কোম্পানি আইন সংশোধনে বড় উদ্যোগ কমছে মূলধনের বাধ্যবাধকতা

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কোম্পানি গঠনে উৎসাহিত করা, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এ বড় ধরনের সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এক ব্যক্তি কোম্পানি (ওপিসি) গঠনের ক্ষেত্রে পরিশোধিত মূলধনের বাধ্যবাধকতা ২৫ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে পাঁচ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে নির্দিষ্ট টার্নওভারের বাধ্যবাধকতাও তুলে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এ ছাড়া কোম্পানির সঙ্ঘস্মারক বা অবজেক্ট ক্লজ পরিবর্তনের জন্য হাইকোর্টে যাওয়ার পরিবর্তে জয়েন্ট স্টক কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদফতরের (আরজেএসসি) অনুমোদনের মাধ্যমে তা করার সুযোগ, কোম্পানির রেজিস্টার ও নথিপত্র ইলেকট্রনিকভাবে সংরক্ষণের আইনি স্বীকৃতি, প্রকৃত মালিক বা ‘হিতগ্রাহী স্বত্ব’-এর সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

গতকাল (সোমবার) রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআই কার্যালয়ে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর খসড়া সংশোধনী নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এফবিসিসিআই প্রশাসক মো: ফজলুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। অনুষ্ঠানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগের মহাপরিচালক (যুগ্মসচিব) মোহাম্মদ মোস্তফা জামাল হায়দার ‘কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ (তৃতীয় সংশোধন-২০২৬)’ শীর্ষক খসড়া প্রস্তাবটি উপস্থাপন করেন।

সভায় জানানো হয়, কোম্পানি আইনকে বর্তমান সময়ের উপযোগী ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে মোট ৪০টি ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে নতুন কিছু সংজ্ঞা যুক্ত করা, বিভিন্ন উপধারা সংশোধন, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানি ব্যবস্থাপনার আইনি ভিত্তি তৈরির বিষয় রয়েছে।

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের একটি হচ্ছে এক ব্যক্তি কোম্পানি গঠনের ক্ষেত্রে মূলধনের সীমা কমানো। বর্তমানে ওপিসি গঠনের জন্য ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ২৫ লাখ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে তা ৮০ শতাংশ কমিয়ে পাঁচ লাখ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট পরিমাণ টার্নওভারের যে শর্ত রয়েছে, সেটিও প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে স্বত্বাধিকারী ব্যবসাগুলোকে সহজে কোম্পানি কাঠামোর আওতায় আনার সুযোগ বাড়বে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আনুষ্ঠানিক ব্যবসায় প্রবেশের পথ সহজ হবে।

ব্যবসায়িক ও আইনি জটিলতা কমাতে কোম্পানির অবজেক্ট ক্লজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে এ ধরনের পরিবর্তনের জন্য উচ্চ আদালতের প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। প্রস্তাবিত সংশোধনী কার্যকর হলে আরজেএসসির রেজিস্ট্রারের অনুমোদনের মাধ্যমেই এ পরিবর্তন করা যাবে। এতে উদ্যোক্তাদের সময় ও আইনি ব্যয় কমার পাশাপাশি কোম্পানির ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া দ্রুত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

কোম্পানি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিও খসড়া সংশোধনীতে গুরুত্ব পেয়েছে। কোম্পানির বিভিন্ন রেজিস্টার ও নথিপত্র কাগজের পাশাপাশি বা সম্পূর্ণ ইলেকট্রনিক মাধ্যমে সংরক্ষণের আইনি স্বীকৃতি দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। কোম্পানির পরিচালক ও মালিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, টিআইএন, মোবাইল নম্বর ও ই-মেইলসহ প্রয়োজনীয় তথ্য একটি সুরক্ষিত অনলাইন ডেটাবেজে সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে।

