ঢাকার একটি শিল্পাঞ্চলে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। কারখানার জেনারেটরের শব্দে বাতাস ভারী। বিদ্যুৎ থাকলে যে মেশিনগুলো ঘণ্টায় লাখ টাকার পণ্য উৎপাদন করে, সেগুলো দাঁড়িয়ে আছে। ম্যানেজার বললেন- ‘লাইনে বিদ্যুৎ আছে, কিন্তু ভোল্টেজ পড়ে যাচ্ছে। গ্যাসও ঠিকমতো আসছে না।’ দেশের জ্বালানি খাতের সঙ্কট আজ এই এক দৃশ্যেই ধরা পড়ে: কাগজে বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত, বাস্তবে অচল উৎপাদন।
বাংলাদেশে গত এক দশকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ও সক্ষমতা দ্রুত বেড়েছে। স্থাপিত ক্ষমতা ২৫-২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- যখন সক্ষমতা এত, তখন লোডশেডিং কেন? কেন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যায়? কেন সরকারকে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়? অনুসন্ধানে দেখা যায়, সমস্যার শিকড় উৎপাদনে নয়; জ্বালানি সরবরাহ, আমদানিনির্ভরতা, পরিকল্পনা ও নীতিগত কাঠামোয়।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের পাঁচটি অ্যালার্মিং চিত্র হলো-মাত্র পাঁচ বছরে বিদ্যুৎ-জ্বালানি ভর্তুকি বেড়েছে প্রায় চারগুণ- ১২ হাজার কোটি থেকে ৪৭ হাজার কোটিতে; ২০২২ সালেই ভর্তুকি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়-যা আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে; মোট ভর্তুকির প্রায় ৭০ শতাংশই যাচ্ছে বিদ্যুৎ খাতে- অর্থাৎ সমস্যার কেন্দ্র উৎপাদন চুক্তি ও ক্যাপাসিটি চার্জ: ২০২৫ সালে ভর্তুকি কমলেও তা দক্ষতার কারণে নয়, অনেকটাই বরং কম সরবরাহ ও বেশি লোডশেডিংয়ের ফল; আর বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ৩-৪ বছরে ভর্তুকি ৫০-৬০ হাজার কোটিতে পৌঁছাতে পারে।’
সক্ষমতার জাল, জ্বালানির ঘাটতি : দেশের বিদ্যুৎ খাত পরিচালনায় মূল ভূমিকা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি)। আর গ্যাস অনুসন্ধান ও সরবরাহে পেট্রোবাংলা। কাগজে সক্ষমতা বাড়লেও বাস্তবে বড় অংশের কেন্দ্র জ্বালানি সঙ্কটে বসে থাকে।
গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোই দেশের বিদ্যুতের মেরুদণ্ড। কিন্তু দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে আসছে। পুরনো ক্ষেত্রগুলোতে চাপ কমে গেছে, নতুন বড় আবিষ্কার নেই। ফলে এলএনজি আমদানি ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন চালানো যাচ্ছে না।
অন্যদিকে কয়লাভিত্তিক বড় প্রকল্প যেমন পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরো সক্ষমতায় চালাতে আমদানি কয়লার ওপর নির্ভর করতে হয়। আর মহেশখালী এলএনজি টার্মিনাল-এ ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল দিয়ে গ্যাস এনে জাতীয় গ্রিডে ঢোকানো হয়। অর্থাৎ বিদ্যুতের চাকা ঘোরে ডলারের জোরে।
ডলার সঙ্কট মানেই অন্ধকার : বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আজ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সাথে সরাসরি যুক্ত। এলএনজি, কয়লা, ফার্নেস অয়েল- সবই আমদানি করতে হয় ডলারে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বা রিজার্ভ কমলে সরবরাহে কাটছাঁট হয়। ফল- লোডশেডিং।
২০২২-২৪ সালে বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সময় বাংলাদেশ স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা কমিয়ে দিয়েছিল। তখনই দেশে দীর্ঘ লোডশেডিং ফিরে আসে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে, রফতানিতে প্রভাব পড়ে, ক্ষুদ্র ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একজন অর্থনীতিবিদের ভাষায়, ‘আমাদের বিদ্যুৎ খাত এখন জ্বালানির বদলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর দাঁড়িয়ে।’
ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদ : সমস্যার আরেক স্তর ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’। অনেক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন না করলেও চুক্তি অনুযায়ী সরকারকে নির্দিষ্ট অর্থ দিতে হয়। ‘টেক অর পে’ ধারা- বিদ্যুৎ নেন বা না নেন, টাকা দিতে হবে।
ফলে একদিকে কেন্দ্র বসে থাকে, অন্যদিকে রাষ্ট্র ভর্তুকি দেয়। বিদ্যুতের প্রকৃত দাম বাড়ে। বাজেটে চাপ পড়ে। বিশ্লেষকরা বলছেন, অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি করে পরে তা ব্যবহার না করতে পারা- এটা পরিকল্পনার বড় ব্যর্থতা।
পরিকল্পনা বনাম বাস্তবতা : গত দশকে ‘দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন’ ছিল মূল লক্ষ্য। কিন্তু চাহিদা অনুমান, জ্বালানি উৎস, আর্থিক সক্ষমতা- এসব বিবেচনা সমন্বিত হয়নি। ফল- কেন্দ্র আছে, জ্বালানি নেই।
একজন সাবেক জ্বালানি কর্মকর্তা বললেন, ‘আমরা কেন্দ্র বানিয়েছি আগে, জ্বালানির নিশ্চয়তা করেছি পরে। হওয়া উচিত ছিল উল্টো।’
নবায়নযোগ্য শক্তিতে ধীরগতি : বিশ্ব যখন সৌর ও বায়ু শক্তিতে ঝুঁকছে, বাংলাদেশ সেখানে এখনও পিছিয়ে। মোট বিদ্যুতের খুব সামান্য অংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে। জমি সঙ্কট, গ্রিড সীমাবদ্ধতা, নীতিগত জটিলতা- সব মিলিয়ে গতি কম।
অথচ শিল্পকারখানার ছাদে রুফটপ সোলার বসালে উল্লেখযোগ্য বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। অনেক গার্মেন্টস কারখানা ইতোমধ্যে নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, কিন্তু তা জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত হয়নি।
লুকানো ক্ষতি : অপচয় ও অদক্ষতা
গ্যাস লিকেজ, পুরনো যন্ত্রপাতি, অদক্ষ সিস্টেম- এসব কারণে উল্লেখযোগ্য জ্বালানি অপচয় হয়। স্মার্ট মিটারিং, এনার্জি অডিট, দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহার করলে চাহিদা কমানো যেত। অর্থাৎ উৎপাদন না বাড়িয়েও সঙ্কট কমানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘সবচেয়ে সস্তা বিদ্যুৎ হলো যেটা সাশ্রয় করা যায়।’ আপনার দেয়া টেবিলের ডাটা ধরে বিদ্যুৎ-জ্বালানি ভর্তুকির প্রবণতাটা একটু বিশ্লেষণ করলে পরিষ্কার বোঝা যায়- বাংলাদেশে ভর্তুকি এখন ‘অস্থায়ী সহায়তা’ নয়, বরং কাঠামোগত স্থায়ী ব্যয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সার্বিক ট্রেন্ড (২০২০-২০২৫)
বছর মোট ভর্তুকি (কোটি টাকা) বৃদ্ধি/হ্রাস
২০২০ ১২,০০০-
২০২১ ১৬,০০০ +৩৩%
২০২২ ৩১,০০০ +৯৪%
২০২৩ ৪২,০০০ +৩৫%
২০২৪ ৪৭,০০০ +১২%
২০২৫ ৪২,০০০- -১১%
পাঁচ বছরে প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে জ্বালানি খাতের ভর্তুকি ২০২০ সালে ছিল ১২ হাজার কোটি আর ২০২৪ সালে হয়েছে- ৪৭ হাজার কোটি। এই পাঁচ বছরে প্রায় ২৯২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা কোনো স্বাভাবিক মুদ্রাস্ফীতির ফল নয়, বরং নীতিগত চাপ ও আমদানিনির্ভরতার প্রভাব। এর মধ্যে বড় লাফ দেখা যায় ২০২২ সালে। ২০২১ ছিল ১৬,০০০ কোটি টাকা আর ২০২২ সালে হয় ৩১,০০০ কোটি টাকা। এক বছরে প্রায় দ্বিগুণ।
কারণ হিসেবে ধরা যায়: এলএনজি দাম বৃদ্ধি; আন্তর্জাতিক জ্বালানি সঙ্কট; বেশি স্পট মার্কেট আমদানি; ক্যাপাসিটি চার্জ বৃদ্ধি। এই সময় থেকেই ভর্তুকি ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে’ যেতে শুরু করে।
