জরুরি প্রয়োজনে দরপত্র ছাড়াই কেনা হচ্ছে ১৪ কার্গো এলএনজি

Printed Edition
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় সভাপতিত্ব করেন : পিআইডি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় সভাপতিত্ব করেন : পিআইডি

বিশেষ সংবাদদাতা

রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনে ও জনস্বার্থে স্পট মার্কেট থেকে দরপত্র ছাড়াই ১৪ এলএনজি কার্গো কেনার প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে ‘অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’। একই সাথে ৩৬৮ কোটি টাকায় দুই কোটি লিটার পাম অলিন কেনার প্রস্তাবও অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।

গতকাল রাজধানীর শেরেবাংলানগরস্থ এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

বৈঠক শেষে অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, বিভিন্ন দেশের ৭টি প্রতিষ্ঠান থেকে ২টি করে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে এসব এলএনজি কার্গো কেনা হবে। এ ছাড়া বৈঠকে আরো ৩টি ক্রয় প্রস্তাব নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- চলতি অর্থবছরে ইউরিয়া সার আমদানির লক্ষ্যে জি-টু-জি চুক্তির আওতায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘ফার্টিগ্লোব ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেড’ এবং ‘বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) মধ্যে চুক্তি সইয়ের নীতিগত অনুমোদন।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ‘ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ প্রদান (১ম সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে (দরপত্র ছাড়াই) ৪০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অফিস সরঞ্জাম হিসেবে ৪০টি ড্রাইভিং সিমুলেটর কেনার নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

জানা গেছে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর বাস্তবায়নে ‘দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ প্রদান’ প্রকল্পের আওতায় এসব সিমুলেটর সংগ্রহ করা হবে।

প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য দেশের বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আধুনিক, যুগোপযোগী ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ড্রাইভিং প্রশিক্ষণের পরিবেশ তৈরি করা। পাশাপাশি প্রশিক্ষণার্থীদের বাস্তবভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করাও এ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য।

প্রকল্পের আওতায় নির্বাচিত ৪০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে একটি করে উচ্চমানের ড্রাইভিং সিমুলেটর স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটির মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর শেষ হবে। ফলে সময়ের স্বল্পতার কারণে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ক্রয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা কঠিন হওয়ায় রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজন ও জনস্বার্থে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে সিমুলেটরগুলো সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

২০১৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। সংশ্লিষ্ট প্যাকেজে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে ৯ কোটি ৫২ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় চলতি বছরের ১৪ জুলাই পর্যন্ত ৬৬ হাজার ৫৯৬ জনকে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে দেশে ও বিদেশে ৪২ হাজার ৭৭০ জনের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে।

এ দিকে ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজারের নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন বজায় রাখার লক্ষ্যে জাপানি প্রতিষ্ঠান জেনারেল কন্ট্রাক্টর (জিসি) এমএইচআই থেকে দৈনিক উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে কারিগরি সহায়তার লক্ষ্যে আরো এক বছরের জন্য টেকনিক্যাল সার্ভিস (ফেজ-২) চুক্তি একক উৎসভিত্তিক পরামর্শক (ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান) নির্বাচন পদ্ধতিতে নিয়োগের নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এজন্য ব্যয় হবে ৩৯কোটি ৫২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, এ ছাড়া বৈঠকে ‘বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) নিয়ন্ত্রণাধীন দুইটি বন্ধ বস্ত্র কারখানা পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ’ (পিপিপি) পদ্ধতিতে পুনরায় চালুর লক্ষ্যে বেসরকারি অংশীদার নির্বাচনের জন্য চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদানে নীতিগত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু উপস্থাপিত প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতসহ পরবর্তীতে পুনরায় উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে।

বিটিএমসির নিয়ন্ত্রণাধীন বস্ত্র কারখানা দুইটি হচ্ছে- নীলফামারির দারোয়ানী টেক্সটাইল মিল এবং মাগুরা টেক্সটাইল মিল।

