বাড়ছে নির্মাণসামগ্রীর দাম টাকা সাদার সুযোগ থাকছে

প্রস্তাবিত বাজেট

কালোটাকা সাদা করার ক্ষেত্রে করহার বাড়ানো হলেও জমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধনের কর কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

শাহ আলম নূর
Printed Edition

আসছে নতুন বাজেট। আবারো দেয়া হচ্ছে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ। একই সাথে এবারের বাজেটে নির্মাণ শিল্পের সাথে জড়িত পণ্যের দাম বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন এবারের বাজেটে থাকছে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ। বাড়ি এবং অ্যাপার্টমেন্ট কেনার ক্ষেত্রে এই সুযোগ থাকছে বলে এনবিআর সূত্র জানিয়েছে। কালোটাকা সাদা করার ক্ষেত্রে করহার বাড়ানো হলেও জমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধনের কর কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। বাজারমূল্যে দলিল নিবন্ধন উৎসাহিত করতে এ সুপারিশ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এ দিকে এবারের বাজেটে নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়বে বলে জানা গেছে। এই শিল্পের অন্যতম উপাদান হচ্ছে রড। রাজস্ব আদায়ে প্রস্তাবিত বাজেটে এসব পণ্যে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হচ্ছে। আমদানি ও উৎপাদন পর্যায়ে শুল্ক-ভ্যাট ৪০ শতাংশের বেশি। প্রস্তাবিত বাজেটে আমদানিতে ২০-২৩ শতাংশ ও উৎপাদনে ২০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বাতিল হতে পারে বিদ্যমান ফিক্সড আমদানি শুল্ক। তবে শুল্ককর বাড়ানো হলে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি টনে রডের দাম বাড়তে পারে প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন বাজেট সার্বিকভাবে বাস্তবসম্মত হতে হবে। বিলাসী লক্ষ্য থাকা উচিত হবে না। এখানে লক্ষ্য রাখতে হবে যে আমাদের অর্থনীতির ওপরে যে ঝড়ঝাপটা বয়ে গেছে এখান থেকে যেন আমরা পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারি। অতি উচ্চাভিলাষী বাজেট থাকলে ভালো আউটকাম দেয় না বলে তারা মনে করছেন। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে স্টিলের মূল কাঁচামাল স্ক্র্যাপ আমদানিতে প্রতি টনে ফিক্সড শুল্ক আদায় করা হয় ১ হাজার ৫০০ টাকা। অন্য দিকে স্টিল থেকে বিলেট ও রড উৎপাদনে প্রতি টনে ফিক্সড ভ্যাট ২ হাজার ২০০ টাকা। সবমিলিয়ে আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট মিলিয়ে সরকার প্রতি টনে পাচ্ছে ৩ হাজার ৭০০ টাকা।

এ দিকে এনবিআর সূত্র বলছে, নতুন বাজেটে কমতে পারে এলএনজি ও জ্বালানি তেলের দাম। আগামী ২ জুন ঘোষণা করা হবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বেতার ও টেলিভিশনে এ বাজেট ঘোষণা করবেন। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আদায় ও ভোক্তার স্বার্থ বিবেচনায় বেশ কিছু পণ্যে শুল্ক ও ভ্যাট আরোপ বা কমানো হতে পারে। যার প্রভাবে বাজারে কিছু পণ্যের দাম কমতে বা বাড়তে পারে। যার মধ্যে রয়েছে এলএনজি, ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যাটারি, রড, বাস, প্লাস্টিক পণ্য, মাটির ও পাতার তৈরি জিনিসপত্র ইত্যাদি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রস্তাবিত বাজেটে এলএনজি আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার হতে যাচ্ছে। বর্তমানে এলএনজি আমদানির সময় ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ২ শতাংশ অগ্রিম কর দিতে হয়। আবার গ্রাহকপর্যায়ে বিক্রির সময় ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ২ শতাংশ উৎসে কর দিতে হয়। এ ছাড়া বাইরেও এলএনজি মার্জিনের বিল পরিশোধের সময় গ্যাস বিতরণ সংস্থার কাছ থেকে ৫ শতাংশ উৎসে কর কাটা হয়। ক্রুড ফুয়েল অয়েল বা অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ওপর শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হতে পারে এবং অন্যান্য জ্বালানি আমদানিতে শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশ কমানো হতে পারে। এর ফলে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমতে পারে। এ ছাড়া স্থানীয় শিল্প যেমন টায়ার, টিউব, ব্রেক সু, ব্রেক প্যাড, মার্বেল ও গ্রানাইট উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর শুল্ক কমানোর প্রস্তাব থাকতে পারে প্রস্তাবিত বাজেট। ১৬ থেকে ৪০ আসনের বাস আমদানিতে শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ, ১০ থেকে ১৫ আসনের মাইক্রোবাস আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব থাকছে প্রস্তাবিত বাজেটে।

ঢাকাসহ সারা দেশে বিপদজ্জনক বাহনের নাম ব্যাটারিচালিত রিকশা। অনিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যাটারিচালিত রিকশার দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই রিকশার ১২০০ ওয়াটের ডিসি মোটরের কাস্টমস শুল্ক ১ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ করা হচ্ছে। এ দিকে মাটির ও পাতার তৈরি তৈজসপত্রের ভ্যাট অব্যাহতি দেয়ার প্রস্তাব আসছে নতুন বাজেটে। বর্তমানে এসব পণ্যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে, যা বাজেটে প্রত্যাহারের প্রস্তাব রয়েছে বলে এনবিআর সূত্র জানিয়েছে।

এনবিআর সূত্র বলছে, একবার ব্যবহারযোগ্য (ওয়ান টাইম) প্লাস্টিক পণ্যের ওপর ভ্যাট দ্বিগুণ করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে চা, কফি কাপ, প্লাস্টিক প্লেট ও বাটির মতো পণ্যের ওপর ভ্যাট বেড়ে ১৫ শতাংশে পৌঁছাবে। এর ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এসব পণ্যের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত পরিবেশবান্ধব এবং প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে তৈরি পণ্যের ওপর কোনো ভ্যাট আরোপ করা হবে না। পরিবেশ সুরক্ষা এমন প্রস্তাব করেছে বলে এনবিআর কর্মকর্তারা মনে করছে। এনবিআর সূত্র বলছে এবারের বাজেটে বেশ কিছু পণ্যের দাম বাড়তে পারে। ব্যবহার কমাতে প্লাস্টিক জাত হোম ও কিচেন ওয়্যারসহ প্লাস্টিক জাতীয় পণ্যের ভ্যাট দ্বিগুণ বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করতে পারে সরকার। হেলিকপ্টার আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশ করা হতে পারে। যার মধ্যে ১০ শতাংশ শুল্ক, ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), ৫ শতাংশ অগ্রিম কর ও ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর থাকছে। এর ফলে হেলিকপ্টারে যাতায়াতে ভাড়া বাড়বে। এ দিকে কনভেনশন হল, কনফারেন্স সেন্টারের সেবার ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তন ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হচ্ছে। এতে বিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের খরচ বাড়বে। একাধিক গাড়ি থাকলে সিসিভেদে ২৫ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত পরিবেশ সারচার্জের বিধান রয়েছে এখন। এটি বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হতে পারে।

কর্মকর্তারা বলছেন, জেনারেটর, ফ্রিজার, এসির ভ্যাট সাড়ে ৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হতে পারে। মোবাইল ফোনের বিভিন্ন উপকরণ- প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড, চার্জার, ব্যাটারি, হাউজিং, কেসিংসহ অন্যান্য উপকরণে ভ্যাট ২ শতাংশের জায়গায় ৪ শতাংশ করা হতে পারে। এলপিজি সিলিন্ডারের ভ্যাটহার বেড়ে ১০ শতাংশ করা হতে পারে।

