কমে যাচ্ছে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি। করোনার পর গত ৫ বছরেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি আর বাড়েনি। স্কুলের খালি বেঞ্চগুলোই প্রমাণ করে আমাদের শিক্ষাকাঠামোর দৈন্যতার চিত্র। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার এই পরিসংখ্যান মাধ্যমিকেই বেশি।
শিক্ষাসংক্রান্ত বিভিন্ন পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের সাধারণ শিক্ষাধারায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবেই কমছে। শিক্ষাবিদদের মতে, এটি কেবল একটি পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন নয়; বরং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও শিক্ষাকাঠামোর জন্য একটি বড় সতর্কবার্তাও।
সাম্প্রতিক সময়ে আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে শুধু শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষার্থী কমছে না, সেই সাথে ব্যাপক পরিবর্তন আসছে আমাদের শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাসেও। পাঠ্যবইয়ের পাতার পরিবর্তে তারা অনেকেই শিক্ষার প্রধান উপকরণ হিসেবে বেছে নিয়েছে মোবাইল বা কম্পিউটারের স্ক্রিনকে। একই সাথে ক্লাস রুমের বাইরে তারা প্রাইভেট কোচিং কিংবা অনলাইন কোচিংয়েও মনোযোগ বাড়িয়েছে। সবমিলিয়ে ক্লাস রুমের বিকল্প হিসেবে একাধিক প্ল্যাটফর্ম শিক্ষার্থীদের হাতে ধরা দিয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) শিক্ষা পরিসংখ্যান প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে মাধ্যমিক পর্যায়ে ১০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী কমেছে। বিশেষ করে করোনা-পরবর্তী সময়ে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পতনের পেছনে একাধিক কারণ একসাথে কাজ করছে।
পরিসংখ্যান বলছে- সাধারণ স্কুলে শিক্ষার্থী কমলেও কারিগরি, মাদরাসা ও ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তুলনামূলক বেড়েছে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণভাবে শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে না; বরং শিক্ষার ধারা পরিবর্তন করছে। চাকরিমুখী শিক্ষা এবং দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের প্রতিও আগ্রহ বাড়ার কারণে অনেক পরিবার সন্তানদের প্রচলিত সাধারণ শিক্ষা থেকে বিকল্প ধারায় নিয়ে যাচ্ছে। অন্য দিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও শিক্ষা সেক্টরে বড় একটি প্রভাব ফেলছে। শিক্ষাবিদদের মতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী দারিদ্র্য ও পারিবারিক চাপে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের আয় বাড়ানোর জন্য অল্প বয়সেই কাজে যুক্ত হতে হচ্ছে। ফলে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি কমছে এবং শেষ পর্যন্ত অনেকে স্থায়ীভাবে শিক্ষা থেকে দূরে চলে যাচ্ছে।
শিক্ষা পরিসংখ্যানের একাধিক সূত্র বলছে সাম্প্রতিক সময়ে আরো কিছু নতুন বাস্তবতা শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার প্রবণতাকে প্রভাবিত করছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, এসএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও টানা দ্বিতীয় বছরের মতো কমেছে। একই সাথে পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। অবশ্য এই বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা বোর্ড তদন্ত শুরু করেছে।
অপর দিকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে শুধু শিক্ষার্থীদের সমস্যা নয়, শিক্ষা পরিবেশের সমস্যাও বড় ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৭১ শতাংশ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর তুলনায় পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট সুবিধা নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ করে কিশোরীদের বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতির ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা। শিক্ষার্থীদের ক্লাস-বিমুখ হওয়ার পেছনে আরো একটি বাস্তবতা হলো শিক্ষাবর্ষের শুরুতে পাঠ্যবই সরবরাহে বিলম্ব। সূত্রমতে বছরের শুরুতে অনেক শিক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে বই হাতে পাচ্ছে না, ফলে পাঠদান কার্যক্রমেও বিঘœ সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষাবিদরা মনে করেন, এ ধরনের প্রশাসনিক দুর্বলতা শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও উপস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ দিকে সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করা শিক্ষার্থীদের মাত্র ৪৪ শতাংশ দশম শ্রেণী পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ বড় একটি অংশ মাঝপথেই শিক্ষা থেকে ছিটকে যাচ্ছে। নিম্ন আয়ের পরিবার, সামাজিক বৈষম্য এবং শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধিকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শিক্ষাবিদদের মতে, কেবল ভর্তি সংখ্যা বাড়ানো দিয়ে এই সঙ্কটের সমাধান হবে না। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা, শেখার পরিবেশ উন্নত করা, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারের জন্য সহায়তা কর্মসূচি বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, দক্ষতাভিত্তিক পাঠক্রম এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক সহায়তার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
