দুর্বল তদন্তে দীর্ঘদিন ঝুলছে চাঞ্চল্যকর খুনের মামলা

সাক্ষীর অভাব ও বাদি-বিবাদি আপসে বেশির ভাগ মামলায় খালাস

এস এম মিন্টু
Printed Edition

  • জুলাই হত্যাকাণ্ডের ১৩৬টি মামলার চার্জশিট দেয়া হয়েছে, দ্রুত বিচার শুরু জরুরি : আইজিপি

  • নির্বাচনের আগে ছাত্র-জনতা হত্যাকাণ্ডের মামলা চার্জশিট দেয়া প্রায় অসম্ভব : নুরুল হুদা

  • পুরনো মামলার পাশাপাশি নতুন মামলার চার্জশিট হচ্ছে : পিবিআই প্রধান

  • যুক্তরাষ্ট্রের মতো সক্ষমতা থাকলে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি সম্ভব : শাহদীন মালিক

  • সমন্বিত তদন্ত কমিটি করলে দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব : ড. তৌহিদুল হক

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনিকে নিজ বাসায় নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা আজো রহস্যে ঢাকা। প্রায় ১৩ বছর পার হলেও তদন্ত তো দূরের কথা, এখনো খুনিদের শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। একইভাবে নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন ও ত্বকী হত্যা মামলাতেও তদন্ত সংস্থাগুলো চার্জশিট দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সারাদেশে এ ধরনের বহু চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের মামলার তদন্ত দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকায় ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বিচারের আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন।

এ পরিস্থিতির মধ্যে নতুন করে সঙ্কট তৈরি হয়েছে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ওপর চালানো নৃশংস হত্যাযজ্ঞ বা গণহত্যার মামলাগুলো নিয়ে। এক জেলার মামলার আসামি অন্য জেলায় অবস্থান করায় আসামি, সাক্ষী ও বাদিরা পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে। অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছে না, কোথাও আবার বাদি ও বিবাদির আপসে মামলা দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে জুলাইয়ের গণ-আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের স্বজনদেরও দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হবে ন্যায়বিচারের জন্য এমন আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বর্তমানে নির্বাচনী হাওয়া বইছে। পুরনো বহু মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। এর মধ্যেই নতুন মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ফলে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, পুলিশের সমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও কর্মস্বাধীনতা বাড়ানো জরুরি। যেসব মামলা এককভাবে তদন্ত করা সম্ভব, সেগুলো নির্দিষ্ট একটি সংস্থার মাধ্যমেই দ্রুত শেষ করা উচিত। আর যেসব মামলা জটিল ও সংবেদনশীল, সেগুলোতে একাধিক সংস্থার সমন্বয়ে বিশেষ তদন্ত সেল গঠন করে কাজ করলে দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তদন্তে দুর্বলতা ও খালাসের হার : পুরনো মামলার তদন্তে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গত দশ বছরের পিবিআইয়ের অনুসন্ধানসংক্রান্ত এক সমীক্ষায় কর্মকর্তারা জানান, প্রায় ৫২ শতাংশ হত্যা মামলাই প্রমাণ করা যাচ্ছে না। ফলে অধিকাংশ আসামিই আদালতে খালাস পেয়ে যাচ্ছে।

পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো: মোস্তফা কামাল বলেন, আগের তুলনায় পিবিআই এখন অনেক বেশি মামলা তদন্ত সম্পন্ন করছে। তার ভাষায়, “হত্যা মামলার সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তদন্তের অগ্রগতিও তেমন উন্নত হয়েছে।” তিনি জানান, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশে প্রতি বছর সাড়ে চার হাজারের বেশি হত্যা মামলা হলেও তার বড় অংশই প্রমাণের অভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। বছরের পর বছর তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে অনেক আসামি বেকসুর খালাস পেয়ে যায়।

পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে দেখা যায়, হত্যা মামলায় সাজার হার কম হওয়ার পেছনে মূলত তিনটি কারণ রয়েছে। মোট মামলার প্রায় ৫১.৬৮ শতাংশই প্রমাণ করা যায় না। এর মধ্যে ৩৮.২ শতাংশ মামলা বাদি ও বিবাদির আপসে এবং ১১.৪ শতাংশ মামলা তদন্ত ত্রুটির কারণে খালাসে গড়ায়। যেসব মামলায় সাজা হয়েছে, তার মধ্যে ২৬.১ শতাংশ মৃত্যুদণ্ড, ৪১.৭ শতাংশ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৩২.২ শতাংশ সাধারণ সাজা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬২ শতাংশ পূর্বশত্রুতা, ৪০ শতাংশ পারিবারিক বা বৈবাহিক দ্বন্দ্ব, ২৪ শতাংশ জমি ও সম্পত্তি বিরোধ এবং ১৯ শতাংশ পূর্বপরিকল্পিত কারণে সংঘটিত হয়েছে। কোনো কোনো মামলার তদন্তে সর্বোচ্চ ১৯ বছর এবং চার্জশিটের পর বিচার শেষ হতে ৩০ বছর পর্যন্ত সময় লেগেছে।

জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলা ও পুলিশের চ্যালেঞ্জ : পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, গত এক বছর ধরে ছাত্র-জনতার ওপর সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মামলার তদন্তে কাজ চলছে। ইতোমধ্যে ১৩৬টি মামলার চার্জশিট দেয়া হয়েছে, বাকিগুলো প্রক্রিয়াধীন। তিনি বলেন, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত বিচার শুরু করা। চার্জশিটগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো না হলে আসামি গ্রেফতার কঠিন হয়ে পড়বে। ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হলে ওয়ারেন্ট জারি হবে এবং পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে।

আইজিপি আরো জানান, চার্জশিট গ্রহণে দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগলে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতা পায়। অন্তত তিন থেকে চার দিনের মধ্যে চার্জশিট গ্রহণ করে বিচার শুরু করা জরুরি। পুলিশ প্রতি মাসে ৮ থেকে ১০টি মামলার চার্জশিট দিতে সক্ষম। তিনি বলেন, ৫ আগস্ট থানাগুলো আক্রান্ত হওয়ায় বহু নথিপত্র পুড়ে গেছে। তবে আদালতের মূল নথি সংরক্ষিত থাকায় বিচার কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বর্তমানে এসব মামলার তদন্ত করছে পুলিশ ছাড়াও পিবিআই, র‌্যাব, এটিইউ ও সিআইডি।

নির্বাচনী চাপ ও তদন্তের ভবিষ্যৎ : পুলিশের সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা বলেন, সামনে জাতীয় নির্বাচন থাকায় পুলিশের প্রধান অগ্রাধিকার হবে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা। নির্বাচনের সময় তদন্ত কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই ধীর হয়ে পড়ে। ফলে নতুন করে বড় মামলার চার্জশিট দেয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন : সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, বাংলাদেশে বছরে গড়ে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার হত্যা মামলা হয়, যার প্রায় ৩০ শতাংশে শাস্তি নিশ্চিত হয় না। যুক্তরাজ্যে যেখানে মার্ডার ক্লিয়ারেন্স রেট ৯০ শতাংশের বেশি, সেখানে বাংলাদেশে প্রধান সমস্যা পুলিশের দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতি। তিনি বলেন, “আমাদের সক্ষমতা যদি আমেরিকার মতো হতো, তাহলে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি সম্ভব হতো। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, তদন্তে দফতর বদলের সংস্কৃতি, ফাইল চালাচালি এবং সময়ক্ষেপণই মূল সমস্যা। তিনি মনে করেন, গুরুতর মামলাগুলোতে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি নিয়ে সমন্বিত তদন্ত কমিটি গঠন করা হলে দ্রুত ও নিরপে তদন্ত সম্ভব।

আইনি বিশ্লেষণ কেন হত্যামামলায় বিচার দীর্ঘসূত্রতা ও খালাস বাড়ছে?