এবারের বাজেটে বাড়বে বাড়ি নির্মাণের খরচ। সিমেন্টশিট উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ, ফেরো ম্যাঙ্গানিজ ও ফেরো সিলিকো ম্যাঙ্গানিজ অ্যালয় উৎপাদন পর্যায়ে এক হাজার টাকা প্রতি টন থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ২০০ টাকা প্রতি টন করা হতে পারে। ফেরো সিলিকন অ্যালয়ের উৎপাদন পর্যায়ে প্রতি টনে ভ্যাট এক হাজার ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ৫০০ টাকা করা হতে পারে। ক্রেডিট রেটিং এজেন্সির সেবাপর্যায়ে ভ্যাট সাড়ে ৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হতে পারে। লিফট উৎপাদনে ভ্যাট সাড়ে ৭ শতাংশ করা ও নির্মাণ সংস্থার সেবার বিপরীতে ভ্যাট বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হতে পারে। এ ছাড়া বাজেটে ব্লেন্ডার, জুসার, মিক্সার, গ্রাইন্ডার, ইলেকট্রিক কেটলি, আয়রন, রাইস কুকারসহ এ জাতীয় পণ্যে ভ্যাট অব্যাহতি ছিল। আসছে বাজেটে এসব পণ্যে ৫ শতাংশ ভ্যাট বসানো হতে পারে। ফোর স্ট্রোক থ্রি হুইলারের ভ্যাট বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হতে পারে। কটন সুতা, কৃত্রিম আঁশ ও অন্যান্য আঁশের সংমিশ্রণে তৈরি ইয়ার্নের উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট বাড়ানো হতে পারে।

প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারকদের সংগঠন বিপিজিএমইএ সভাপতি সামিম আহমেদের নয়া দিগন্তকে বলেন, ভ্যাট বাড়লে প্লাস্টিক শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিক্রি কমে যাবে, উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। প্লাস্টিকের পণ্য সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে, ফেরিওয়ালারা এসব পণ্য বিক্রি করেন। এ দিকে ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইলেকট্রোমার্টের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল আফসার নয়া দিগন্তকে বলেন, ভ্যাট দ্বিগুণ হলে ফ্রিজের দাম দুই থেকে তিন হাজার টাকা বাড়বে। এ ছাড়া এসির দাম তিন থেকে চার হাজার টাকা বেড়ে যাবে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এখনো ঘুরে দাঁড়ায়নি। এই অবস্থায় এমন উদ্যোগে ক্রেতারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এ দিকে ব্যাংকে জমা টাকার ওপর আবগারি শুল্কের স্তর ও হারে পরিবর্তন আসছে নতুন বাজেটে। এতদিন এক লাখ টাকার বেশি রাখলে আবগারি শুল্ক কেটে নেয়া হতো। এটা বাড়িয়ে তিন লাখ টাকা করা হচ্ছে। ৩ লাখ টাকার বেশি রাখলে ১৫০ টাকা দিতে হবে। জাতীয় সঞ্চয়পত্র কিনতে আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা উঠে যাচ্ছে এবার।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য শুধু কর নয়, সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশকেই সহায়ক করে তুলতে হবে। করপোরেট ট্যাক্স হার না বাড়িয়ে কর ফাঁকি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিনিয়োগকারীদের হয়রানি যেন না হয়, সেজন্য কর প্রশাসন সংস্কার দরকার। তিনি আরো বলেন, বাজেটে এমন কিছু রাখা যাবে না, যা বিনিয়োগকারীদের চোখে অস্পষ্ট বা অনিরাপদ মনে হয়। বরং টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল শিক্ষা, প্রযুক্তি ফান্ড তৈরি, এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য প্রস্তুতি ইত্যাদির মাধ্যমে প্রোডাক্টিভিটি বাড়ানো দরকার।