ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) মনিরুল হকের জবানবন্দী

গুলি করার পর পেট কেটে নদীতে ফেলা হতো, শুনেছিলাম ৪-৫ রাউন্ড গুলির শব্দ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার মানবতাবিরোধী অপরাধ

Printed Edition

আলমগীর কবির

রাতের আঁধারে বিষখালী নদী আর বঙ্গোপসাগরের শান্ত মোহনায় জলতরঙ্গের যে শব্দ ভেসে আসত, তা মোটেও প্রকৃতির কোনো চিরন্তন সুর ছিল না। তা ছিল মতার অন্ধ দাপটে নিখোঁজ হওয়া কিছু অভাগা মানুষের জীবনপ্রদীপ নিভে যাওয়ার করুণ আর্তনাদ। কোনো বিচার বা আইনি প্রক্রিয়া নেই; কেবল অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে চোখ ও হাত বাঁধা কিছু নিথর দেহকে নদী আর সাগরের অতল গহ্বরে চিরতরে তলিয়ে দেয়ার এক নৃশংস উৎসব চলত সেখানে। সেই ভয়াল স্মৃতির ঢাকনা সরিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এক সাবেক সেনা কর্মকর্তা যখন সত্য উচ্চারণ করলেন, তখন কেঁপে উঠল পুরো আদালত ক।

গুম ও হত্যার ঘটনায় বরখাস্ত হওয়া মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গতকাল বৃহস্পতিবার স্যা দিয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) মো: মনিরুল হক।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সকাল সাড়ে ১০টার পর সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা কাঠগড়ায় বসে তার রোমহর্ষক জবানবন্দী প্রদান করেন। এ সময় প্রসিকিউটরদের পে মিজানুল ইসলাম, শাইখ মাহদী ও আব্দুস সাত্তার পালোয়ান উপস্থিত ছিলেন। অপরদিকে আসামিপে উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী সাইদুর রহমান ও নাজনীন আহসান। স্যাগ্রহণকালে আসামি জিয়াউল আহসান এজলাস করে কাঁচের দেয়ালে ঘেরা কাঠগড়ায় চেয়ারে বসে গম্ভীর মুখে নিজের বিরুদ্ধে দেয়া এই মারাত্মক জবানবন্দী শোনেন ও নোট নেন।

সা্েয মনিরুল হক তুলে ধরেন, কিভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পর প্রমাণের চিহ্ন মুছে ফেলতে বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদস্য নজরুলসহ কয়েকজনের পেট কেটে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিল। তার এই জবানবন্দীর মূল তীর ছিল র‌্যাব সদর দফতরের তৎকালীন ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের ডাইরেক্টর লেফট্যানেন্ট কর্নেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে।

বর্তমানে অবসরে থাকা ৬২ বছর বয়সী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) মো: মনিরুল হক কাঠগড়ায় জানান, তিনি ১৯৯০ সালের ২২ জুন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্সে লেফটেন্যান্ট পদে কমিশন পান এবং ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে স্বাভাবিক অবসরে যান। ২০০৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০১২ সালের মার্চ পর্যন্ত তিনি র‌্যাব-৮ বরিশালে অধিনায়ক (সিও) হিসেবে প্রেষণে নিয়োজিত ছিলেন।

তার সময়কালে র‌্যাব-৮-এর উপঅধিনায়ক (টু-আই-সি) ছিলেন মেজর কুতুব ও মেজর সাব্বির রহমান ওসমানী। র‌্যাব সদর দফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে ছিলেন খন্দকার হাসান মাহমুদ ও মোখলেছুর রহমান। অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তৎকালীন কর্নেল গুলজার, কর্নেল রেজা নূর, কর্নেল মিজান, কর্নেল এস এম মতিউর রহমান, কর্নেল জাহাঙ্গীর ও কর্নেল মজিবুর রহমান।

মনিরুল হক জানান, র‌্যাব সদর দফতরে প্রতি মাসে মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘সিও’স কনফারেন্সে’ র‌্যাবের সকল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত থাকতেন। ব্যাটালিয়ন অধিনায়করা দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে থানায় সোপর্দ করার পর তারা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে এসে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়লে ব্যাটালিয়নের করণীয় নিয়ে নির্দেশ চাইতেন।