বিদ্যুৎ ভর্তুকি সবসময় বেশি
প্রতি বছর: বিদ্যুৎ ভর্তুকি = ৬৫-৭০ শতাংশ আর গ্যাস ভর্তুকি = ৩০-৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ সমস্যা মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন কাঠামোয়। বিশেষ করে: বেসরকারি কেন্দ্র; ক্যাপাসিটি চার্জ; উচ্চমূল্যের ফুয়েল।
২০২৫ সালে ভর্তুকি সামান্য কমেছে, ৪৭,০০০ থেকে ৪২,০০০ কোটি টাকা। এটা ‘সঙ্কট কমেছে’ তা নয়; বরং হতে পারে: দাম সমন্বয়,আমদানি কমানো বা লোডশেডিং বৃদ্ধির জন্য অর্থাৎ জনগণ কম বিদ্যুৎ পেয়েছে, তাই ভর্তুকি কমেছে। এটি স্বাস্থ্যকর কমতি নয়, বরং ‘সঙ্কোচনমূলক’ কমতি।
এই ডাটা স্পষ্ট করে যে: ক্যাপাসিটি চার্জ সংস্কার জরুরি; এলএনজি আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে; নবায়নযোগ্য শক্তি বাড়াতে হবে এবং লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি দরকার। নইলে ভর্তুকি ‘সামাজিক সুরক্ষা’ নয়, ‘বাজেটের ব্ল্যাকহোল’ হয়ে থাকবে।
নতুনভাবে ভাবার সময় : গত দেড় দশকে দ্রুত সম্প্রসারণ নিঃসন্দেহে ঘাটতি কমিয়েছে। কিন্তু সেই সম্প্রসারণ হয়েছে এমন একটি আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে, যেখানে গতি ছিল প্রধান লক্ষ্য- দক্ষতা বা মূল্য-সাশ্রয় নয়। ফলে: অতিমূল্যে চুক্তি; অতিরিক্ত সক্ষমতা; স্থায়ী ভর্তুকি; বাড়তে থাকা লোকসান- এগুলো কোনো সাময়িক বিচ্যুতি নয়। এগুলো সেই ব্যবস্থার স্বাভাবিক ফল, যেখানে প্রতিযোগিতা নেই, স্বচ্ছতা নেই, জবাবদিহি সীমিত। এই বাস্তবতা স্বীকার না করলে সমাধানও সম্ভব নয়।
বিদ্যুৎ দ্রুত বর্ধন এবং জ্বালানি সরবরাহ (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০ (বাতিল হওয়ার পর থেকে) এর অধীনে স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের সাথে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি সম্পর্কিত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বিদ্যমান অবস্থা এবং করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ করা হয়েছে। কমিটির অনুসন্ধান অনুসারে প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ পাঁচটি স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। প্রথমত, জরুরি আইন দীর্ঘমেয়াদি নিয়মে পরিণত হয়েছিল। কিউইইইএস (বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত বর্ধন আইন) প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার সরিয়ে দেয়, নিয়ন্ত্রক তদারকি দুর্বল করে, বিচারিক পর্যালোচনা সীমিত করে- ফলে সিদ্ধান্তে স্বেচ্ছাচারিতা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ত, চুক্তির নকশাতেই ঝুঁকি সরকারে চাপানো হয়েছে-ক্যাপাসিটি পেমেন্ট, টেক অর পে, ফুয়েল পাস থ্রু, ডলারে সূচক-সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি কম, রাষ্ট্রের ঝুঁকি বেশি। তৃতীয়ত, এর সরাসরি ফল- অবিরাম আর্থিক চাপ। রাষ্ট্রীয় ক্রেতা হিসেবে বিপিডিবির পেমেন্ট বেড়েছে উৎপাদনের চেয়ে অনেক দ্রুত। ভর্তুকি কখনো কখনো জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ ছুঁয়েছে। চতুর্থত, পরিকল্পনার ভুলে বিপুল অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। খালি কেন্দ্র থেকেও ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। পঞ্চমত, দুর্বল জবাবদিহি ব্যবস্থায় আত্ম-সংশোধনের সুযোগ ছিল না।