স্বাভাবিক হতে যাওয়া পুঁজিবাজার আবারো বড় পতনের কবলে

ডিরেক্ট লিস্টিং নিয়ে অংশীজনদের সাথে বিএসইসির মতবিনিময়

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশায় ছাই ঢেলে আবারো বড় দরপতন ঘটেছে পুঁজিবাজারে। গতকাল দেশের পুঁজিবাজারগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় দরপতনের ঘটনা ঘটে। দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রধান সূচকটির অবনতি ছাড়িয়ে যায় ১০৩ দশমিক ৬৪ পয়েন্ট। অন্য পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে সার্বিক মূল্যসূচকের অবনতি ঘটে ১৯৩ দশমিক ৫৫ পয়েন্ট। দুই বাজারের সবগুলো খাতেই ঢালাও পতন ঘটে শেয়ারদরের। দিনশেষে ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেন হওয়া কোম্পানি ও ফান্ডের ৯০ শতাংশই দরপতনের শিকার হয়।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত সপ্তাহের শেষদিকে এসে সাম্প্রতিক সময়ের ধারাবাহিক পতন সামলে নিয়ে স্বাভাবিক হওয়া ইঙ্গিত দিলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা জন্ম নেয়। সব অংশীজনের প্রচেষ্টায় সাময়িকভাবে পতন থামলে বাজারের বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু সম্প্রতি দেশের রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নতুন করে চিড় ধরে। ফলে রোববার লেনদেনের শুরুতেই বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে বাজারগুলো। লেনদেন যতই এগিয়ে যাচ্ছিল ততই বৃদ্ধি পাচ্ছিল এ চাপ। এক পর্যায়ে তা আতঙ্কে রূপ নেয়। পড়িমরি করে শেয়ার বিক্রির ধুম পড়ে যায় বিনিয়োগকারীদের। এতেই বড় পতন ঘটে দুই বাজার সূচকের।

বিনিয়োগকারীরা গতকালের বাজার আচরণে খুবই হতাশ। গতকাল ডিএসইর বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর ট্রেডিং ফ্লোরে গেলে দেখা যায় বিনিয়োগকারীরা প্রতিযোগিতা দিয়ে শেয়ার বিক্রির আদেশ দিচ্ছেন। এ নিয়ে তাদের বেশ কয়েক জনের সাথে কথা বললে তারা নয়া দিগন্তকে জানান, বাজারে যদি পতন শুরু হয় তা আর থামতে চায় না। তাই যত তাড়াতাড়ি বাজার থেকে বের হয়ে আসা যায় ততই লোকসানের ঝুঁকি কমানো যায়। তাই শেয়ার বিক্রির জন্য এই তাড়াহুড়ো। এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা সামনের বাজার আচরণ নিয়ে প্রচণ্ড হতাশা প্রকাশ করেন। এদিকে দেশী-বিদেশী লাভজনক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মো: মাসুদ খান। প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) পাশাপাশি সরাসরি তালিকাভুক্তি বিধিমালার আওতায় ভালো কোম্পানিগুলোকে বাজারে আসার সুযোগ দেয়ার কথা জানান তিনি। এ ছাড়া একইসাথে আইপিওর মাধ্যমে নতুন শেয়ার ইস্যুর পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের শেয়ারের একটি অংশ বিক্রি করার সুযোগ দেয়ার জন্য হাইব্রিড পদ্ধতির বিধিমালা প্রণয়নের কথাও বিএসইসি ভাবছে বলে জানিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি বিএসইসির সম্মেলন কক্ষে দেশী-বিদেশী কিছু কোম্পানির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সাথে সরাসরি তালিকাভুক্তি বিধিমালা ২০২৬ এর খসড়া নিয়ে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় তিনি এ আহ্বান জানান।

চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সভাপতিত্বে সভায় বিএসইসির কমিশনারগণ, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালকবৃন্দসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) প্রেসিডেন্ট, বিভিন্ন তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানি, মার্চেন্ট ব্যাংক, ইস্যু ম্যানেজার, পেশাজীবী সংগঠন এবং পুঁজিবাজারের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধিরাসহ আরো অনেকে অংশগ্রহণ করেন।