বাংলাদেশে হত্যা একটি গুরুতর অপরাধ হলেও বাস্তবে মামলার নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ বিলম্ব, দুর্বল তদন্ত এবং সাক্ষ্য সঙ্কট বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণœ করছে। দণ্ডবিধি, সাক্ষ্য আইন ও দ্রুত বিচার আইনের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- আইন যথেষ্ট শক্ত হলেও প্রয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সমতার ঘাটতিই মূল সমস্যা।

১. দণ্ডবিধি : শাস্তি কঠোর, কিন্তু প্রমাণের দায়ভার জটিল : বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী হত্যা অপরাধের শাস্তি অত্যন্ত কঠোর। ধারা ৩০২ : হত্যার জন্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড। ধারা ৩০৪ : অনিচ্ছাকৃত হত্যার জন্য বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড।

ধারা ৩৪ ও ১৪৯ : একাধিক ব্যক্তি যৌথভাবে অপরাধ করলে সম্মিলিত দায়। ধারা ১০৯ : অপরাধে প্ররোচনা দিলে সমান দায়।

আইনের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সন্দেহাতীতভাবে অপরাধ প্রমাণ করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়- ঘটনাস্থল সংরক্ষণে গাফিলতি; আলামত সংগ্রহ ও ফরেনসিক বিশ্লেষণে দুর্বলতা; ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণে সীমাবদ্ধতা; রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী চাপ।

এর ফলে প্রসিকিউশন সন্দেহাতীত প্রমাণ হাজির করতে ব্যর্থ হয়, যা দণ্ডবিধির কঠোর শাস্তি কার্যকর করার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে গণহত্যা বা রাজনৈতিক সহিংসতার মামলায় অভিযুক্তদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় পৃথক দায় প্রমাণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এতে অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা খালাস পেয়ে যায়।

২. সাক্ষ্য আইন : সাক্ষী ভীতি ও আপসই মামলার দুর্বলতম দিক: বাংলাদেশ সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ অনুযায়ী- মৌখিক সাক্ষ্য (চোখে দেখা সাক্ষী); লিখিত ও নথিগত প্রমাণ; পরিস্থিতিগত সাক্ষ্য; ফরেনসিক ও প্রযুক্তিগত প্রমাণ- এসবই গ্রহণযোগ্য। তবে বাস্তবে মামলার ফল নির্ভর করে মূলত সাীর বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর।

আইনের দুর্বলতা নয়, বরং বাস্তবতার সীমাবদ্ধতাগুলো হলো- সাক্ষী নিরাপত্তা আইনের অনুপস্থিতি: সাক্ষীরা হুমকি, ভয়ভীতি ও সামাজিক চাপে সাক্ষ্য দিতে অনাগ্রহী হন।

বাদি-বিবাদি আপসে অনেক মামলায় আর্থিক বা রাজনৈতিক চাপে আপস হয়ে যায়। বিলম্বিত বিচারে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে সাক্ষীর স্মৃতি দুর্বল হয়ে পড়ে বা সাক্ষী স্থানান্তরিত হন। পুলিশি জবানবন্দীর বিশ্বাসযোগ্যতা সঙ্কটের ফলে আদালতে সাক্ষ্য দুর্বল হয়ে যায় এবং প্রসিকিউশন কেস ভেঙে পড়ে। পিবিআইয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খালাসপ্রাপ্ত মামলার বড় অংশই সাক্ষ্য দুর্বলতার কারণে।

বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই একটি সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়ে আসছেন, যা না থাকায় হত্যামামলার বিচার প্রক্রিয়া কাঠামোগতভাবে দুর্বল থেকে যাচ্ছে।

৩. দ্রুত বিচার আইন : উদ্দেশ্য ভালো, বাস্তব প্রয়োগ সীমিত : ২০০২ সালে প্রণীত দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন-এর লক্ষ্য ছিল গুরুতর অপরাধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা। আইন অনুযায়ী- নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চার্জশিট গ্রহণ; সাক্ষ্যগ্রহণ দ্রুত সম্পন্ন; নির্ধারিত সময়সীমায় রায় ঘোষণার কথা, কিন্তু বাস্তবে- চার্জশিট গ্রহণে মাসের পর মাস বিলম্ব; মামলার শুনানি বারবার স্থগিত; বিচারক ও প্রসিকিউটরের স্বল্পতা; মামলার অতিরিক্ত চাপে আইনের উদ্দেশ্য কার্যত ভেস্তে যাচ্ছে।

আইজিপির বক্তব্য অনুযায়ী, চার্জশিট গ্রহণে যদি দুই মাস সময় লাগে, তাহলে দ্রুত বিচার আইনের লক্ষ্যই ব্যাহত হয়। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সমতা বাড়ানো না হলে রাজনৈতিক বা গণহত্যার মতো বড় মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।