ্যই কার্যকর হবে না।
আখতার বলেন, সেক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ হলো অবশ্যই বাংলাদেশের নতুন কাঠামোকে বাস্তবায়ন করতে নতুন বন্দোবস্তকে বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য কার্যকর করতে গণপরিষদ নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। গণপরিষদ নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে সেখানকার আলাপ আলোচনা তর্ক এবং নানা ধরনের ঐকমত্যের ভিত্তিতে নতুন একটি সংবিধান প্রণয়ন করে সংস্কারের প্রস্তাবনাগুলোকে কার্যকর করতে হবে।
বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপনে ঐকমত্যের বিষয়ে আইনজীবীদের বিরোধিতা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আখতার হোসেন বলেন, ইতঃপূর্বে ঢাকার বাইরে হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপনের সময় গুটিকয়েক আইনজীবী বা বিচারপতিদের স্বার্থের কারণে জনকল্যাণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। আমরা দিন দশেক আগের পরিস্থিতিতে নেই। নতুন বাংলাদেশে নতুনভাবে বাংলাদেশ থেকে সাজানোর স্বপ্ন দেখছে। মানুষের দোরগোড়ায় বিচারের ব্যবস্থাপনা নিয়ে যেতে হবে। মানুষ সহজে বিচার প্রাপ্তি করতে পারবেন, এটা নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। আমরা মনে করি বাংলাদেশের আইনজীবীরা, বিচারপতিরা ব্যক্তিগত স্বার্থকে উপেক্ষা করে জনগণের স্বার্থের প্রতি তারা অবশ্যই মনোযোগী হবেন।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাথে গতকালের বৈঠকে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি ছাড়াও ইসলামী আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ, গণসংহতি, সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিগণ অংশগ্রহণ করেন। গতকালের বৈঠকে নারী প্রতিনিধিত্ব বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি। আগামী বৃহস্পতিবার পরবর্তী বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা হবে।



