আবরার ফাহাদ স্মৃতিস্তম্ভ

আগ্রাসনবিরোধী ৮ স্তম্ভের ডিজাইন যেভাবে হলো

Printed Edition
আবরার ফাহাদ স্মৃতিস্তম্ভ
আবরার ফাহাদ স্মৃতিস্তম্ভ

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

রাজধানীর পলাশীতে গত মঙ্গলবার উদ্বোধন হলো ‘আবরার ফাহাদ স্মৃতিস্তম্ভ/ আগ্রাসনবিরোধী আট স্তম্ভ।’ এই স্মৃতিস্তম্ভের নকশার সাথে জড়িত নাজমুল হক নাইম এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন, এই স্থাপত্যটির পেছনের গল্পটি অনেকের অজানা। অথচ এই গল্প জানা প্রয়োজন, কারণ ভিত্তিপ্রস্তর বা নামফলকে তা লেখা নেই। ফলে কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে পারে পুরো ইতিহাস। তাই ডিজিটাল রেকর্ড হিসেবে এই বিবরণটি রাখা জরুরি মনে করেছি।

তিনি জানান, কম্পিটিশনে জমা পড়া মোট চারটি প্রাথমিক নকশা থেকে উদ্যোক্তারা এই চূড়ান্ত নকশাটি বেছে নেন। অন্যান্য প্রাথমিক ডিজাইনগুলো জমা দেন বুয়েটিয়ান স্থপতি সাঈদ আহমেদ (সেশন ১৯৯৩-৯৪), স্থপতি সাদ সিদ্দিকী (সেশন ২০১৪-১৫) এবং স্থপতি সেজান হোসাইন (সেশন ২০১৯-২০)। চূড়ান্ত স্থাপত্য নকশায় আমি, স্থপতি নাজমুল হক নাঈম, দায়িত্ব পালন করেছি। কাঠামোগত নকশায় ছিলেন বুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী প্রকৌশলী তাইফুর রহমান ও প্রকৌশলী মাসুদুর রহমান। ডিজাইনের থ্রিডি ভিজ্যুয়ালাইজেশন করেছেন ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগীয় সাবেক শিক্ষার্থী স্থপতি উৎস।

মূল ধারণা : স্থাপত্যটির মূল ভাবনা ছিল আটটি স্তম্ভ আটটি মূল্যবোধ বা ধারণাকে ধারণ করবে।

এই আটটি ধারণা হলো:

১. মানবিক মর্যাদা

২. সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা

৩. দেশীয় শিল্প, কৃষি, নদী, বন ও বন্দর রক্ষা

৪. অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা

৫. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি

৬. গণপ্রতিরক্ষা

৭. গণতন্ত্র ও

৮. সার্বভৌমত্ব

এই আটটি ধারণা পরস্পর সম্পর্কিত, যা ক্রমান্বয়ে আমাদের সার্বভৌমত্বের দিকে নিয়ে যায়।

প্রতিটি স্তম্ভ এমনভাবে নির্মিত হয়েছে, যেন দূর থেকে মনে হয়, কিছু অতি প্রাকৃতিক অবয়ব শূন্যে ভাসছে। স্তম্ভের নিচে কালো রঙের একটি বেইস আছে, যা শোকের প্রতীক। কালো ধাতব সাপোর্ট (মূল নকশায় যা ছিল অত্যন্ত চিকন মেটাল) দিয়ে স্তম্ভগুলো বেইসের সাথে সংযুক্ত, রাতের বেলা দূর থেকে তা ভেসে থাকা সাহসী আত্মার প্রতীকী অবয়ব মনে হয়।

মাঝের কংক্রিট অংশ প্রতীক করে আবরারের মতো দৃঢ়চেতা মানুষদের, যারা প্রতিকূলতার মধ্যেও আদর্শে অটল থাকে। উপরের জংধরা মেটালের অংশে থাকা ছিদ্রগুলো শোষকের আঘাতে ও বুলেটে বিদ্ধ শোষিতের দেহের প্রতিরূপ। জংধরা মেটাল আমাদের মনে করিয়ে দেয় আবরারের মতো অসংখ্য শহীদের কথা, যাদের রক্ত শুকিয়ে গেলেও তারা চেতনায় চিরভাস্বর।

রাতের বেলা সেই ক্ষতবিক্ষত দেহ থেকেই ঠিকরে বের হয় আলো, যা নতুন পথিকদের পথ দেখায়। উপর দিকে ছুড়ে দেয়া আলোকরেখা তাদের অনন্ত যাত্রার প্রতীক, যা দূর থেকেও অনুপ্রেরণা জাগায়।

নির্মাণ ও বাস্তবায়ন

এই উদ্যোগের শুরু থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত নিরলসভাবে কাজ করেছেন এম ওয়ালি উল্লাহ (সেশন ২০১৩-১৪), শামসুজ্জামান সম্রাট (সেশন ২০১৬-১৭), আলী আম্মার মুয়াজ (সেশন ২০১৬-১৭), আবরার ফাইয়াজসহ আরো অনেকে। সিটি করপোরেশন, বুয়েট, ট্রাফিক বিভাগসহ নানা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তারা কাজটির গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং দ্রুত বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করেন। বিশেষ করে সম্রাটের নিঃস্বার্থ পরিশ্রম এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তার উদ্যোগ না থাকলে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হতো কি না, তা নিয়েও সন্দেহ ছিল।

প্রকল্প বাস্তবায়নের পেছনে এনসিপি নেতা আখতার হোসেন ও তার টিম কাজ করেছেন নিবিড়ভাবে। নামকরণ ও ধারণা বিকাশে সহযোগিতা করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। পুরো প্রকল্পটির তত্ত্বাবধানে ছিলেন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, যিনি দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজটি সম্পন্ন করতে ভূমিকা রাখেন।

সিটি করপোরেশনের একদল প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও শ্রমিক নিরলস পরিশ্রম করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্মৃতিস্তম্ভটির নির্মাণ সম্পন্ন করেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সম্ভব হয়েছে এই বাস্তবায়ন।

সবাইকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ যাদের যৌথ অবদানে আবরার ফাহাদ স্মৃতিস্তম্ভ/ আগ্রাসনবিরোধী আট স্তম্ভ আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে।