ডিএসই’র অল্টারনেটিভ বোর্ডে রেনাটার প্রেফারেন্স শেয়ার

ফের ধারাবাহিক পতনের শিকার পুঁজিবাজার

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) অল্টারনেটিভ বোর্ডে যুক্ত হলো তালিকাভুক্ত ওষুধ কোম্পানি রেনাটার প্রেফারেন্স শেয়ার। গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ডে (এটিবি) প্রথমবারের মতো রেনাটা পিএলসির ইস্যুকৃত প্রেফারেন্স শেয়ারের আনুষ্ঠানিক লেনদেন শুরুর ঘোষণা হয়। তবে শুরুর দিন কোনো শেয়ারের লেনদেন হয়নি। এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম এবং রেনাটা পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ এস কায়সার কবির।

এ উপলক্ষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও রেনাটা পিএলসির মধ্যে তালিকাভুক্তিকরণ সংক্রান্ত একটি চুক্তি ডিএসইর ট্রেনিং একাডেমী, নিকুঞ্জে স্বাক্ষরিত হয়। ডিএসইর প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আসাদুর রহমান, এফসিএস এবং রেনাটা পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ এস কায়সার কবির নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন রেনাটা পিএলসির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মোস্তফা আমিন আওলাদ, কোম্পানি সেক্রেটারি মো: জুবায়ের আলম, ইস্যু ম্যানেজার সিটি ব্যাংক ক্যাপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো: সোহেল হক।

চুক্তি সম্পাদন অনুষ্ঠানে রেনাটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ এস কায়সার কবির বলেন, প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যুর পেছনে একটি জটিল ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ প্রক্রিয়া কাজ করে, যা মোটেও সহজ নয়। রেনাটার ক্ষেত্রে মুদ্রার আকস্মিক ও বড় ধরনের অবমূল্যায়নের ফলে কোম্পানির পরিকল্পিত বিনিয়োগ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। যেখানে প্রাথমিকভাবে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় এক হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেখানে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকায়, যা ছিল সম্পূর্ণ অনাকাক্সিক্ষত। তিনি জানান, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই অবমূল্যায়ন ঘটায় রেনাটাকে বাধ্য হয়ে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়, যদিও প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে কার্যত ঋণমুক্ত অবস্থায় ছিল। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রেনাটা সচেতনভাবে একটি বিকল্প অর্থায়ন কাঠামোর সিদ্ধান্ত নেয়। রাইট শেয়ার ইস্যু করলে সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারহোল্ডারের মালিকানা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেত বিধায় প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যুকে উপযুক্ত সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ, প্রেফারেন্স শেয়ার ভোটাধিকারবিহীন এবং এতে অংশগ্রহণ সত্ত্বেও মালিকানায় বড় ধরনের ডাইলিউশন ঘটে না।

