যুক্তরাষ্ট্রে তৈরী পোশাক রফতানিতে চীনের স্থান দখল করছে বাংলাদেশ

রফতানি কারকরা বলছেন সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না

শাহ আলম নূর
Printed Edition

চীনের তৈরি পোশাক রফতানিতে বড় ধরনের ধসের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত হয়েছে। একসময় মার্কিন পোশাক আমদানির প্রধান উৎস চীন এখন পিছিয়ে পড়ায় বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী হিসেবে জায়গা ধরে রেখেছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিবর্তনের সুবিধা যতটা পাওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে ততটা পাচ্ছে না বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমে যাওয়া, শুল্কের চাপ, অর্ডারের দরপতন এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে চীনের হারানো বাজারের বড় অংশ বাংলাদেশে আসার বদলে বিভিন্ন প্রতিযোগী দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল বা ওটেক্সার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে ৪৬৬ কোটি ডলারের। আগের বছরের একই সময়ের ৪৯৮ কোটি ডলারের তুলনায় রফতানি কমেছে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। শুধু জুলাই মাসে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি কমেছে ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানিও ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমে ৪১৮৩ কোটি ডলারে নেমেছে।

অর্থাৎ, চীনের বাজারে যে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে, তার পুরো সুবিধা বাংলাদেশ পাচ্ছে না। বরং মার্কিন ভোক্তা বাজারে পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়ায় সামগ্রিক বাজারের আকারই ছোট হয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন শুল্কব্যবস্থা। ফলে বাংলাদেশকে একইসাথে চীনের সাথে প্রতিযোগিতা এবং মার্কিন বাজারের সঙ্কুচিত চাহিদার সাথে লড়াই করতে হচ্ছে।

এদিকে চীনের অবস্থানের পরিবর্তন অবশ্য বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনকে ছাড়িয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে আসে। উল্লেখিত সময়ে বাংলাদেশ ১৩৭ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি করলেও চীনের রফতানি নেমে আসে ১১৭ কোটি ডলারে। চীনের রফতানি এক বছরে ৫৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমেছে। তবে একই সময়ে বাংলাদেশের রফতানিও ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমে যায়।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ২০৪ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি করে, যেখানে চীনের রফতানি ছিল ১৭০ কোটি ডলার। কিন্তু পরবর্তী মাসগুলোতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে চীনের কাছ থেকে বাজারের অংশ নেয়া গেলেও সেটিকে দ্রুত রফতানি বৃদ্ধিতে রূপান্তর করা যাচ্ছে না।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন পরিস্থিতির একটি বড় কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতার ধরন বদলে যাওয়া। চীনের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ফলে শুধু বাংলাদেশই নয়, ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ মার্কিন ক্রেতাদের কাছে বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে উঠে এসেছে। ফলে চীনের অর্ডার সরাসরি বাংলাদেশের কারখানায় স্থানান্তরিত হচ্ছে- এমন সরল হিসাব এখন আর খাটছে না।

এদিকে বাংলাদেশের জন্য শুল্কের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি পারস্পরিক বাণিজ্য কাঠামো নিয়ে সমঝোতা হয়। এতে বাংলাদেশী পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক শুল্কহার ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়। একইসাথে বাংলাদেশ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ তৈরি পোশাক ও বস্ত্রপণ্য শূন্য পারস্পরিক শুল্কে প্রবেশের জন্য একটি ব্যবস্থা করার কথা রয়েছে। তবে সেই শূন্য শুল্কের সুবিধা কত পরিমাণ পণ্য পাবে এবং এর বাস্তব প্রয়োগ কিভাবে হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য সুযোগ ও ঝুঁকি পাশাপাশি রয়েছে। চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর বাণিজ্যনীতি অব্যাহত থাকলে মার্কিন ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা বিকল্প উৎসের সন্ধান করবে। কিন্তু সেই বিকল্প উৎসের তালিকায় বাংলাদেশকে টেকসইভাবে শীর্ষে রাখতে হলে শুধু কম উৎপাদন ব্যয় যথেষ্ট নয়। দ্রুত সরবরাহ, পণ্যের বৈচিত্র্য, ছোট ও মাঝারি অর্ডার গ্রহণের সক্ষমতা, মান নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশগত ও সামাজিক কমপ্লায়েন্স এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ- সব ক্ষেত্রেই সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

এদিকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে বৃহৎ আকারে পোশাক উৎপাদনের সক্ষমতা এবং দীর্ঘ দিনের মার্কিন ক্রেতা সম্পর্ক। দেশটির অনেক কারখানা বড় অর্ডার পরিচালনায় অভিজ্ঞ। এ কারণে চীনের বাইরে বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজতে গিয়ে মার্কিন ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। কিন্তু এই সুবিধাকে বাজার দখলে রূপ দিতে হলে ক্রেতাদের প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্যের ধরন ও উৎপাদন কাঠামো দ্রুত পরিবর্তনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানিতে তুলনামূলকভাবে মৌলিক ও বড় ভলিউমের পণ্যের আধিপত্য বেশি। অথচ মার্কিন বাজারে ফ্যাশন পরিবর্তন দ্রুত হচ্ছে এবং ক্রেতারা ছোট সময়ের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের পণ্য সরবরাহ করতে সক্ষম উৎপাদক খুঁজছেন। চীনের বাজার থেকে অর্ডার সরে গেলে তার সবটাই একই ধরনের টি-শার্ট, ট্রাউজার বা সোয়েটারের অর্ডার হবে না। উচ্চমূল্যের ফ্যাশন আইটেম, সিনথেটিক ও ম্যান-মেড ফাইবারভিত্তিক পোশাক এবং বিশেষায়িত পণ্যের চাহিদাও রয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশের দুর্বলতা হলো পণ্যের বৈচিত্র। তুলা-নির্ভর পোশাকের পাশাপাশি ম্যান-মেড ফাইবার, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, স্পোর্টসওয়্যার, আউটারওয়্যার, অন্তর্বাস, ডেনিমের উচ্চমূল্যের পণ্যসহ বিভিন্ন খাতে সক্ষমতা বাড়াতে না পারলে চীনের বাজার সরে যাওয়ার পুরো সুবিধা নেয়া কঠিন হবে। আরেকটি বড় চাপ এসেছে রফতানি মূল্যে। চলতি বছরে জানুয়ারি-জুলাই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং গড় ইউনিট মূল্য কমেছে ২ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ শুধু কম সংখ্যক পণ্য রফতানি হয়নি, একই সঙ্গে প্রতি ইউনিট পণ্যের দামও কমেছে।

নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশের সামনে শুধু ‘চীনের বিকল্প’ হওয়ার লক্ষ্য রাখলেই হবে না; বরং ‘চীনের বিকল্প হিসেবে দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী’ হওয়ার লক্ষ্য নিতে হবে। কারণ চীনের বাজার হারানো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তন এলেও চীনের উৎপাদন সক্ষমতা একদিনে বিলীন হচ্ছে না। দেশটি অন্য বাজারে রফতানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে এবং বৈশ্বিক বাজারে চীনা পণ্যের প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রও চীনা পণ্যের প্রবাহ ঠেকাতে বাণিজ্যিক ও শুল্কনীতিতে আরও পরিবর্তন আনছে।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা পণ্য অন্য দেশের মাধ্যমে পুনরায় প্রবেশ করছে কি না, তা নিয়েও ওয়াশিংটনের নজরদারি বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশী রফতানিকারকদের জন্য উৎপাদনের উৎস, কাঁচামালের উৎস এবং পণ্যের প্রকৃত উৎপত্তি সম্পর্কে স্বচ্ছতা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের জন্য উৎপাদন ও মার্কিন উপকরণ ব্যবহারের সাথে সম্পর্কিত শুল্ক সুবিধার কাঠামো তৈরির উদ্যোগও নিয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, চীনের বাজারে যে পরিবর্তন ঘটছে সেটিকে সাময়িক অর্ডার বৃদ্ধির সুযোগ হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি বাজার পুনর্বিন্যাসের সুযোগ হিসেবে দেখা। ক্রেতারা যদি চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায়, তাহলে তারা একক কোনো দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করবে না। তারা একাধিক দেশে উৎপাদন ভাগ করে দেবে। ফলে বাংলাদেশকে ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সাথে একই সময়ে প্রতিযোগিতা করতে হবে।

বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের (বিএই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, এই প্রতিযোগিতায় শুধু সস্তা শ্রম দিয়ে টিকে থাকা সম্ভব হবে না। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, বন্দরের দক্ষতা, কাস্টমস প্রক্রিয়া দ্রুত করা, সুদের হার ও অর্থায়ন ব্যয় কমানো এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানো জরুরি। একইসাথে পোশাক খাতে প্রযুক্তি ব্যবহার ও অটোমেশন বাড়াতে হবে। তবেই একই সময়ে কম খরচে, কম সময়ে এবং বেশি মানসম্পন্ন পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বর্তমান পরিস্থিতি তাই একইসাথে সম্ভাবনা ও সতর্কবার্তা। চীন পিছিয়ে পড়ায় বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত হয়েছে- এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু জানুয়ারি-জুলাইয়ের হিসাব বলছে, সুযোগ তৈরি হলেও রফতানি আয় বাড়েনি; বরং কমেছে। মার্কিন বাজারের সামগ্রিক সংকোচন এবং মূল্যচাপের কারণে চীনের হারানো অংশের পুরোটা বাংলাদেশ দখল করতে পারেনি।

এদিকে খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন বাংলাদেশের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো, চীনের দুর্বলতাকে নিজের শক্তিতে রূপান্তর করা। এর জন্য শুল্ক সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পণ্যের বৈচিত্র, উৎপাদন দক্ষতা, দ্রুত সরবরাহ এবং উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরির সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তা না হলে চীনের বাজারে তৈরি হওয়া শূন্যস্থান অন্য প্রতিযোগী দেশগুলো পূরণ করবে। আর তখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোশাক আমদানির বাজারে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে থেকেও প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে না বলে তারা মনে করছেন।