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে প্রথমবারের মতো কোম্পানি আইনের অধীনে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআরকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর ফলে বড় কোম্পানিগুলোর সামাজিক ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। একই সাথে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য বাড়ানো এবং বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরিতেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থপাচার, করফাঁকি এবং ভুয়া বা শেল কোম্পানির মাধ্যমে অবৈধ অর্থ স্থানান্তর ঠেকাতেও সংশোধনীতে নতুন বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রকৃত মালিক বা ‘হিতগ্রাহী স্বত্ব’-এর একটি স্পষ্ট সংজ্ঞা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। মানিলন্ডারিং ও দুর্নীতির তদন্তের প্রয়োজনে বিদেশী নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাথে তথ্য বিনিময়ের সুযোগ রাখার প্রস্তাবও রয়েছে। কোম্পানি বিলুপ্ত হওয়ার পর নথিপত্র সংরক্ষণের সময় তিন বছর থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

কোম্পানির ধরন সহজে শনাক্ত করার জন্য নামের শেষে নির্দিষ্ট পরিচিতি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে ‘পিএলসি’, প্রাইভেট কোম্পানির ক্ষেত্রে ‘লিমিটেড’ এবং এক ব্যক্তি কোম্পানির ক্ষেত্রে ‘ওপিসি’ যুক্ত করার বিধান রাখা হচ্ছে। বড় ও তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে যোগ্যতাসম্পন্ন কোম্পানি সচিব নিয়োগ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও রয়েছে। একই সাথে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, আইনজীবী ও আয়কর উপদেষ্টাদের আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কোম্পানি প্রতিনিধি’ হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, কোম্পানি আইন সংশোধনের বিষয়ে ব্যবসায়ীদের যত সময় প্রয়োজন, সরকার তাদের তত সময় দেবে। তিনি বলেন, মতামত দিতে ৩০ দিন লাগলে ৩০ দিন, ৬০ দিন লাগলে ৬০ দিন সময় নেয়া যাবে। তবে একই সাথে সরকারের বৃহত্তর সংস্কার কর্মসূচির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

মন্ত্রী বলেন, ১৯৯৪ সালে কোম্পানি আইন প্রণয়নের পর দু’বার সংশোধন করা হয়েছে। বর্তমান সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আইনটিকে আরো যুগোপযোগী করা প্রয়োজন। ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ম ও পদ্ধতি সহজীকরণে বিশ্বের যেসব দেশ ভালোভাবে কার্যকর ব্যবস্থা পরিচালনা করছে, তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়া যেতে পারে।

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত খসড়াটি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়ীদের এটি ভালোভাবে পর্যালোচনা করে বাস্তবসম্মত পরামর্শ দিতে হবে। অন্যান্য দেশের কোম্পানি আইনের সাথে প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো তুলনা করে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোন বিধান অন্য দেশে কিভাবে কার্যকর হচ্ছে, তা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশে উপযোগী প্রস্তাব দিতে হবে। ব্যবসায়ীদের পরামর্শের ভিত্তিতেই ভালো ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক একটি আইন প্রণয়নের চেষ্টা করবে সরকার।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে বেসরকারি খাত। তাই ব্যবসায়ীদের জন্য কার্যকর ও সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোম্পানি আইন সংশোধনের ক্ষেত্রেও বেসরকারি খাতের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হবে।

মতবিনিময় সভায় বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ, বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ), এপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, বারবিডার সভাপতি আবদুল হক এবং ট্রান্সকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমানসহ ব্যবসায়ী ও শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো কার্যকর হলে কোম্পানি নিবন্ধন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে সময়, ব্যয় ও প্রশাসনিক জটিলতা কমবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কোম্পানি গঠনের সুযোগ বাড়লে ব্যবসার আনুষ্ঠানিকীকরণ ত্বরান্বিত হতে পারে। পাশাপাশি ডিজিটাল রেকর্ড, প্রকৃত মালিকানা শনাক্তকরণ ও তথ্য বিনিময়ের বিধান কার্যকর হলে করপোরেট স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে সংশোধনী চূড়ান্ত করার আগে ব্যবসায়ী মহলের মতামত এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হলে আইনটি দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।