- চার দফা মেয়াদ বাড়ানোর পরও অসমাপ্ত কাজ, ঝুঁকিতে ১৪০ বছরের রেলসেতু
- ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতায় আটকে আছে ২৩৫ কোটি টাকার প্রকল্প
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সোনাহাট স্থলবন্দর ঘিরে যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখেছিলেন স্থানীয়রা, আট বছর পরও তা অধরাই থেকে গেছে। ২০১৮ সালের ৯ জুন বন্দরটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়ার পর ভারতের সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলোর সাথে বাণিজ্যের নতুন দুয়ার খোলার আশায় বন্দর এলাকায় ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন শুরু হয়। কিন্তু বন্দরের প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠার কথা যে সড়ক সেতুর, সেই ৬৪৫ মিটার দীর্ঘ পিসি গার্ডার সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলেও সংযোগ সড়কের অভাবে এখনো অসমাপ্ত। আটকে আছে রেলওয়ে ও ব্যক্তিমালিকানার ভূমি নিয়ে জটিলতায়।
সব মিলিয়ে সোনাহাট সেতুর ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে দুই সরকারি সংস্থার মধ্যে দ্রুত সমঝোতার ওপর। ততদিন জরাজীর্ণ রেলসেতুতে ঝুঁকি মাথায় নিয়েই চলতে হচ্ছে বন্দরনির্ভর লক্ষাধিক মানুষকে, আর প্রতিদিন সরকারের কোষাগার থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সম্ভাব্য রাজস্বের একটি বড় অংশ।
জরাজীর্ণ রেলসেতুর ওপর ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত : ১৪০ বছরের পুরনো একমুখী বঙ্গ সোনাহাট রেলসেতুর ওপর দিয়েই এখনো চলছে বন্দরের সব আমদানি-রফতানি কার্যক্রম। সড়ক বিভাগের সাইনবোর্ডে ১০ টনের বেশি মালামাল পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পাথর ও কয়লাবাহী ট্রাকগুলো নিয়মিত ৩০-৩৫ টন মালামাল নিয়ে সেতু পার হচ্ছে। প্রকৌশলীদের আশঙ্কা, এতে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এই ঝুঁকি এড়াতেই ২০১৮ সালের জুনে ২৩৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৪ স্প্যানের নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করে সড়ক বিভাগ। তবে চার দফা মেয়াদ বাড়ানোর পরও কাজ শেষ হয়নি। সরেজমিন দেখা গেছে, সেতুর মূল কাঠামো ও ভূরুঙ্গামারী প্রান্তের সংযোগ সড়ক সম্পন্ন হলেও পূর্ব দিকে সোনাহাট প্রান্তে ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতায় কাজ থমকে আছে।
দ্বৈত মালিকানার জটিল হিসাব : সোনাহাট ইউনিয়নের গনারকুটি মৌজার ১০০২ থেকে ১০০৫ দাগের জমি নিয়েই মূল বিরোধ। স্থানীয় বাসিন্দা বাবু মিয়া ও শফিকুল ইসলামের দাবি, জমিগুলো তাদের পৈতৃক সম্পত্তি এবং সিএস, এসএ ও আরএস রেকর্ডেও তাদের নামে নথিভুক্ত। রেলওয়ের ম্যাপ বা গেজেটে এসব দাগের কোনো উল্লেখ নেই বলেও তারা জানান। তবে রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা মনজুর হোসেনের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি জানান, জমিগুলো বাংলাদেশ রেলওয়ের মালিকানাধীন হলেও কিছু ব্যক্তি জালিয়াতির মাধ্যমে নিজ নামে রেকর্ড করে নিয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান। একই সাথে তিনি জানান, রেল ভূমির কেন্দ্রীয় ভূ-বরাদ্দ কমিটির সাথে সমন্বয় করে নীতিমালা অনুযায়ী হস্তান্তরের সুযোগও রয়েছে। উল্লেখ্য, রেকর্ড সংশোধনে রেলওয়ে এখনো কোনো মামলা দায়ের করেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এ দিকে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ২০২৩ সালের ১ মার্চ সাত কোটি চার লাখ ৮০ হাজার টাকা জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করে সড়ক বিভাগ। কিন্তু ২০২২ সালের ৯ মার্চ ধারা-৭ নোটিশ জারির পর প্রক্রিয়ায় আর কোনো অগ্রগতি হয়নি অর্থাৎ অর্থ বরাদ্দের পরও প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া কার্যত স্থবির।
ব্যবসায়ী ও ঠিকাদারের ক্ষোভ : সোনাহাট স্থলবন্দর ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বলেন, সংযোগ সড়ক না হওয়ায় আট বছর ধরে চলমান সেতুর কাজ শেষ হচ্ছে না, ফলে ব্যবসায়ীরা যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি সরকারও বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এম এম বিল্ডার্সের প্রকল্প ব্যবস্থাপক শামীম আহমেদও জানান, জমি জটিলতায় কাজ বন্ধ থাকায় তারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন এবং সমস্যার সমাধান হলেই দ্রুত কাজ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দেন।
বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়ন : অর্থনীতি ও স্থানীয় সরকারসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, স্থলবন্দর ও সীমান্ত অবকাঠামো প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে দুই সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা বাংলাদেশে একটি পুনরাবৃত্ত সমস্যা। রেলওয়ে ও সড়ক বিভাগের মতো দু’টি স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয়াধীন সংস্থার মধ্যে ভূমি রেকর্ড যাচাই ও হস্তান্তরের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় এ ধরনের প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলে থাকে বলে মনে করছেন স্থানীয় অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। তাদের হিসাবে একটি সচল স্থলবন্দর প্রতিদিন যে পরিমাণ শুল্ক ও ভ্যাট আদায় করতে পারত, সেতু অসম্পূর্ণ থাকায় আট বছরে সরকার তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। উন্নয়ন-অর্থনীতি বিশ্লেষকরা আরো বলছেন, আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট জবাবদিহিতা ও সময়সীমা বেঁধে না দিলে একই ধরনের জটিলতা ভবিষ্যতেও অন্যান্য সীমান্ত বন্দর প্রকল্পে দেখা দিতে পারে।
সড়ক বিভাগের বক্তব্য : কুড়িগ্রাম সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মীর নিজাম উদ্দিন জানান, সেতুর সুপারস্ট্রাকচার ও পশ্চিম প্রান্তের এপ্রোচ সড়কের কাজ শেষ হলেও পূর্ব প্রান্তে রেলওয়ে ও স্থানীয় মালিকানার দ্বৈততার কারণে অধিগ্রহণ সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। সমস্যা সমাধানে এরই মধ্যে দু’টি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হলেও সুরাহা হয়নি, তৃতীয় সভার প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে তিনি জানান।
দ্রুত শেষ করার আশ্বাস ডিসির : কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, রেলের কিছু জমি ব্যক্তিবিশেষের নামে রেকর্ড হওয়ার বিষয়টি তার জানা আছে এবং তৃতীয় আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা আয়োজনের চেষ্টা চলছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত সংযোগ সড়কের কাজ শেষ করে সেতু চালু করা সম্ভব হবে।



