বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি সরকার যাত্রা শুরু করেছে ২৯ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন রিজার্ভ নিয়ে। যা দিয়ে প্রায় ৫ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে। প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ১৫ বিলিয়নের কম রিজার্ভ নিয়ে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব নিয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বলা চলে তলানিতে নেমে গিয়েছিল। বিশেষ করে তাদের শেষ সময়ে গড়ে প্রতি মাসেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এক বিলিয়ন ডলার করে কমে যেত। এর অন্যতম কারণ হিসেবে ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, আমদানির আড়ালে প্রতি মাসেই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হতো। রেমিট্যান্স কমে গিয়েছিল হুন্ডি তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায়। ফলে প্রতি মাসেই যে পরিমাণ রফতানি ও রেমিট্যান্সসহ বিভিন্ন উৎস থেকে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশ আহরণ করত, আমদানিসহ বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় হতো তার চেয়ে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি। ফলে প্রতি মাসেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এক বিলিয়ন ডলার করে ক্ষয় হয়ে যেত। যেখানে এক সময় রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছিল, সেখান থেকে কমতে কমতে ১৫ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যায়। তবে রিজার্ভ আরো কমে যেত, যদি ওই সময় আমদানি ব্যয় পুরোপুরি পরিশোধ করা হতো। দেখা গেছে, প্রতি মাসেই বিভিন্ন পণ্যের আমদানি ব্যয় বাকি রাখা হতো। জ্বালানি তেল, সারসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানি ব্যয় পরিশোধ করতে না পেরে বাকি রাখা হতো। এতে বাড়তি সুদ পরিশোধ করতে হতো। ডলার সঙ্কটের কারণে দামও বেড়ে যায়। ৮৪ টাকার ডলার ১৩০ টাকা পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল।
দেশের ছাত্র-জনতা আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। পতিত প্রধানামন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সিনিয়র নেতারা ভারতে পালিয়ে যায়। ২০২৪ এর ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নিয়ে টাকা পাচার প্রতিরোধ ব্যাপক উদ্যোগ নেয়। অর্থ পাচারকারী, ব্যাংক লুটেরাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়। দেশের সম্পদ লুটপাটে যে অলিগার্ক শ্রেণী গড়ে উঠেছিল তারা রাতারাতি দেশ থেকে পালিয়ে যায়। ফলে অর্থ পাচার কার্যত বন্ধ ও কমে যায় হুন্ডি প্রবণতা। এতে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়তে থাকে। প্রতি মাসেই রেমিট্যান্সের নতুন রেকর্ড হয়। যেখানে আগে দেড় বিলিয়ন ডলারেরও কম রেমিট্যান্স আসতো, সেখানে আন্তর্বর্তী সরকার গঠন করার পর আড়াই বিলিয়ন ডলার থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার উঠে যায়। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়তে থাকে। পাশাপাশি বকেয়া আমদানি ব্যয়সহ চলতি আমদানি ব্যয় পরিশোধ হতে থাকে। এভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শুধু বকেয়া আমদানি ব্যয় ও বকেয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ করে ৪ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, গতকাল ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে হয়েছে ৩৪ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার, আর আইএমএফের হিসেবে ২৯ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে প্রতি মাসে ৬ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি আমদানি ব্যয় হয়। সে হিসাবে ৫ মাসের সমান আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিয়ে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ায় ডলারের মূল্যেও স্থিতিশীল রয়েছে। বর্তমানে প্রতি ডলারের দাম ১২৩ টাকা। প্রায় প্রতি দিনই বাজার থেকে উদ্বৃত্ত ডলার কিনছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি অর্থ বছরের প্রথম ৭ মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ৪ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার কিনেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, হুন্ডি প্রতিরোধ ও টাকা পাচার বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের চলমান কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরো বাড়বে। এতে স্থিতিশীল থাকবে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার।