শ্রেণিকক্ষের খালি বেঞ্চগুলো শুধু শিক্ষার্থী কমার চিত্র নয়; এগুলো দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে জমে থাকা নানা সমস্যার প্রতিচ্ছবি। এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেয়া না হলে ভবিষ্যতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির পথ আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা এখন শুধু শিক্ষা খাতের নয়, জাতীয় উন্নয়নেরও এটি অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখা দেবে।
ব্যানবেইস থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে মাধ্যমিক স্তরে মোট শিক্ষার্থী ছিল ৯০ লাখ। এক বছরের ব্যবধানে তা কমে দাঁড়ায় ৮১ লাখে। অর্থাৎ শিক্ষার্থী কমে যায় ৯ লাখ। এর পরের বছর অর্থাৎ ২২ সালের ৮১ লাখ শিক্ষার্থী থেকে আরো কমে ২০২৩ সালে সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৯ লাখ ৪০ হাজারে। এভাবে চলতি বছর পর্যন্ত ক্রমাগত কমছেই শিক্ষার্থীদের সংখ্যা। একই সাথে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে উদ্বেগজনকভাবেই কমছে শিক্ষার্র্থীদের সংখ্যা।
সূত্র জানায়, ২০২২ সালে নবম শ্রেণীতে নিবন্ধিত ২২ লাখ ৪৪ হাজার শিক্ষার্থী দুই বছর পর অর্থাৎ নবম এবং দশম শ্রেণী পার হয়ে ২০২৪ সালে এসএসসিতে অংশ নেয় মাত্র ১৭ লাখ ১০ হাজার। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানেই শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় পাঁচ লাখ ৩৪ হাজার। শতকরা হিসাবে যা প্রায় মোট শিক্ষার্থীর ২৪ শতাংশ। একইভাবে গত কয়েক বছরে বিশেষ করে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারেই ক্রমাগত কমেছে। শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার বিভিন্ন কারণ বিষয়ে গণস্বাক্ষরতা অভিযানের প্রধান নির্বাহী রাশেদা কে. চৌধুরী মনে করেন মূলত করোনা-পরবর্তী সময়ে ঝরে পড়ার হার বেড়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো অর্থনৈতিক চাপে শিশুদের স্কুলে ধরে রাখতে পারছে না। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়ে বাড়ায় ইদানীং ক্লাসরুমে শিক্ষার্থী কমেছে।
অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, সাধারণ শিক্ষা থেকে কারিগরি ও মাদরাসাশিক্ষায় স্থানান্তরও স্কুলের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষাথী কমে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ। অনেক পরিবার তুলনামূলক কম খরচের শিক্ষাব্যবস্থা বেছে নিচ্ছে। অপর দিকে বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণকারী গবেষকদের মতে চার বছরে মাধ্যমিকে প্রায় ১০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী কমেছে। গবেষকদের অনেকের মতে শ্রেণিকক্ষের বাইরেও বিকল্প হিসেবে প্রাইভেট কোচিং এবং অনলাইন কোচিংয়ের সম্প্রসারণ হওয়ার কারণে ক্লাসরুমে উপস্থিতি কমেছে।
এ অবস্থায় প্রাথমিকে ক্লাসরুমে শিক্ষার্থী বাড়ানোর জন্য ইতোমধ্যে নানামুখী পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ২০২৫ সাল থেকে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় মিড ডে মিলের মাধ্যমে শিশুদের দুপুরে পুষ্টিকর খাবার যেমন ডিম, কলা, দুধ, বিস্কুট, পাউরুটি দেয়া হচ্ছে। আগামীতে স্কুলব্যাগ এবং শিশুদের স্কুল-জুতাও দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ক্লাসরুম ছেড়ে কোচিং সেন্টারে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ার কারণ হিসেবে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালন অধ্যাপক ড. আযাদ খান নয়া দিগন্তকে জানান, আমাদের অভিভাবকদের মধ্যে সন্তানকে কোচিং সেন্টারে পাঠানো একটি কালচারে পরিণত হয়েছে। বিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনার সঠিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পারলে আবারো ক্লাসরুমের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়বে। তবে কোনো আইন বা নিয়ম করে এটা পরিবর্তন করা যাবে না; বরং সবার মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই আবারো আমাদের ক্লাসরুমগুলো জমজমাট করা সম্ভব হবে।



