পরিসংখ্যান ব্যুরোর অর্থনৈতিক জরিপ

স্কুল খাতে মূল্য সংযোজন বেড়েছে সাড়ে ২২ শতাংশ, সঙ্কুচিত শ্রমের অংশ

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

সেবা খাতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে দেশের স্কুল খাতে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ খাতের মোট স্থূল মূল্য সংযোজন দাঁড়ায় ৯৯.৭৩ মিলিয়ন টাকায়, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরের ৮১.৪৩ মিলিয়ন টাকার তুলনায় ২২.৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে এই খাতের মোট উৎপাদন ১০৩ মিলিয়ন টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১২২ মিলিয়ন টাকায় উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর অর্থনৈতিক জরিপে এই চিত্র পাওয়া যায়।

জরিপে দেখা যায়, প্রবৃদ্ধির এই ইতিবাচক সূচকের আড়ালে মূল্য সংযোজনে শ্রমিকের বা কর্মীর অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ায় আয় বণ্টন, মজুরির মান এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বিকাশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্কুল খাতে মূল্য সংযোজন বাড়লেও শিক্ষক-কর্মচারীদের আয় বা প্রাপ্তির অনুপাত কমে যাচ্ছে।

জাতীয় হিসাব ও সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট ১০৩ মিলিয়ন টাকার বিপরীতে মধ্যবর্তী ভোগ ব্যয় ছিল ২১.৫৭ মিলিয়ন টাকা। ফলে নিট মূল্য সংযোজন দাঁড়ায় ৮১.৪৩ মিলিয়ন টাকা। এ বছরে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে প্রথম প্রান্তিকে ১৯.৫২ মিলিয়ন টাকা থেকে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চতুর্থ প্রান্তিকে তা ২১.২৩ মিলিয়ন টাকায় পৌঁছায়।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট উৎপাদন ১৮.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১২২ মিলিয়ন টাকায়। বিপরীতে মধ্যবর্তী ভোগ ব্যয় সামান্য বেড়ে হয় ২২.২৭ মিলিয়ন টাকা। ফলে মূল্য সংযোজন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৯.৭৩ মিলিয়ন টাকায়। এ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে সর্বোচ্চ ২৫.৬৭ মিলিয়ন টাকার মূল্য সংযোজন রেকর্ড করা হয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যবর্তী ভোগ ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রেখে মোট উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়াটা খাতটির পরিচালন দক্ষতা এবং স্থিতিস্থাপকতার পরিচয় দেয়।

শ্রমের অংশ সঙ্কুচিত : বৈষম্যের নতুন সমীকরণ

উৎপাদন বৃদ্ধিতে সাফল্য এলেও অর্জিত মূল্যের আয় বণ্টনে ভারসাম্যহীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মূল্য সংযোজনে শ্রমের অংশ ছিল ৬৭.৬২ শতাংশ (প্রান্তিকভেদে ৬৪.৪৯% থেকে ৭০.৬৭%)। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা একসাথে কমে দাঁড়ায় ৬১.৫৮ শতাংশে। বিশেষ করে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে শ্রমের অংশ সর্বনিম্ন ৫৫.২৪ শতাংশে নেমে আসে (যদিও প্রথম প্রান্তিকে এটি ৬৬.৩০% ছিল)।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অর্জিত মূল্য সংযোজনে শ্রমের অংশ কমে যাওয়ার অর্থ হলো- উৎপাদিত অতিরিক্ত মূল্যের বড় একটি অংশ শিক্ষকদের মজুরি বা কর্মীদের সুবিধা বৃদ্ধিতে না গিয়ে উদ্যোক্তার পুঁজি, প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন বা মুনাফার অ্যাকাউন্টে চলে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘উৎপাদনশীলতা ও প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়া ইতিবাচক। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা স্কুল খাতে মূলধনের তুলনায় মানবসম্পদের ভূমিকা প্রধান। সেখানে শ্রমের অংশ কমে যাওয়া মানে শিক্ষক ও কর্মচারীদের প্রকৃত আয় ও জীবনযাত্রার মানে টানাপড়েন সৃষ্টি হওয়া।’

সার্বিক বিবেচনায় টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদরা কয়েকটি বিষয়ে জোর দিচ্ছেন। প্রথমত, ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টন যেন নিশ্চিত হয়। শুধু মোট মূল্য সংযোজন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; প্রবৃদ্ধির সুফল যেন শিক্ষক-কর্মচারীদের ন্যায্য মজুরি ও সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে সঠিকভাবে বণ্টিত হয় সে দিকেও নজর দিতে হবে। তাদের মতে, মানবসম্পদ ও প্রযুক্তির সমন্বয় দরকার। তবে ডিজিটালাইজেশন বা প্রযুক্তিগত অবকাঠামো বাড়াতে গিয়ে মানবসম্পদের অবমূল্যায়ন রোধ করতে হবে। এ ছাড়া দক্ষতা ও কাঠামোও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। আগামী দিনগুলোতে নীতি-নির্ধারণে কেবল ‘উৎপাদন বৃদ্ধি’ নয়, বরং ‘বণ্টন কাঠামো’ ও কর্মসংস্থানের মানদণ্ডকে সূচক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। প্রবৃদ্ধির এই গতি ধরে রাখার পাশাপাশি আয় বৈষম্য দূর করতে না পারলে দীর্ঘ মেয়াদে এ খাতের সেবার গুণগত মান ও মানবসম্পদের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।