অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
দেশের পুঁজিবাজারগুলোয় গত সপ্তাহটি ছিল একপ্রকার গতিহীন। ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর সরকারের বিভিন্ন নীতিসহায়তা ও নতুন অর্থবছরের বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বেশ কিছু সংস্কার পরিকল্পনার প্রস্তাব বাজারকে গতিশীল করে তোলে। ফলশ্রুতিতে এ কয় মাসে দেশের দুই পুঁজিবাজার সূচকের উল্লেখযোগ্য উন্নতির পাশাপাশি লেনদেনও দেড় হাজার কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করে। উল্লিখিত সময়ে বাজারে সূচকের উন্নতির পাশাপাশি যথারীতি সংশোধনও ঘটতে দেখা যা বাজার ঝুঁকিও অনেকাংশে হ্রাস করে। কিন্তু হঠাৎ করে আগস্ট মাসের শুরু থেকে নেতিবাচক প্রবণতা ভর করে পুঁজিবাজারে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা এহেন বাজার আচরণের কারণ হিসাবে শিল্প ও সেবা খাতে গ্যাস ও বিদ্যুতের অপ্রতুল সরবরাহকেই দায়ি করছেন। যেহেতু পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির একটি বড় অংশই উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের স্বল্পতা উৎপাদনে ব্যত্যয় ঘটায়। এর ফলে বাজারে নেতিবাচক বার্তা যায়, যা বাজারকে একপ্রকার গতিহীন করে তোলে। গতিহীন বাজারে সবগুলো খাতেই দরপতনের ঘটনা ঘটে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে সম্প্রতি এ সঙ্কট দূর হয়েছে এবং শিল্প কারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা আশাবাদী পরিস্থিতির উন্নতি হলে পুঁজিবাজার আবার তার স্বাভাবিক আচরণ ফিরে পাবে।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গত সপ্তাহে ৩৪ দশমিক ৬২ পয়েন্ট হ্রাস পায়। রোববার পাঁচ হাজার ৮৯৫ দশমিক ৫৮ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতবার লেনদেন শেষে পাঁচ হাজার ৮৬০ দশমিক ৯৬ পয়েন্টে স্থির হয়। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ ২৫ দশমিক ৩৭ ও ১৪ দশমিক ৫৩ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়।
সূচকের অবনতি সত্ত্বেও গত সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেনের কিছুটা উন্নতি ঘটে। ৫ আগস্টের সরকারি ছুটির কারণে গত সপ্তাহে কর্মদিবস ছিল চারটি। চার দিনে বাজারটির মোট লেনদেন দাঁড়ায় চার হাজার ৭২৪ কোটি ৩৭ লাখ যার গড় দাঁড়ায় এক হাজার ১৮০ কোটি ৭১ লাখ টাকা, যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। আগের সপ্তাহে বাজারটির মোট লেনদেন ছিল পাঁচ হাজার ২৯৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা যার গড় দাঁড়ায় পাঁচ হাজার ৫৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
এ দিকে দেশের শেয়ারবাজারে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া ও দীর্ঘদিন উৎপাদন কার্যক্রমে না থাকা তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সর্বশেষ এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেডের কারখানা বন্ধ হওয়ায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তালিকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫টিতে। এতে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা তালিকাভুক্ত কোম্পানি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরো বেড়েছে। ডিএসইর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১ আগস্ট থেকে এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলসের কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির কারণে তাদের পক্ষে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
প্রকাশিত এক তথ্যে কোম্পানিটি জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়। একই সাথে ঋণদাতা ব্যাংকগুলো এলসি খোলার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করে। ফলে উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও রাসায়নিক আমদানি ব্যাহত হয়। এর চাকরির অনিশ্চয়তার কারণে দক্ষ শ্রমিকদের একটি বড় অংশ চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়ায় কোম্পানিটিতে তীব্র জনবল সঙ্কট তৈরি হয়। কাঁচামাল ও রাসায়নিকের সরবরাহে বিঘœ এবং জনবল সঙ্কট সবমিলিয়ে শেষ পর্যন্ত কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কোম্পানিটি। তবে সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে জানিয়ে এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস বলেছে, পরিস্থিতির উন্নতি হলে তারা আবার উৎপাদন শুরু করতে চায়। দ্রুত উৎপাদন শুরু করতে না পারলে কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ দিকে কারখানা বন্ধের খবরে কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গত ১ আগস্ট কারখানা বন্ধ হওয়ার পর থেকে ডিএসইতে কোম্পানিটির শেয়ারদর কমেছে ৯.২৮ শতাংশ। বৃহস্পতিবারও কোম্পানিটির শেয়ারের দর ২.৩১ শতাংশ কমে ১২ টাকা ৭০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। এর আগে চলতি বছর বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করতে ব্যর্থ হওয়ায় কোম্পানিটি ‘বি’ ক্যাটাগরি থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবনমন ঘটানো হয়। কোম্পানিটি ২০২৪ সালের মার্চে শেষ হওয়া প্রান্তিকের পর থেকে কোনো আর্থিক বিবরণী প্রকাশ করেনি। ফলে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরো বেড়েছে।
এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস নতুন করে তালিকায় যুক্ত হওয়ায় ডিএসইতে বন্ধ বা অকার্যকর শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এখন ৩৫টি। ডিএসই সূত্র জানায়, কিছু কোম্পানি তাদের কার্যক্রমে সমস্যার কথা এক্সচেঞ্জকে জানিয়েছে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান কারখানা বন্ধের তথ্য প্রকাশ করেনি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডিএসইর পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট কারখানার কার্যক্রম ইতোমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে। এসব কোম্পানির বেশির ভাগই ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে উৎপাদন বন্ধ করেছে। তবে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এর চেয়েও দীর্ঘ সময় ধরে নিষ্ক্রিয় রয়েছে।
ডিএসইতে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকা তালিকাভুক্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান হলো মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রতিষ্ঠানটি ২০০২ সাল থেকে বন্ধ। এ ছাড়া বাংলাদেশ ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোডস ২০১৬ সাল থেকে উৎপাদন কার্যক্রমে নেই। বন্ধ কোম্পানির তালিকায় ইস্পাত, বস্ত্র, বিদ্যুৎ, সিমেন্ট, প্রকৌশল, সিরামিক, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রাসায়নিক খাতের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সর্বশেষ তালিকায় যুক্ত হয়েছে অ্যাক্টিভ ফাইন কেমিক্যালস, এএফসি এগ্রো বায়োটেক এবং এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস।



