এনজিওর ক্ষুদ্রঋণের ফাঁদে জর্জরিত নাসিরনগরের মানুষ

ঋণ নেয়ার পর তাদের জীবনে নেমে আসে দুঃস্বপ্ন

Printed Edition

আছমত আলী নাসিরনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)

কৃষিনির্ভর নাসিরনগরের বেশির ভাগ মানুষের জীবন-জীবিকা শ্রম ও মজুরির ওপর নির্ভরশীল। কৃষিতে বাজারকেন্দ্রিক অনিশ্চয়তা এবং উৎপাদন খরচ বাড়তে থাকায় অনেক পরিবারই দারিদ্র্যের চক্রে আটকে পড়ে। এই সঙ্কট মোকাবেলায় বহু মানুষ ক্ষুদ্রঋণের ওপর ভরসা করছেন। কিন্তু ঋণ নেয়ার পর পরিশোধে চাপ তাদের জীবনে নতুন দুঃস্বপ্ন ডেকে আনছে। নাসিরনগরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে- এনজিওর ঋণের বোঝায় জর্জরিত বহু পরিবার দিন-রাত মানসিক ও আর্থিক চাপে অতিষ্ঠ।

এনজিওগুলো মূলত বেসরকারি সামাজিক উন্নয়ন সংগঠন হিসেবে দাতাদের অর্থায়নে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ পরিচালনা করে। বাংলাদেশে বিভিন্ন আকার ও প্রকৃতির অসংখ্য এনজিও সক্রিয় আছে; এর মধ্যে গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, আশা, সেইভ দ্য চিলড্রেন, অক্সফাম, একশনএইড, মুসলিম এইড, প্রশিকা, প্রত্যাশা, শিখা সামাজিক কল্যাণ সঙ্ঘ, ভরসা সমাজ উন্নয়ন সংগঠন, সিসিডিএ, স্বপ্ন তরী উন্নয়ন সংস্থা, ইপসপা, লাল হোসেন ফাউন্ডেশনসহ বহু প্রতিষ্ঠান নাসিরনগরেও মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে।

ক্ষুদ্র ঋণের সুবিধা দেয়া হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সুদ ও কিস্তির চাপ দরিদ্র মানুষের ওপর অসহনীয় হয়ে ওঠে। ঋণ শোধে ব্যর্থ হওয়ায় বহু পরিবার এনজিও কর্মকর্তাদের নানা রকম চাপে পড়ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অনেক ঋণগ্রহীতা অভিযোগ করেন বকেয়া কিস্তি আদায়ে কিছু এনজিও কর্মকর্তারা ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন, কখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহারের হুমকিও দেন। এতে নারী ঋণগ্রহীতারা সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত অবস্থায় পড়েন। গ্রামের সাধারণ নারীরাই এনজিওর ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার প্রধান অংশীদার হলেও তাদের পরিশ্রমের শ্রমমূল্য অর্ধেকেরও কম পান বলে অভিযোগ।

নাসিরনগরের ভুক্তভোগী এক ভ্যানচালক জানান, বিভিন্ন এনজিও থেকে প্রায় এক লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। আয় কম হওয়ায় নিয়মিত কিস্তি দিতে না পারায় তাকে ঘনঘন বাড়িতে গিয়ে চাপ দেয়া হয়। শেষ পর্যন্ত বাড়ির আসবাবপত্র বিক্রি করে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হয়েছে। তার মতো বহু পরিবার ঋণের বোঝায় দিশেহারা হয়ে গ্রাম ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে। আরেক ভুক্তভোগী জানান, বাধ্য হয়ে ঋণ নিয়েছিলাম। এখন কিস্তি দিতে না পারলে আইনের ভয় ভীতি দেখায়। না খেয়ে কিস্তি শোধ করতে হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পের ব্যয়ের বড় অংশ প্রশাসনিক খরচ, বিদেশি কর্মকর্তা ও যানবাহন পরিচালনায় ব্যয় হয়। ফলে বাস্তবেই গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দের সামান্য অংশ পৌঁছায়। এনজিও ব্যুরোর নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের ৮৫ শতাংশ অর্থ উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হয় না এমন অভিযোগও রয়েছে। উন্নয়নমূলক কাজে এনজিওগুলোর ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না, তবে তাদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।

স্থানীয়দের দাবি, দরিদ্র মানুষের কল্যাণে কাজের কথা বলা হলেও কিছু অসাধু এনজিও কিস্তির নামে কোটি কোটি টাকা আদায় করছে। একইসাথে দুর্বল ও দরিদ্র মানুষদের আরো বিপন্ন করছে। সরকারের তদারকি শক্তিশালী না হলে গ্রামাঞ্চলের মানুষ ক্ষুদ্র ঋণের ফাঁদে পড়ে আরো বড় সঙ্কটে পড়বে বলে ভুক্তভোগীদের আশঙ্কা।