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসির ভূমিকা ক্ষীণ হয়েছে, বাজারে অংশগ্রহণ সীমিত কয়েকটি গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এই পাঁচটি কারণ একসাথে একটি কাঠামোগত সঙ্কট তৈরি করেছে। ফলে শুধু কিউইইইএস আইন বাতিল যথেষ্ট নয়, এ আইন বাতিল হয়েছে- এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমস্যা হলো, আইনের অধীনে করা ২০-২৫ বছরের চুক্তিগুলো এখনো বহাল। আইন গেছে, কিন্তু দায় রয়ে গেছে। অর্থাৎ: ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা এলেও অতীতের ব্যয়বহুল চুক্তি এখনো অর্থ গিলে খাচ্ছে। এখানেই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা- প্রতিস্থাপন এবং সংস্কার।
সংস্কার মানে: পুরনো চুক্তি পুনঃআলোচনা; ক্ষতিকর শর্ত সংশোধন; ঝুঁকি পুনর্বণ্টন; নতুন কাঠামো তৈরি করা। এগুলো না করলে একই চাপ চলতেই থাকবে।
নীতিনির্ধারকদের কঠিন পছন্দ
কমিটির মতে- আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিলে: আইনি বিরোধ; বিনিয়োগকারীর উদ্বেগ; স্বল্পমেয়াদি অনিশ্চয়তা থাকবে। আর কিছু না করলে: ভর্তুকি বাড়তেই থাকবে; বিদ্যুতের দাম বাড়বে; শিল্প প্রতিযোগিতা কমবে; বাজেট সঙ্কট গভীর হবে- অর্থাৎ ঝুঁকি দুই দিকেই।
সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো স্বচ্ছ, ধাপে ধাপে, আইনি কাঠামোর মধ্যে সংস্কার। ভালো বিশ্বাসে পুনঃআলোচনা, তথ্য প্রকাশ, প্রমাণভিত্তিক পুনর্গঠন- এটাই মধ্যপন্থা। তবে যেখানে সরাসরি দুর্নীতির প্রমাণ আছে, সেখানে সরকারকে আইন অনুযায়ী চুক্তি বাতিল করার সাহস দেখাতেই হবে।
বিলম্বের দৃশ্যমান খরচ ও বিশ্বাস পুনর্গঠন
‘পরে দেখা যাবে’- এই মনোভাবই সবচেয়ে ব্যয়বহুল। প্রতি বছর: অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি পেমেন্ট, বেঞ্চমার্কের ওপর ট্যারিফ; ভর্তুকি- এসব মিলিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা হারাচ্ছে রাষ্ট্র। এই টাকা দিয়ে ট্রান্সমিশন লাইন উন্নয়ন; নবায়নযোগ্য জ্বালানি; গ্রিড আধুনিকীকরণ; শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সামাজিক সুরক্ষা করা যেত। অর্থাৎ বিলম্বের খরচ শুধু হিসাবের খাতা নয়- উন্নয়নের সুযোগ হারানো। প্রতিটি বছর দেরি মানে ভবিষ্যতে আরো বড় দায়।
বিদ্যুতের দাম বাড়লে মানুষ প্রশ্ন করে- কেন? যদি মানুষ বিশ্বাস করে: খরচ যৌক্তিক; সিদ্ধান্ত স্বচ্ছ; অপচয় নেই তাহলে ট্যারিফ মেনে নেয়া সহজ হয়। কিন্তু যদি মনে হয়: ‘ কেউ লাভ করছে, আমরা বিল দিচ্ছি’- তাহলে সামাজিক বৈধতা হারায়। তাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কেবল টেকনিক্যাল নয়- এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজন। বিশ্বাস ছাড়া বিদ্যুৎ খাত টেকসই হতে পারে না।
সামনে এক ক্ষুদ্র কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ জানালা- কিউইইইএস বাতিলের পর এখনই একটি সুযোগের সময়। প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যাস বদলানো কঠিন। কিন্তু এখনই না বদলালে আবার একই চক্রে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। এই সময়টাকে ব্যবহার করতে হবে: চুক্তি পর্যালোচনা; নীতিমালা পুনর্গঠন; স্বাধীন তদারকি কমিশন; শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো; দক্ষ মানবসম্পদ- এগুলো ছাড়া ‘সংস্কার’ শুধু স্লোগান হয়ে থাকবে।
করণীয় : বাস্তবসম্মত পথনকশা
