বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক মাজার ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘটনাগুলো ঘটেছে রাতের আঁধারে- কখনো ফজরের আগে, কখনো গভীর রাতে। সকালে স্থানীয় মানুষ এসে দেখে শতবর্ষ প্রাচীন মাজার গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে, ভেঙে ফেলা হয়েছে কবর, উপড়ে ফেলা হয়েছে গম্বুজ বা নিশান। প্রশ্ন উঠছে- কারা করছে এসব? কেন করছে? আর রাষ্ট্র কেন কার্যকরভাবে থামাতে পারছে না?
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, ঠাকুরগাঁও শহরে অবস্থিত হজরত শাহ্ সত্যপীরের মাজার এবং মাজারসংলগ্ন বেশ কয়েকটি কবর ভাঙচুর করেছে দুর্বৃত্তরা। শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) গভীর রাতে মাজার ভাঙার এ ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা। এ ঘটনায় এলাকায় চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ঘটনার সাথে কারা জড়িত তা এখনও উদঘাটন না হলেও উগ্রপন্থী সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ করছে রাজনৈতিক দলগুলো।
শনিবার ভোরে স্থানীয় মুসুল্লিরা মাজারসংলগ্ন মসজিদে ফজরের নামাজ আদায় করতে এসে দেখতে পান মাজারের গ্রিল ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং পাশের তিনটি কবর ভাঙচুর করা হয়েছে। এ ঘটনার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মাঝে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। স্থানীয়রা জানান, এ মাজারে কখনোই কোনো শিরক, বিদয়াত বা অনৈতিক কার্যক্রম, এমনকি গান-বাজনাও অনুষ্ঠিত হয় না। এমনকি এ মাজারের কোনো খাদেমও নেই। পাশে একটি মসজিদ রয়েছে যেখানে মুসল্লিরা এসে নামাজ পড়েন।
আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে এলাকায় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি ও নির্বাচন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে দুর্বৃত্তরা এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। এ ঘটনার সাথে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তারা।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী জানান, ঘটনাটি জানার পর আমি আশ্চর্য হই এবং নিন্দা জানাই। এ ধরনের ঘটনা যারা ঘটায় তারা কাপুরুষ। মূলত দেশকে সঙ্ঘাতের দিকে নিয়ে যেতে এবং নির্বাচনকে বানচাল করতে একটি সঙ্ঘবদ্ধ কুচক্রিমহল রাতের অন্ধকারে এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে। আমি প্রশাসনকে বলব দ্রুত এদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য।
জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, এ ধরনের ঘটনা ন্যক্কারজনক। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসররা আগামীর নির্বাচনকে বানচাল ও প্রশ্নবিদ্ধ করতে এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে এবং এদের দ্রুত আইনের আওতায় না আনলে এরা এ ধরনের ঘটনা ঘটাতেই থাকবে।
ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) খোদাদাদ হোসেন জানান, ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে এবং বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। কে বা কারা এমন ঘটনা ঘটিয়েছে তা এখনই বলা যাচ্ছেনা। তদন্ত সাপেক্ষে ঘটনার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে প্রয়োজনীয় শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পুনরাবৃত্ত অপরাধের একটি নকশা
অনুসন্ধানে দেখা যায়, মাজার ভাঙচুরের ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি স্পষ্ট মিল রয়েছে- অধিকাংশ হামলা হয় রাতের বেলা; আগেভাগে কোনো ঘোষণা নেই; হামলার পর দায় স্বীকার করে কেউ সামনে আসে না; স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা থাকে নিস্তেজ; মামলাও হয় খুব কম, আর হলেও তদন্ত এগোয় না। এ প্যাটার্ন বলছে-এটি বিচ্ছিন্ন উন্মত্ততা নয়; বরং সংগঠিত ও পরিকল্পিত কার্যক্রম। এ ঘটনা ঘটার পর কোনো প্রমাণ ছাড়াই মাজারকেন্দ্রিক ঘটনাকে শিরক বা বিদায়াত বলে যারা বক্তব্য দেন তাদের দায়ী করা হয়। এক শ্রেণীর গণমাধ্যম এ ব্যাপারে নানা রিপোর্ট করে হেফাজত বা কওমি ধারার ওপর এর দায় চাপায়। কিন্তু কোনো ঘটনারই সেভাবে প্রমাণ বা বিচার হতে দেখা যায় না। আওয়ামী লীগ আমলের ১৭ বছরে জঙ্গী হামলার ঘটনার ক্ষেত্রে একই চিত্র দেখা গেছে।
কারা জড়িত?
স্থানীয় বাসিন্দা, ধর্মীয় গবেষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের সাথে কথা বলে কারা মাজার ভাঙার ঘটনা ঘটিয়েছে এমন নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে কয়েকটি প্রধান গোষ্ঠীর প্রতি দায় চাপাতে দেখা যায়। যার মধ্যে থাকে সালাফি-ওহাবি মতাদর্শে বিশ্বাসীরা। তারা মাজার, পীর-মুরিদ প্রথা, ওরস ও জিয়ারতকে ‘শিরক’ ও ‘বিদায়াত’ বলে বক্তব্যা দেয়। ওয়াজ, অনলাইন ভিডিও ও বন্ধ মজলিসে এসব ধারণা দিয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতে চায়; কিন্তু তারা মাজার ভাঙার জন্য কাউকে উৎসাহিত বা উত্তেজিত করছে এমনটি দেখা যায় না।
কিছু স্থানীয় উগ্র ধর্মীয় নেটওয়ার্ককে এজন্য দায়ী করা হয়। কিছু এলাকায় মসজিদ বা মাদরাসাকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র গোষ্ঠী রয়েছে, যারা নির্দিষ্ট পীর বা মাজারকে ‘ভ্রান্ত আকিদার কেন্দ্র’ ঘোষণা করে। ধর্মীয় ভাষায় সচেতনমূলক কথা বললেও তারা সরাসরি ভাঙার নির্দেশ দিয়েছেন এমনটি পাওয়া যায় না; কিন্তু এক শ্রেণীর পত্রিকায় বলা হয় তাদের তরুণ অনুসারীরা ‘সওয়াবের কাজ’ মনে করে হামলায় অংশ নেয়।
কেন রাতের আঁধারে?
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কয়েকটি কারণ- দিনে হামলা হলে স্থানীয় মানুষের প্রতিরোধের আশঙ্কা; রাতে পুলিশি টহল দুর্বল; সিসিটিভি ও প্রত্যক্ষ সাক্ষী কম থাকে; সকালে ভাঙা মাজার দেখে আতঙ্ক ও মানসিক চাপ তৈরি হয়। এক কথায় রাত বেছে নেয়া হয় সর্বোচ্চ ক্ষতি ও সর্বনিম্ন ঝুঁকির জন্য। আর কারা কী উদ্দেশ্যে এটি করেছে সেটি যাতে বের না হয়।
মাজারই কেন লক্ষ্য?
