কানাডার সবচেয়ে জনবহুল এবং আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত শহর টরন্টোতে শুরু হলো ৫১তম টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (টিএফএফ)। বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রভাবশালী ও সম্মানজনক এই আয়োজন সরাসরি কাভার করতে বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল পথ পেরিয়ে ঢাকার প্রতিনিধি হিসেবে এখন অবস্থান করছি উত্তর আমেরিকার এই সমৃদ্ধ ও রঙিন শহরে।
টরন্টোয় পৌঁছানোর পর প্রথম দিনেই এই বৈশ্বিক নগরীর নগরজীবনের নিজস্ব রূপ ও পরিবেশের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ হলো। আয়তনের দিক থেকে টরন্টো সুবিশাল হলেও এর পথঘাটে যানবাহনের আধিক্য চোখে পড়ার মতো। প্রধান সড়কগুলোতে গাড়ির লম্বা সারি, দীর্ঘ ট্রাফিক সিঙ্গেল এবং আমাদের ঢাকার পরিচিত যানজটের মতো দৃশ্যও এখানে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। তবে এই এতসব ব্যস্ততার মাঝেও যে বিষয়টি টরন্টোকে পৃথিবীর অন্যান্য মেগাসিটি থেকে আলাদা করে তোলে, তা হলো এর অভাবনীয় নাগরিক শৃঙ্খলা। পৃথিবীর প্রায় সব মহাদেশ ও দেশের মানুষের আবাসস্থল এই শহর, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের দিক থেকে এটি যেন এক টুকরো পৃথিবী। অথচ ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভিন্ন দেশের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও নিয়মের এক অদৃশ্য সুতোয় সবাই এখানে বাঁধা। পথ চলতে গিয়ে মানুষ থেকে শুরু করে যানবাহন সবার মাঝেই সেই নিয়মানুবর্তিতা স্পষ্ট। ফলে ট্রাফিকের ধীরগতি থাকলেও রাস্তায় কোনো হইচই, হর্ন বাজানো কিংবা অনাকাক্সিক্ষত কোনো ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়নি। ঢাকার বিশৃঙ্খল ট্রাফিকের সাথে তুলনা করলে এটি যেকোনো নতুন দর্শনার্থীর চোখেই এক পরম স্বস্তির জন্ম দেবে।
কাকতালীয়ভাবে, টরন্টোর আবহাওয়া আমাকে আমার চেনা শহর ঢাকার একটি সুন্দর দিনের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। খুব বেশি গরম কিংবা হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা কোনোটাই নেই। বেশ চমৎকার একটি নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া বিরাজ করছে পুরো শহরজুড়ে। স্নিগ্ধ বাতাস আর হালকা রোদের এই আবহাওয়া উৎসবের প্রথম দিনের কাজ কাভার করার জন্য একদম আদর্শ এক পরিবেশ সৃষ্টি করে দিয়েছে।
শহরের সেই সুশৃঙ্খল পরিবেশ পেরিয়ে উৎসব প্রাঙ্গণে পা রাখতেই দেখা গেল সম্পূর্ণ এক ভিন্ন আমেজ। বর্ণিল আলো, তারকাদের উপস্থিতি আর ভক্তদের হাততালিতে উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে শহরের ঐতিহাসিক রয় থমসন হলো। এই রেড কার্পেট এবং রয় থমসন হলেই শুভ সূচনা ঘটে টিএফএফের। বিগত বছরগুলোতে টিএফএফের উদ্বোধনী আয়োজনে যেসব সিনেমা দেখা গেছে, সেগুলোতে একটি সাধারণ দিক ছিল ‘হৃদয়স্পর্শী’ গল্প। এবারো সেই ধারার ব্যতিক্রম হয়নি; তবে তার সাথে যুক্ত হয়েছে অধিকার আদায় এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের গড়ে তোলা ঐতিহাসিক সংগ্রামের গল্প।
উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবে পর্দায় ওঠে সিয়ান হেডার পরিচালিত ‘বীয়িং হিউম্যান’। ছবিটির প্রিমিয়ারের আগে রয় থমসন হলে উপস্থিত শত শত দর্শকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখতে মঞ্চে আসেন টরন্টোর মেয়র অলিভিয়া চাউ। লালগালিচার আভিজাত্য পেরিয়ে সরাসরি মঞ্চে উঠে তিনি উৎসবের গুরুত্ব তুলে ধরেন। মেয়রের বক্তব্যে এক ঐতিহাসিক ঘোষণা আসে। তিনি জানান, ২০২৬ সালের এই টিএফএফ আসরটিই উৎসবের দীর্ঘ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি সম্পূর্ণ ‘প্রবেশযোগ্য’ বা অ্যাক্সেসিবল রেড কার্পেট নিশ্চিত করেছে। অর্থাৎ, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা যে কেউ কোনো বাধা ছাড়াই রেড কার্পেটে অংশ নিতে পারবেন। কেবল এই আসরেই নয়, আগামী দিনের প্রতিটি টিএফএফ আসরেও এই সুবিধা বহাল থাকবে বলে মেয়রের প্রতিশ্রুতি দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। মেয়রের এই ঘোষণা এলে এটাই মনে করিয়ে দেয় যে, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকারের জন্য সমাজকে এখনো অনেকটা পথ হাঁটতে হবে।
