- জড়িত কর্মকর্তারা এখনো বহাল
- চিহ্নিত হলেও শাস্তি পায়নি অভিযুক্ত ৩ প্রেস
প্রাক প্রাথমিকের পাঠ্যবই মুদ্রণের টেন্ডারে অনিয়ম করে সরকারি অর্থ লোপাটের পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে গেছে। ২০২৬ সালের প্রাক প্রাথমিকের বিনামূল্যের ৬০ লাখ ৬৫ হাজার ৬৪৮ কপি বই মুদ্রণের জন্য ৪২ কোটি ৪৯ লাখ ৪৮ হাজার ৯২৯ টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এই বই মুদ্রণের জন্য গত ১৯ মে (বিভিন্ন প্রেস মালিকের আপত্তি অগ্রাহ্য করে) একপেশে এবং ত্রুটিপূর্ণ শর্ত দিয়ে টেন্ডার আহ্বান করে এনসিটিবি। সেই টেন্ডারে মাত্র তিনটি প্রেসকে অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়। যদিও বইয়ের স্পেসিফিকেশন বিগত বছরগুলোতে যেভাবে ছিল তার ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছিল এবারের টেন্ডারের পুরো প্রক্রিয়াতেই।
টেন্ডারের এমন অনিয়মন আর সরকারের অর্থ লোপাটের সব আয়োজন যখন শেষ পর্যায়ে ঠিক তখনই বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি নিয়ে মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক অনুসন্ধান শুরু করে। তাদের অনুসন্ধানে এনসিটিবির শীর্ষ কয়েক কর্মকর্তাকে অনৈতিক সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে নির্দিষ্ট তিনটি প্রেস মালিককে টেন্ডারে অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়ার অভিযোগেরও সত্যতা মিলেছে। সূত্রমতে, ২০২৬ সালের প্রাক প্রাথমিকের বই মুদ্রণের টেন্ডারে কারসাজির আশ্রয় নেয়ার মাধ্যমে অর্থাৎ সব প্রেস মালিককে টেন্ডারে অংশ নেয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার যে কৌশল নেয়া হয়েছিল তাতে সরকারের অতিরিক্ত ১০ কোটি টাকার বেশি অপচয় হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে শেষপর্যন্ত এই অপকৌশল অভিজ্ঞ গোয়েন্দা জালে ধরা পড়ায় এনসিটিবির চিহ্নিত একটি সিন্ডিকেটের কব্জা থেকে সরকারের ১০ কোটি টাকা গচ্ছা যাওয়া থেকে সাশ্রয় হয়েছে। যদিও এখনো পর্যন্ত এনসিটিবির এই সিন্ডিকেট বহাল তবিয়তেই রয়েছে।
সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ তিন কর্মকর্তার ছত্রছায়ায় আরো প্রায় ৮-১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছে এনসিটিবিতে। অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী আমলে যেসব কর্মচারী নিজেদের বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের সৈনিক পরিচয় দিয়ে পুরো এনসিটিবিতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন এখন তারাই গত ৫ আগস্টের পর ভোল পাল্টিয়ে ভিন্ন সুরে কথা বলছেন। গত ৮-৯ মাস বিভিন্নভাবে তারা কোণঠাসা থাকলেও এখন চেয়ারম্যান পদ শূন্য থাকায় নিজেদের মধ্যেই সবকিছু সলাপরামর্শ করে নানা অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারিতা শুরু করেছেন। চিহ্নিত এই সিন্ডিকেট এনসিটিবিকে এখন নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির আঁকড়ায় পরিণত করছেন। অন্য দিকে টেন্ডার জালিয়াত চক্রের সাথে জড়িত চিহ্নিত সেই তিন প্রেস মালিককেও কোনো শাস্তির আওতায় এখনো আনা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে এনসিটিবি এবং প্রেস মালিকদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা দ্রুত সিন্ডিকেটের এই কর্মকর্তাদের এবং চিহ্নিত ওই তিনটি প্রেসের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এ দিকে অনুসন্ধানে জানা যায়, এনসিটিবির শীর্ষ পদে দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযুক্ত তিনটি (প্রেস) প্রতিষ্ঠানের সাথে আঁতাত করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে বেশ কিছু আপত্তিকর একপেশে শর্ত আরোপ করে টেন্ডার আহ্বান করে। টেন্ডারে মুদ্রণ মেশিনের স্পেসিফিকেশনে এবং কাগজের সাইজেও কিছু পরিবর্তন আনা হয়। তবে অত্যন্ত চতুরতার সাথে এবং সুকৌশলে বিতর্ক এড়াতে যেসব প্রেসের শিট মেশিন রয়েছে, তাদেরকেও টেন্ডারে অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু এ কথা সব প্রেস মালিকই জানেন যে, এ মেশিনে অত্যন্ত ধীরগতি হওয়ার কারণে এনসিটিবি