তখন তৎকালীন র‌্যাব মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান ‘ওয়াজিবাতুল কতল’ শব্দটি ব্যবহার করে বলতেন ধৃত অপরাধীদের েেত্র ঐ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে।

তিনি আরো জানান, সদর দফতরের ইন্টেলিজেন্স ডাইরেক্টর লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান ও মিডিয়া উইং ডাইরেক্টর কমান্ডার সোহায়েলসহ অন্য পরিচালকরা সেখানে দিকনির্দেশনা দিতেন। আটককৃতদের কোনো ট্রেস বা চিহ্ন যেন না থাকে, সেজন্য র‌্যাবের ভাষায় এই হত্যা প্রক্রিয়াকে বলা হতো ‘এলিমিনেশন’ বা ‘গলফ’।

জবানবন্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ বিবরণ উঠে এসেছে ২০১০ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে বরিশাল অঞ্চলে পরিচালিত একটি গোপন অভিযানে। মনিরুল হক জানান, গভীর রাতের প্রথমভাগে লে. কর্নেল জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে দুই-তিনটি মাইক্রোবাস র‌্যাব-৮ ব্যাটালিয়নে ঢোকে। সাথে ছিলেন বিশেষ ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি ও লম্বা চুলওয়ালা ফাইট লেফটেন্যান্ট সাইফসহ কয়েকজন অফিসার।

ব্যাটালিয়নের অফিসাররা মনিরুল হককে জানান, গাড়িতে ‘সাবজেক্ট’ (হাত ও চোখ বাঁধা মানুষ) আছে। তাদের পাথরঘাটা নিয়ে যাওয়া হবে। উচ্চপদের নির্দেশের কারণে র‌্যাব-৮ ব্যাটালিয়নকে পাথরঘাটায় বোট রেডি রাখা ও নির্বিঘেœ ফেরি পারাপারের প্রশাসনিক সহায়তা দিতে হয়। মধ্যরাতের পর পাথরঘাটার চরদুয়ানি ঘাট থেকে ট্রলারে করে জিয়াউল আহসান, ফাইট লে. সাইফ, মেজর সাব্বির ও মনিরুল হকসহ অন্যরা মোহনার দিকে রওনা দেন।

নৌকার ছাদ থেকে ঘটে যাওয়া বীভৎস ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে মনিরুল হক বলেন, আমি দেখতে পাই যে, চোখ হাত বাঁধা একজনকে বোটের কিনারায় নিয়ে তার শরীরের সাথে ভারী বয়া বাঁধা হচ্ছিল। বাঁধা হয়ে গেলে একজন ঐ চোখ ও হাত বাঁধা লোককে গুলি করে এবং প্রায় সাথে সাথেই অন্য একজন গুলিবিদ্ধ লোকের পেট ছুরি দিয়ে কেটে ফেলে। এর পরপরই ঐ গুলিবিদ্ধ লোককে পানিতে ফেলে দেয়া হয়। এসব দেখে আমি আবার ছাদের পিছন দিকে চলে আসি। সেখানে থেকে আমি কিছুণের মধ্যেই আরো চার/পাঁচ রাউন্ড গুলির শব্দ শুনতে পাই এবং পানিতে আগের মতোই গুলিবিদ্ধ দেহ ফেলে দেয়ার মতো শব্দ শুনতে পাই।

তিনি বলেন, লাশ যেন পানিতে ভেসে না ওঠে এবং নিচে তলিয়ে যায়, সে জন্যই বয়া ও ভারী বস্তু বেঁধে পেট কেটে নদীতে ফেলা হতো। বোট খুব ধীর গতিতে এগোচ্ছিল এবং দেহগুলোকে কিছু দূরত্বে দূরত্বে ফেলা হয়েছিল।