মেয়রের বক্তব্যের পরপরই হলে শুরু হয় ‘বীয়িং হিউম্যান’ সিনেমার প্রদর্শনী। ব্রিটিশ প্রতিবন্ধী অভিনেত্রী রুথ মেডলি এতে আমেরিকার বিখ্যাত অধিকারকর্মী ‘জুডি হিউম্যান’-এর চরিত্রে অসামান্য ও সজীব অভিনয় উপহার দিয়েছেন। সিনেমাটিতে উঠে এসেছে ১৯৭৭ সালের সেই ঐতিহাসিক ২৫ দিনের অবস্থান ধর্মঘটের (সিট-ইন) প্রেক্ষাপট। সে সময় প্রতিবন্ধী মানুষসহ সমাজের বহু প্রান্তিক জনগোষ্ঠী একত্র হয়ে সান ফ্রান্সিসকোর সরকারি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কল্যাণ ভবন দখল করে নিজেদের অধিকার আদায়ের দাবি তুলেছিল।
প্রায় এক মাসব্যাপী চলা সেই আন্দোলন এবং মানুষের দুর্ভোগের কথা দুই ঘণ্টা সাত মিনিটের একটি চলচ্চিত্রে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা পরিচালকের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু পরিচালক সিয়ান হেডার সেই কাজটি করেছেন অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে। ছবিটিতে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না বরং প্রান্তিক মানুষগুলোর প্রতিটি ক্ষোভ, নীরবতা এবং প্রতিদিনের সংগ্রামকে দর্শকের হৃদয়ে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ঢাকার একজন প্রতিনিধি এবং শারীরিক প্রতিবন্ধকতাহীন ব্যক্তি হিসেবে প্রেক্ষাগৃহে বসে আমি অনুধাবন করতে পেরেছি আমাদের সমাজের তৈরি কৃত্রিম বাধাগুলো এই মানুষদের জীবনে কতটা যন্ত্রণা ও ঝামেলার সৃষ্টি করে।
ছবির অন্যতম চরিত্র হেল জুকাস যখন তার লেটার বোর্ড ব্যবহার করে সরকারি শুনানিতে অংশ নিচ্ছিলেন, পুরো হলে তখন পিনপতন নীরবতা। তিনি বলেছিলেন, ‘প্রতিবন্ধকতা কোনো ট্র্যাজেডি নয়, এটি একটি চরম ঝামেলা।” এই একটি বাক্য যেন পুরো সেশনের আবহ বদলে দেয়। যখন ছবির কোনো চরিত্র তার কথা শেষ হওয়ার আগেই কথা বলতে চাচ্ছিল, জুডি হিউম্যান তাকে সাথে সাথেই থামিয়ে দেন। দৃশ্যটি যেন প্রেক্ষাগৃহে থাকা আমাদের মতো সাধারণ দর্শকদেরও শিক্ষা দেয় যে কারো অক্ষমতাকে ছোট করে না দেখে তাদের কথা শোনার ধৈর্য রাখা কতটা জরুরি। সিনেমা শেষ হওয়ার পর পুরো হলের দর্শক দাঁড়িয়ে সম্মান জানান (স্ট্যান্ডিং ওভেশন)। সেই মুহূর্তটি দেখে মনে হয়েছে, ছবিটির মানবিক বার্তা প্রতিটি মানুষের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করেছে।
প্রেক্ষাগৃহের এই মানবিক বার্তার পাশাপাশি বাইরে পুরো টরন্টো এখন বিনোদনের মহাসমুদ্রে ভাসছে। রজার্সের আয়োজনে ১০ দিনব্যাপী এই উৎসবে বিশ্বের রেকর্ডসংখ্যক ২৯৩টি সিনেমা প্রদর্শিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বড় বড় তারকাদের উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে শহরের কিং স্ট্রিট এবং আশপাশের এলাকাগুলো। ১০ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কিং স্ট্রিট সড়কটি সাধারণ পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে, যেখানে আর্ট মার্কেট, ওপেন এয়ার কনসার্ট, ফুড ট্রাক এবং বিভিন্ন কালচারাল বুথ বসানো হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই কয়েক দিনে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ এই ফেস্টিভ্যাল স্ট্রিটে ভিড় জমাবেন।
এ ছাড়া শহরের অন্যান্য স্থানে যেমন প্রিন্সেস অব ওয়েলস থিয়েটার এবং রয়্যাল আলেকজান্দ্রা থিয়েটারের সামনে অনুরাগী বা ‘ফ্যানদের’ জন্য বিশেষ জোন তৈরি করা হয়েছে। টম হিডেলস্টন, মিশেল ইয়ো, হাভিয়ার বারদেম, পিনেলোপি ক্রুজ, সেথ রোগেন এবং স্যার গ্যারি ওল্ডম্যানের মতো পরাস্ত তারকাদের এক নজর দেখার জন্য ভোর থেকেই তরুণ-তরুণীরা সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন।
দূরত্ব ও ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে ঢাকা থেকে টরন্টোর দূরত্ব হাজার মাইলের হতে পারে, তবে চলচ্চিত্রের আবেগ আর সংবেদনশীলতা যে মানবজাতিকে একই সূত্রে বাঁধতে পারে টিএফএফের এই উদ্বোধনী দিনটি তারই উজ্জ্বল প্রমাণ হয়ে থাকল। এক অনন্য শৃঙ্খলা, নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া আর গভীর মানবিক বারতায় শুরু হওয়া এই রঙিন উৎসবের প্রতিটি খবরের আপডেট নিয়ে পরে আবার যুক্ত হবো আপনার সাথে।