সভায় ইউনিলিভার, মেটলাইফ, নেসলে বাংলাদেশ, বাংলালিংক, কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো), বিকাশ, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস, হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, এসেসন্সিয়াল ড্রাগস, সিনোভিয়া ফার্মাসিউটিক্যালস, নগদ, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই), প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, ডিবিএল গ্রুপ, আবুল খায়ের গ্রুপ, ইউনিক গ্রুপ, কাজি ফার্মস গ্রুপ, কনফিডেন্স গ্রুপ, কনফিডেন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার পিএলসি, বিআরবি ক্যাবলস, এডিসন পাওয়ার, এডিসন ফুটওয়্যার, বোরাক রিয়েল এস্টেট, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি, সিলেট গ্যাস ফিল্ড লিমিটেড, অনন্ত গ্রুপ, এসিআই পিএলসি, নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড, ওয়ালটন, আকিজ রিসোর্সেস, ইমপ্রেস-নিউটেক্স কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড, ন্যাশনাল পলিমার, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, সেভেন রিংস সিমেন্টের শীর্ষ প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।

সভায় ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের খসড়া বিধিমালার ২০২৬ ওপর একটি প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করা হয়। প্রেজেন্টেশনে প্রস্তাবিত রুলসের আওতায় সরাসরি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তির জন্য যোগ্য কোম্পানি, তাদের আবেদন ও তালিকাভুক্তির শর্ত ও প্রাইস ডিসকভারি প্রসেস, ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরা হয়। উপস্থিত অংশীজনদের পক্ষ থেকে খসড়া বিধিমালার বিভিন্ন বিধি ও প্রস্তাবিত ব্যবস্থার বিষয়ে তাদের মতামত, পর্যবেক্ষণ, পরামর্শ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে সক্ষম কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ও বাজারের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার বিষয়ে অংশীজনরা বিভিন্ন মতামত প্রদান করেন।

সভায় বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান অন্যান্যের মধ্যে বলেন, দেশের পুঁজিবাজারে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির সংখ্যা এখনো পর্যাপ্ত নয়। এ অবস্থায় ভালো ও স্বনামধন্য ফ্ল্যাগশিপ কোম্পানিগুলোকে ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে সম্পৃক্ত করে বাজারের গভীরতা ও পরিধি বাড়াতে চায় কমিশন। এর ফলে পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়ার পাশাপাশি দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার এবং বিদেশী বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণের পথও সুগম হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তালিকাভুক্তিতে আগ্রহী কোম্পানিগুলোর উদ্দেশ্যে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে একটি কোম্পানির সুনাম ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায় এবং একটি শক্তিশালী করপোরেট ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। একইসাথে তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে বিভিন্ন কর-সুবিধা, কোম্পানির মূল্য বৃদ্ধি এবং শেয়ারের তারল্য বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়। এতে কোম্পানির সাকসেসররাও তাদের শেয়ার লিকুইড করার সুযোগ বা সুবিধা পান। ভবিষ্যতে কোম্পানির সম্প্রসারণে অতিরিক্ত পুঁজির জোগান পেতেও এটি সহায়তা করবে।

তিনি আরো বলেন, ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের পাশাপাশি কমিশন আইপিও বিধিমালাকেও আরো বাস্তবসম্মত ও কার্যকর করার লক্ষ্যে কাজ করছে। কোম্পানিগুলো যাতে একইসাথে বিদ্যমান শেয়ার অফলোড এবং নতুন শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে হাইব্রিড পদ্ধতিতে পুঁজিবাজারে আসতে পারে, সে বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে ভালো ও যোগ্য কোম্পানিগুলোর বাজারে তালিকাভুক্তির সুযোগ আরো সম্প্রসারিত হবে এবং বাজারে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

সভায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ প্রতিনিধিদের কেউ কেউ ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে এবং কেউ কেউ একইসাথে শেয়ার অফলোড ও আইপিওর মাধ্যমে অর্থাৎ হাইব্রিড পদ্ধতিতে পুঁজিবাজারে আসার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সভায় অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিরা পুঁজিবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্তির বিষয়ে কমিশনের উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং এ বিষয়ে কমিশনকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও মতামত প্রদানের আশ্বাস দেন।