বাংলাদেশে ইসলাম এসেছে প্রধানত সুফি দরবেশদের মাধ্যমে। মাজারকেন্দ্রিক ইসলাম-সহনশীল; সংস্কৃতিবান্ধব; বহুত্ববাদী হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এ ধারা কঠোর ধর্মীয় বিধিনিষেধ মান্য করে না। কারণ মাজার মানেই গান, কবিতা, নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ, লোকজ সংস্কৃতি-যা কঠোর ধর্মীয় কাঠামোর পরিপন্থী- এমন একটি ধারণা ছড়াতে কাজ করে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী । কিন্তু এ দেশের হক্কানি আলেমরা এ ঢালাও বক্তব্যের সাথে একমত নন। তারা কোনো কোনো মাজারকেন্দ্রিক নানা কুসংস্কার ও অনাচার বন্ধের দাবি জানান। তবে তা জনসচেনতা সৃষ্টি ও প্রকৃত ইসলামী শিক্ষা প্রসারের মাধ্যমে। এ জন্যই প্রসিদ্ধ সুফি দরবেশের মাজারের পাশেই গড়ে উঠেছে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সিলেটে হজরত শাহ জালাল রহমাতুল্লাহি আলাইহির মাজারের পাশে এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি মাদরাসা, যেখানে দাওরায়ে হাদীসের দরস দিতেন বায়তুল মোকাররমের মরহুম খতিব মাওলানা ওবায়দুল হক। আরেকটি এমন মাদরাসা নওয়াপাড়ার পীরের মাজারের পাশের মুহিউল উলূম মাদরাসা। ১৯০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এটি এ অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ঢাকার নারিন্দা মাদরাসাও এমন একটি প্রাচীন মাদরাসা।
প্রশাসনের ভূমিকা : ব্যর্থতা না অনিচ্ছা?
অনুসন্ধানে দেখা গেছে- অধিকাংশ ঘটনায় দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার হয়নি; অনেক থানায় মামলা নিতেই গড়িমসি করা হয়; ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ অজুহাতে কঠোর পদক্ষেপ এড়ানো হয়। বিশ্লেষকদের মতে, মাজার ভাঙচুর থামানো না গেলে- ধর্মীয় সহিংসতা বাড়বে; সুফি বিরোধী সঙ্ঘাত তীব্র হবে; ভবিষ্যতে মন্দির, চার্চ এমনকি ভিন্ন মতের মসজিদও টার্গেট করা হতে পারে। পুরো ঘটনার পেছনে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশকে অস্থির ও অসহিষ্ণু প্রমাণের উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে মনে করা হয়।
একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশে সালাফি বা কওমি ধারার মসজিদ মাদরাসা আর সুফি ধারার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পাশাপাশি হাজার বছর থাকলেও কেউ কারো স্থাপনা ভাঙতে দেখা যায় না। অথচ ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক শক্তির পতনের পর হঠাৎ করে এটি শুরু হয়ে গেছে।
কোনো সময় মন্দির ভাঙা আবার কোনো সময় মাজার ভাঙা। নির্বাচনের দেড় মাস আগে হঠাৎ করে এ প্রবণতা বেড়ে গেছে। আর এটি নিয়ে আন্তর্র্জাতিকভাবে বয়ান তৈরির জন্য এক শ্রেণীর গণমাধ্যমকে প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে।
কী করা জরুরি?
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ- মাজার ভাঙচুরের মতো আইন হাতে তুলে নেয়াকে স্পষ্টভাবে অপরাধ ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম হিসেবে চিহ্নিত করা এবং কারা এটি করছে তা সুনির্দির্ষ্টভাবে চিহ্নিত করা। আর এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর পর অনুমানের ভিত্তিতে কওমি ও আহলে হাদিসের অনুসারী দায়ী করে মামলা হয়রানি না করা। এ বিষয়ে হক্কানি আলেমদের বক্তব্য ও অবস্থান তুলে ধরতে মিডিয়াগুলো ভূমিকা রাখতে পারে। রাতের হামলায় প্রকৃত জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ও সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করা। রাতের আঁধারে মাজার ভাঙা কেবল উগ্রতার ঘটনা নয়- এটি ধর্মীয় দৃষ্টিতে সমর্থনযোগ্য নয়। তা ছাড়া রাষ্ট্রের আইন, ইতিহাস ও সামাজিক সহনশীলতার বিরুদ্ধে এক সংগঠিত আঘাত বলে বিশ্ব¦াস করার যথেষ্ট যুক্তি আছে। যেসব দেশী-বিদেশী শক্তি বাংলাদেশকে দুর্বল করতে চায় তারা এ ধরনের ঘটনার পেছনে সক্রিয় কি না সেটি খুঁজে বের করা দরকার বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।