বিডিআর সদস্য নজরুল ও সাজানো ‘বন্দুকযুদ্ধ’ প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, উক্ত ঘটনার দুই-চার দিন পর বরগুনার শরণখোলা এলাকায় নদীতে একটি পেট কাটা লাশ ভেসে ওঠে। স্থানীয় থানার মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়া চলার মধ্যে র‌্যাব সদর দফতরের ইন্ট উইং থেকে জিয়াউল আহসান র‌্যাব-৮-এর টু-আই-সি মেজর সাব্বিরকে নির্দেশ দেন সে সম্পর্কে খোঁজ নিতে।

‘এর মাত্র কয়েকদিন পরেই আমরা পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি যে, ঐ ভেসে উঠা লাশটি তৎকালীন বিডিআর সদস্য নজরুলের। বিডিআরের গোয়েন্দা সংস্থা ঐ মৃতদেহটির ডিএনএ পরীার মাধ্যমে নিশ্চিত হয় যে ঐ লাশটি নজরুলের। এরকম পরিস্থিতিতে আমার কাছেও মনে হয়েছে এটি একটি প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা যা ঐ তিন/চার জন ব্যাক্তিকে গুলি করে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেয়া হয়েছিল, যার একজন ছিলেন নজরুল।’

এ ছাড়া তিনি ভোলা এবং সুন্দরবনের রাজু ডাকাতবিরোধী ত্রিমাত্রিক অভিযানসহ তিনটি সাজানো অভিযানের কথা ট্রাইব্যুনালে উল্লেখ করেন। ভোলার ঘটনার পর তিনি জিয়াউল আহসান ও অন্যদের সাথে দু’টি ছবি তুলেছিলেন, যা তিনি ‘প্রদর্শনী সিরিজ’ হিসেবে ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, ঐ অভিযানে মৃত দু’জন ডাকাত/সন্ত্রাসীকে আগেই টার্গেট এলাকায় নিয়ে হত্যা করে সাজানো বন্দুকযুদ্ধের গল্প তৈরি করা হয়েছিল।

অবাধ্য হওয়ায় বোটের মাঝি আলকাস ‘নিখোঁজ’ হওয়ার বর্ননা দিতে গিয়ে মনিরুল হক আরো জানান, জিয়াউল আহসানের নির্দেশ ছিল গোপনীয়তা রায় এক মাঝির বোট দীর্ঘসময় ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু বরিশালে ‘আলকাস’ নামের এক মাঝির বোট বারবার ব্যবহার করা হয়েছিল।

একপর্যায়ে জিয়াউল আহসান দাবি করেন, আলকাস মাঝির মাধ্যমে গোপন তথ্য প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে। তিনি র‌্যাব-৮-এর টু-আই-সি মেজর সাব্বিরকে নির্দেশ দেন আলকাস মাঝিকে ‘এলিমিনেট’ করার জন্য। কিন্তু মেজর সাব্বির অন্যায় এই নির্দেশ পালনে অপারগতা প্রকাশ করেন।

‘এর কয়েকদিন পর আলকাস মাঝির পরিবার আমাদের র‌্যাব-৮ ব্যাটালিয়নে আসে এবং জানায় যে, আলকাস মাঝিকে পাওয়া যাচ্ছে না। মেজর সাব্বির আলকাস মাঝিকে এলিমিনেট করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, আবার এই মাঝির মাধ্যমে অনেক গোপন তথ্য প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে তাই তাকে ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের দায়িত্বেই নিখোঁজ করা হয়েছে।’

জবানবন্দীর শেষপর্যায়ে র‌্যাব সদর দফতরের ইন্টেলিজেন্স উইং কিভাবে ‘কমান্ড চেইন’ ভেঙে ব্যাটালিয়নের অফিসারদের অন্যায় কাজে বাধ্য করত, তা কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আদালতের সামনে তুলে ধরেন এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারী কর্মকর্তার জিজ্ঞাসাবাদের বিবরণ দিয়ে জবানবন্দীর উপসংহারে সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মনিরুল হক স্পষ্ট ভাষায় বলেন ‘এ পর্যন্ত আমি আমার বক্তব্যে যেসব অভিযান/অপারেশনের কথা বলেছি তার সবগুলোই অযাচিত, অনিয়ন্ত্রিত এবং অন্যায়ভাবে করা হয়েছে।’