বিদ্যুৎ দ্রুত বর্ধন এবং জ্বালানি সরবরাহ (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০ (বাতিল হওয়ার পর থেকে) এর অধীনে স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের সাথে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি সম্পর্কিত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বিদ্যমান অবস্থায় করণীয় সম্পর্কে সুপারিশে বলা হয়েছে- বর্তমান অবস্থার সমাধান কেবল নতুন কেন্দ্র নয়; বরং কাঠামোগত পরিবর্তন।
প্রথমত, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জরুরি বিনিয়োগ। অনশোর-অফশোর ব্লকে আন্তর্জাতিক অংশীদার আনা, দ্রুত সিসমিক সার্ভে, আধুনিক চুক্তি কাঠামো, এসব ছাড়া আমদানিনির্ভরতা কমবে না। দ্বিতীয়ত, এলএনজি ক্রয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি প্রয়োজন। স্পট মার্কেটের অস্থিরতা ঝুঁকিপূর্ণ। নির্দিষ্ট দামে স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ক্যাপাসিটি চার্জ পুনর্বিবেচনা জরুরি। অকার্যকর কেন্দ্র বাদ, কর্মক্ষমতা-ভিত্তিক পেমেন্ট, চুক্তি সংস্কার, এসব না করলে ভর্তুকির বোঝা কমবে না। চতুর্থত, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বড় ধাক্কা দিতে হবে। শিল্পে বাধ্যতামূলক রুফটপ সোলার, নেট মিটারিং সহজীকরণ, বড় সোলার পার্ক, ব্যাটারি স্টোরেজ- এসব দ্রুত বাস্তবায়ন করলে ২০৩০ সালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ নবায়নযোগ্য করা সম্ভব। পঞ্চমত, দক্ষতা ও সাশ্রয়কে অগ্রাধিকার। স্মার্ট গ্রিড, এলইডি, এনার্জি অডিট, এসব বিনিয়োগ দ্রুত ফল দেয়। সবশেষে, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা। অস্বচ্ছ চুক্তি, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি এসব না কমালে কোনো সংস্কার টেকসই হবে না।
আলো আছে, পথ বদলাতে হবে
বাংলাদেশের জ্বালানি খাত আজ সন্ধিক্ষণে। গত দশকের অবকাঠামো বিনিয়োগ ভিত্তি তৈরি করেছে, কিন্তু সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে টেকসই ব্যবস্থা গড়তে হলে নীতি বদলাতে হবে। ‘আরো কেন্দ্র’ নয়- ‘স্মার্ট পরিকল্পনা’ এখন সময়ের দাবি। দেশীয় গ্যাস, নবায়নযোগ্য শক্তি, দক্ষতা, আর্থিক শৃঙ্খলা এই চার স্তম্ভে দাঁড়ালেই জ্বালানিনিরাপত্তা সম্ভব। নইলে কাগজে আলো বাড়বে, বাস্তবে অন্ধকারই থাকবে। জ্বালানির ভবিষ্যৎ কেবল প্রযুক্তির প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনীতি, নীতি ও সুশাসনের পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেই বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে আলোকিত হবে।
এতদিন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতকে আমরা এতদিন ‘ক্ষমতার ঘাটতির গল্প’ হিসেবে দেখেছি- কত মেগাওয়াট যোগ হলো, কত কেন্দ্র উদ্বোধন হলো, কত ঘরে আলো জ্বলল। কিন্তু এই অনুসন্ধান দেখাচ্ছে, সঙ্কটের চরিত্র বদলে গেছে। আজ আর মূল সমস্যা ক্ষমতা কম নয়। মূল সমস্যা শাসন দুর্বল, খরচ বেশি, দায় অগণিত। অর্থাৎ বিদ্যুৎ খাত এখন প্রকৌশলের নয়, অর্থনীতি ও সুশাসনের সঙ্কটে।
শেষ কথা
বিদ্যুৎ কোনো বিলাসিতা নয়- এটি অর্থনীতির ভিত্তি। সুশাসনে বিদ্যুৎ: উৎপাদন বাড়ায়; কর্মসংস্থান বাড়ায়; উন্নয়ন ত্বরান্বিত করে আর দুর্বল শাসনে বিদ্যুৎ: ভর্তুকির বোঝা; বাজেট সঙ্কট এবং শিল্পের পতন ঘটায়।
সব কথার সারমর্ম একটাই- বিদ্যুৎ খাতের ফলাফল প্রযুক্তি নয়, নীতিগত সিদ্ধান্তের ফল। বাংলাদেশ এখন একটি মোড়ে দাঁড়িয়ে। সাহসী সংস্কার করলে বিদ্যুৎ হবে প্রবৃদ্ধির শক্তি। বিলম্ব করলে- এটাই হবে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক বোঝা। পছন্দ এখন রাষ্ট্রের। আর সেই পছন্দের মূল্য দেবে পুরো জাতি।