৩৬৮ কোটি টাকায় ২ কোটি লিটার পাম অলিন কিনবে সরকার

নিম্নআয়ের এক কোটি পরিবারের মধ্যে ভর্তুকি মূল্যে বিক্রির লক্ষ্যে ৩৬৮ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে দুই কোটি লিটার পরিশোধিত পাম অলিন কেনার প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকার। প্রতি লিটার ১৮৪ টাকা ১০ পয়সা দরে এ পাম অলিন কেনা হবে। ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে প্রস্তাবটি অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কার্ডধারী এক কোটি নিম্নআয়ের পরিবারের কাছে ভর্তুকি মূল্যে বিক্রির জন্য দুই কোটি লিটার পরিশোধিত পাম অলিন কেনার উদ্যোগ নেয়া হয়।

এজন্য স্থানীয়ভাবে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হলে তিনটি দরপ্রস্তাব জমা পড়ে। এরমধ্যে দু’টি দরপ্রস্তাব কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করে।

দরপ্রস্তাব যাচাই-বাছাইসহ সব প্রক্রিয়া শেষে সর্বনিম্ন গ্রহণযোগ্য দরদাতা প্রতিষ্ঠান শবনম ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ, ঢাকা থেকে পাম অলিন কেনার সুপারিশ করা হয়। টিসিবির গুদাম পর্যন্ত পরিবহন খরচসহ প্রতি লিটার ১৮৪ টাকা ১০ পয়সা দরে মোট দুই কোটি লিটার পাম অলিন কিনতে ব্যয় হবে ৩৬৮ কোটি ২০ লাখ টাকা।

জানা গেছে, এ অর্থের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের পাল্টা নিশ্চয়তা রয়েছে। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে প্রস্তাবটি প্রত্যাশামূলক অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হলে তা অনুমোদন দেয়া হয়।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভোজ্যতেল কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২২ কোটি লিটার। এরই মধ্যে ৫৩ লাখ ৬২ হাজার ৬৮৪ লিটার ভোজ্যতেল কেনা হয়েছে।

এক কার্গো এলএনজি কেনা হবে

দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এক কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি কিনবে সরকার। আন্তর্জাতিক কোটেশন সংগ্রহের মাধ্যমে কেনা এই এলএনজির প্রতি এমএমবিটিইউর দাম পড়বে ২৩ দশমিক ৯৩ মার্কিন ডলার। আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেড থেকে এই এলএনজি কেনা হবে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫-এর বিধি ১০৫-এর উপবিধি ৩-এর দফা (ক) অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক কোটেশন সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় এই এলএনজি কেনা হবে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ১ থেকে ২ সেপ্টেম্বরের এই এলএনজি কেনা হবে।

কানাডা থেকে সার আসছে

বৈঠকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে এক লাখ ১৫ হাজার টন এমওপি সার আমদানির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে কানাডার কানাডিয়ান কমার্শিয়াল করপোরেশন (সিসিসি) থেকে ৮০ হাজার টন এবং রাশিয়ার জেএসসি ফরেন ইকোনমিক করপোরেশন থেকে ৩৫ হাজার টন এমওপি সার আনা হবে। উভয় ক্ষেত্রে প্রতি টনের দাম পড়বে ৩৭৭.৬৩ মার্কিন ডলার। এ ছাড়া সৌদি আরবের এসএবিআইসি অ্যাগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস কোম্পানি থেকে প্রতি টন ৪৩০ মার্কিন ডলার দরে ইউরিয়া সার আমদানির প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে, যার মোট ব্যয় ২১৩ কোটি ১৯ লাখ টাকার বেশি।

বাংলাদেশ রেলওয়ের গ্রিন রেলওয়ে পরিবহন প্রস্তুতিমূলক কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের আওতায় ঢাকা বিমানবন্দর ও কমলাপুর স্টেশনে মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও ধারণাগত নকশার জন্য পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। এ কাজে ব্যয় হবে ৫৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।