ইবিতে ‘ম্যানার শেখানোর’ নামে নবীনদের হয়রানি

ল্যাম্পপোস্ট গণনা, সেলফি তোলা, গভীর রাতে আটকে রাখার অভিযোগ

Printed Edition

ইবি সংবাদদাতা

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) বিভিন্ন বিভাগে ‘ম্যানার শেখানো’ ও ‘ফরমাল পরিচয় পর্বের’ নামে নবীন শিক্ষার্থীদের হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এসবের মধ্যে রয়েছে ল্যাম্পপোস্ট গণনা, বিভিন্ন স্থাপনার সামনে গিয়ে সেলফি তোলা, ভবনের উঁচু তলায় উঠে ছবি তোলা, রাতে মেসের ছাদে আটকে রাখা এবং জোর করে ধূমপান করানোর মতো ঘটনা। এতে নবীনদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হলেও বেশির ভাগ ঘটনা আপসের মাধ্যমে মীমাংসা হওয়ায় প্রশাসনের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ যায়নি। ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, ল অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, আইন, আল-ফিকহ অ্যান্ড ল, ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, পলিটিক্যাল সায়েন্স, ফার্মেসি ও পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এসব অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, র‌্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে এবং অভিযোগ বা প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের নবীনদের কয়েক দফায় শ্রেণিকক্ষ, আবাসিক হলের বাইরে ও গভীর রাতে ডেকে ‘ফরমাল পরিচয়’ দিতে বলা হয় বলে অভিযোগ। পরিচয়ে ভুল হলে গালিগালাজ, অপমান ও বিদ্রƒপের পাশাপাশি মোবাইল ফোন জমা নেয়া হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ভুল উত্তরের শাস্তি হিসেবে নবীনদের পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাম্পপোস্ট গুনতে পাঠানো, লাইব্রেরি ও ছাত্রী হলের সামনে গিয়ে ছবি তুলে আনতে বলা এবং একটি ভবনের পঞ্চম তলায় উঠে সেলফি তুলে নির্দিষ্ট সময়ে ফিরে আসতে বাধ্য করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ ঘটনায় ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সানি নেহালের নাম প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে এসেছে। তিনি অভিযোগের কয়েকটি বিষয় আংশিক স্বীকার করে বলেন, এসব কার্যক্রমে তার ব্যাচের অনেকেই যুক্ত ছিলেন। তার দাবি- নবীনদের স্থাপনার নাম জিজ্ঞাসা করা, ভুল হলে সেখানে পাঠানো, ল্যাম্পপোস্ট গুনতে বলা এবং বারবার পরিচয় নেয়ার মতো কর্মকাণ্ড হতো। উঁচু তলায় এক নবীনকে সেলফি তুলতে পাঠানোর ঘটনাকে ভুল হয়েছে বলেও স্বীকার করেন তিনি।

ক্যাম্পাসের বাইরে কুষ্টিয়া শহরের আনন্দনগরের একটি ছাত্রাবাসেও র‌্যাগিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। এক ভুক্তভোগীর ভাষ্য, কয়েকজন সিনিয়র ও তাদের পরিচিতরা নবীনদের ছাদে নিয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখেন। পরে ধোঁয়ায় ভরা একটি কক্ষে নিয়ে পরিচয় জানতে চাওয়া হয়। ভুল উত্তর দিলে গালিগালাজ করা হয়। একপর্যায়ে একজন শিক্ষার্থী কান্না শুরু করলে মেসের অন্য সিনিয়ররা এসে তাদের উদ্ধার করেন।

আল-ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগের এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ল অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের এক নবীন ছাত্রীকে বারবার পরিচয় দিতে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে। একই বিভাগের কয়েকজনের বিরুদ্ধে এক নবীনকে জোর করে ধূমপান করানো ও রাত ১টা পর্যন্ত আটকে রাখার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এসব ঘটনা পরে আপসের মাধ্যমে মীমাংসা হয়।

পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, পলিটিক্যাল সায়েন্স, আইন ও ফার্মেসি বিভাগের নবীন শিক্ষার্থীরাও পরিচয়পর্বে বিব্রত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ- ভুল হলে গালিগালাজ করা, বারবার পরিচয় দিতে বাধ্য করা এবং রাতে বিভিন্ন স্থানে ডেকে নেয়ার ঘটনা ঘটেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, র‌্যাগিংয়ের বিষয়ে প্রশাসনের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি। কেউ ফৌজদারি অপরাধ করলে তার ছাত্রত্বও চলে যেতে পারে। সরাসরি কোনো অভিযোগ না এলেও কিছু বিষয় প্রশাসনের নজরে এসেছে এবং বিভাগীয় চেয়ারম্যানদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, নবীনদের ‘ফরমাল পরিচয়’ শেখানোর কোনো নিয়ম বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। এ বিষয়ে বিভাগীয় সভাপতিদের কাছে নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। ছাত্র উপদেষ্টা ড. ওবায়দুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। অভিযোগ না এলেও প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ভিসি অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, বিষয়টি তার নজরে এসেছে। বিভাগীয় চেয়ারম্যান ও ডিনদের কাছে নোটিশ পাঠানোর পাশাপাশি বিষয়টি খতিয়ে দেখতে প্রক্টরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।