কর্তৃক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মুদ্রণ সম্পন্ন করতে পারে না। ফলে শিট মেশিনের প্রেস মালিকরা টেন্ডারে অংশ নেয়া থেকে বরাবরই বিরত থাকেন। তবে প্রতিযোগিতা দেখানোর জন্য ওই তিনটি প্রেস তাদের অধিনস্ত অপরাপর সংশ্লিষ্ট শিট মেশিনের প্রেস মালিকদের টেন্ডারে অংশ নেয়ার সুযোগ দিলেও মূলত ওই তিনটি প্রেস মালিকই মুদ্রণের সব কাজ করবেন। ফলে এনসিটিবি এবং নির্দিষ্ট ওই প্রেস মালিকদের অঘোষিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই প্রাক প্রাথমিকের সব বই (আমার বই) এবং শিশুদের অনুশীলনী খাতা মুদ্রণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। অবশ্য মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানেই সবকিছু গোয়েন্দা জলে ধরা পড়েছে। পরবর্তীতে আগের টেন্ডার বাতিল করে নতুন করে সব প্রেস মালিককে টেন্ডারে অংশ নেয়ার সুযোগ দিয়ে আগের টেন্ডারে সংশোধনী দেয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যে বিভিন্ন দফতর থেকে এনসিটিবির এমন দুরভিসন্ধিমূলক সিদ্ধান্তের বিষয়ে শিক্ষা উপদেষ্টাকেও জানানো হয়েছে। অবশ্য এরও আগে ছাত্রদের পক্ষ থেকে এনসিটিবির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক রবিউল কবীর চৌধুরী এবং সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক ড. রিয়াদ চৌধুরীকে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের দোসর হিসেবে আখ্যা দিয়ে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে লিখিত বক্তব্য তুলে ধরে এনসিটিবি থেকে বিতাড়িত করার দাবি জানানো হয়েছিল। কিন্তু এরপর দীর্ঘ দিন পার হলেও এখনো তারা স্বপদে বহাল রয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে ছাত্রদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
আবার সরকারের অর্থ লোপাটের জন্য যে তিনটি প্রেস এনসিটিবির কর্মকর্তাদের বড় অঙ্কের অর্থ উৎকোচ দিয়ে কাজ ভাগিয়ে নেয়ার পাঁয়তারা করেছিল তাদেরও কোনো শাস্তি হয়নি। এ নিয়েও অন্যান্য প্রেস মালিকের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অভিযুক্ত তিনটি প্রেসের তালিকায় প্রথমেই রয়েছে মাস্টার সিমেক্স প্রেস। এরপর রয়েছে প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং প্রেস এবং তৃতীয় স্থানে রয়েছে বারোতোপা প্রিন্টিং প্রেস। তিনটি প্রেসের মালিকই বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাদের অনুগত লোক দ্বারা পরিচালিত। আর এদের সাথে আর্থিক বিষয়ে লেনদেন এবং অন্যান্য দেন-দরবার করেছেন এনসিটিবির অন্যতম সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক ড. রিয়াদ চৌধুরী। তিনিই মূলত এনসিটিবি এবং প্রেস মালিকদের সাথে মধ্যস্থতার মূল ভূমিকাটি পালন করেছেন।
এ দিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে বলা হয়েছে আগের টেন্ডার বাতিল করে সেখানে সব প্রেসকে অংশ নেয়ার সুযোগ দিয়ে টেন্ডারে সংশোধনী দিতে। যদিও এই সংশোধনী ইতোমধ্যে দেয়া হয়েছে। সুপারিশে আরো বলা হয়েছে প্রাক প্রাথমিকের পাঠ্যপুস্তকের পরিমাণ অপরিবর্তিত রেখে ডিজাইনের বাইরে পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠার নিচের দিকে অতিরিক্ত একটু সাদা অংশ (আপাতদৃষ্টিতে এটা বোঝার উপায় নেই) মন্ত্রণায়ল অনুমোদন দেয়ার মাধ্যমে উল্লিখিত ওই তিনটি প্রেসের বাইরে আরো ২৩টি প্রেস এবারের প্রাক প্রাথমিকের বই মুদ্রণের টেন্ডারে অংশ নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে। আর সরকারও ১০ কোটি টাকাও অপচয়ের হাত থেকে বেঁচে গেল। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করে পাঠ্যবই মুদ্রণের টেন্ডার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হলে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত সব পর্যায়ের বিনামূল্যের পাঠ্যবই মুদ্রণে যদি সব প্রেসকে তাদের কাজের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে কাজে সুযোগ দেয়া হয় তাহলে ১৫ বছরে যেভাবে নিম্নমানের কাগজে মানহীন পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল সেই বদনাম ঘুচবে। একই সাথে সরকারের এই খাতের অর্থ অপচয় রোধ করারও একটি বড় সুযোগ তৈরি হবে।