সৈয়দ এস কায়সার কবির আরো বলেন, প্রেফারেন্স শেয়ারের লভ্যাংশ হার ট্রেজারি বন্ডের রেফারেন্স রেটের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সাধারণভাবে ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত। তবে এটি একটি নতুন ধরনের আর্থিক উপকরণ হওয়ায় এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯ মাস সময় লেগেছে। এ সময়ের মধ্যে ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার কমে গেলেও প্রেফারেন্স শেয়ারের কার্যকর রিটার্ন প্রায় ১৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে রেনাটার আর্থিক অবস্থান দৃশ্যমানভাবে উন্নত হবে। একসময় রেনাটার পরিচয় ছিল ঋণমুক্ত অবস্থান ও শক্তিশালী নেট মার্জিন এবং সেই অবস্থানে ফিরে যাওয়ার পূর্বশর্তই ছিল ঋণের চাপ কমানো।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, ক্যাপিটাল মার্কেটে স্টক এক্সচেঞ্জের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনো প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের সাথে কাক্সিক্ষত আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। তবে বিদ্যমান সংস্কৃতি ভেঙে আরো কার্যকর, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের লক্ষ্যে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। রেনাটা পিএলসির প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যুর ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ কমপ্লাায়েন্স ইতিহাস, শক্তিশালী করপোরেট গভর্নেন্স এবং সুসংগঠিত শেয়ারহোল্ডিং কাঠামোর কারণে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয়েছিল। তা সত্ত্বেও বিএসইসি ও ডিএসইর সম্মিলিত অনুমোদন প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লেগেছে। ভবিষ্যতে নতুন রেগুলেশন প্রণয়ন, প্রক্রিয়াগত সংস্কার এবং ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে এ ধরনের অনুমোদন আরো দ্রুত, সহজ ও কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত রেনাটা পিএলসি প্লেসমেন্টের মাধ্যমে প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যু করে মোট ৩২৫ কোটি টাকা উত্তোলন করেছে। এই প্রেফারেন্স শেয়ার একটি নন-কিউমুলেটিভ, নন-পার্টিসিপেটিভ এবং সম্পূর্ণরূপে সাধারণ শেয়ারে রূপান্তরযোগ্য শেয়ার। প্রতিটি প্রেফারেন্স শেয়ারের মূল্য এক হাজার ৯০০ টাকা। এই প্রেফারেন্স শেয়ারের মেয়াদ সংশ্লিষ্ট সাবস্ক্রিপশন সমাপ্তির তারিখ, অর্থাৎ ১৯ অক্টোবর ২০২৫ থেকে ছয় বছর পর্যন্ত (২০২৫-৩১)। তৃতীয় বছরের শেষ থেকে শুরু করে প্রতি বছর ২৫ শতাংশ করে মোট চারটি ধাপে প্রেফারেন্স শেয়ারগুলো নির্ধারিত ৪৭৫ টাকা শেয়ার রূপান্তর মূল্যে সাধারণ শেয়ারে রূপান্তরিত হবে। ফলে তৃতীয় বছরের শেষ থেকে প্রতি বছর এটিবিতে তালিকাভুক্ত এই প্রেফারেন্স শেয়ারের মূল্য এক হাজার ৯০০ টাকা থেকে ধাপে ধাপে ৪৭৫ টাকা করে হ্রাস পাবে। সাধারণ শেয়ারে রূপান্তরিত না হওয়া বিনিয়োগের অংশের বিপরীতে প্রেফারেন্স শেয়ার হোল্ডাররা প্রতি বছর নির্দিষ্ট ১৫ শতাংশ হারে (পর্যাপ্ত কর-পরবর্তী নিট মুনাফা বিদ্যমান থাকলে) লভ্যাংশ প্রাপ্ত হবেন। রেনাটা পিএলসির প্রেফারেন্স শেয়ারসহ ডিএসই এটিবি প্ল্যাটফর্মে এখন পর্যন্ত দু’টি ইক্যুইটি এবং সাতটি বন্ড তালিকাভুক্ত রয়েছে।

এ দিকে আবারো ধারাবাহিক দরপতনের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে দেশের পুঁজিবাজার। রোববারের পর গতকাল সোমবার সপ্তাহের দ্বিতীয় কর্মদিবসেও বড় ধরনের সূচক হারায় দেশের দুই পুঁজিবাজার। তবে গতকাল দিনের শুরুতে সূচক ছিল ঊর্ধ্বমুখী। লেনদেন শুরুর ২০ মিনিটের মাথায় বিক্রয়চাপের মুখে পড়লেও প্রথম দিকে তা খুব তীব্র ছিল না। বেলা ১টার দিকে বিক্রয়চাপ তীব্র আকার ধারণ করে। এ সময় লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানি ও ফান্ডগুলো একে একে দর হারাতে থাকে। একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে বাজারগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও পারেনি।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৪২ দশমিক ৯১ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। সকালে ৪ হাজার ৯৩২ দশমিক ৯৬ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে নেমে আসে চার হাজার ৮৯০ দশমিক ০৪ পয়েন্টে। এর আগে রোববার সূচকটির ৩০ দশমিক ৮৬ পয়েন্ট অবনতি ঘটে। সে হিসেবে গত দু’দিনে প্রায় ৭৪ পয়েন্ট হারায় সূচকটি। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসইএক্স সূচকের অবনতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ১৪ দশমিক ৩১ ও ১১ দশমিক ৬৬ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই (সার্বিক মূল্যসূচক) গতকাল ৭৪ দশমিক ১৫ পয়েন্ট হারায়। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৭৫ দশমিক ১৪ ও ৪৪ দশমিক ৯১ পয়েন্ট।

বিনিয়োগকারীরা বাজার আচরণে অনেকটাই হতাশ। তারা মনে করেন টানা দু’দিন সূচকের বড় ধরনের অবনতি আবার ধারাবাহিক পতনের দিকে ইঙ্গিত করছে। এর আগে ডিসেম্বরের শুরুতেও এ ধরনের ধারাবাহিক পতনের শিকার ছিল পুঁজিবাজার। কিন্তু পরবর্তীতে দ্বিতীয় সপ্তাহে তার অনেকটাই পুষিয়ে নিয়েছিল বাজারগুলো। কিন্তু এবার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি চলমান বাজার আচরণকে প্রভাবিত করছে। তাই সামনের দিনগুলোতে বাজার কেমন যেতে পারে তা নিয়ে বেশ হতাশ বিনিয়োগকারীরা। তারা মনে করছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে পুঁজিবাজার স্বাভাবিক আচরণে ফিরতে সময় লাগবে। কারণ সামনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এ মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোন দিকে যেতে পারে তা নিয়ে সবার মনেই সংশয় রয়েছে।