বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথের জমি অধিগ্রহণ ঘুষ-দালালের ফাঁদে মালিকরা

Printed Edition

বগুড়া অফিস

  • ব্যয় দ্বিগুণ বেড়ে ১০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকছে
  • জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া ঘিরে তৈরি হয়েছে চরম অসন্তোষ

উত্তরবঙ্গের যোগাযোগে যুগান্তকারী পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে এগোচ্ছে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প। আগামী নভেম্বর বা ডিসেম্বর মাসে বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ জেলার দু’টি নির্দিষ্ট স্থানে একযোগে এ মেগা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী। প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ইতোমধ্যেই ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণ বাবদ দুই হাজার কোটি টাকা বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের মূল নির্মাণকাজ ২০৩০ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাস্তবায়নের আগেই মূল নকশা ও মেয়াদে পরিবর্তন আসায় প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় পাঁচ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা থেকে প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ১০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকছে। আগামী সপ্তাহে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় সময় বাড়ানো, সংশোধিত বাজেট অনুমোদন ও অর্থনৈতিক অংশীদার নির্ধারণের প্রস্তাব ওঠার কথা রয়েছে।

উন্নয়নের এ কর্মযজ্ঞে বগুড়ায় প্রকল্পটির জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া ঘিরে তৈরি হয়েছে চরম অসন্তোষ। বগুড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি হুকুম দখল (এলএ) শাখায় ক্ষতিপূরণের অর্থ তুলতে গিয়ে দুর্ভোগ ও ঘুষ বাণিজ্যের শিকার হচ্ছেন ভূমিহীন ও সাধারণ জমির মালিকেরা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের সহায়তায় গড়ে ওঠা একটি অসাধু দালাল সিন্ডিকেট ছাড়া টাকা ছাড় করানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখায় প্রতিদিন সকাল থেকে শত শত মানুষের দীর্ঘ ভিড় দেখা মেলে। কেউ নিজ ফাইলের হালনাগাদ জানতে, কেউ প্রয়োজনীয় দলিল জমা দিতে, আবার কেউ বহু কাক্সিক্ষত ক্ষতিপূরণের চেক হাতে পাওয়ার আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। কিন্তু সাধারণ সেবাপ্রার্থীরা সরাসরি টেবিলে গেলে কাগজপত্রের খুটিনাটি অসঙ্গতি ও আইনি জটিলতার অজুহাতে দিনের পর দিন ঘুরানো হয়। অথচ দালালদের মাধ্যমে ফাইল জমা পড়লে বা নির্দিষ্ট হারে টাকা লেনদেন হলে সব বাধা যেন নিমেষেই দূর হয়ে যায়।

ভুক্তভোগীদের দেয়া তথ্যে দুর্নীতির ভয়াবহতার বাস্তব প্রমাণ মিলেছে। বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার আড়িয়া-রহিমাবাদ এলাকার বাসিন্দা আমজাদ হোসেনের প্রকল্পের আওতায় আড়াই শতক জমি ও একটি স্থাপনা অধিগ্রহণ করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী তার প্রায় সাত লাখ টাকা পাওয়ার কথা। তিনি জানান, টানা কয়েক মাস অফিসে ঘুরে দরজায় দরজায় ধরনা দিয়েও তিনি টাকা পাননি। একপর্যায়ে তাকে এক দালালের (মধ্যস্বত্বভোগী) মাধ্যমে জানানো হয়, মোট ক্ষতিপূরণের তিন শতাংশ টাকা কমিশন দিলে কয়েক দিনেই ফাইল নিষ্পত্তি হবে। বাধ্য হয়ে তিনি ঘুষের শর্তে রাজি হওয়ার পরই রাতারাতি তার পড়ে থাকা ফাইলে গতি ফেলে। কয়েক দিনের মধ্যে তার চেক দেয়ার আশ্বাসও দেয়া হয়।

একই উপজেলার রানীরহাট এলাকার রেজওয়ান হোসেনের গল্পটিও একই। তিনি ৯ শতক জমি হারিয়ে গত বছরের ডিসেম্বর মাস থেকেই ৮ ধারা জারির পর ব্যাংকের চেক পাওয়ার আশায় দফতরে ঘুরছেন। অথচ কোনো সুরাহা মেলেনি। তার অভিযোগ, চোখের সামনে প্রতিবেশী এক ব্যক্তি ক্ষতিপূরণের টাকার চার শতাংশ দালালকে ঘুষ হিসেবে দেয়ার পরপরই দ্রুত চেক হাতে পেয়েছেন।

এলএ শাখার অসাধু কর্মকর্তা, কানুনগো, সার্ভেয়ার ও অফিস সহায়কদের সাথে স্থানীয় দালালদের এ গোপন আঁতাতের খবর প্রকাশ্যে আসার পর প্রশাসনও নড়েচড়ে বসেছে। সম্প্রতি জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান এলএ দফতরের সামনে এক ঝটিকা অভিযান চালিয়ে আলী হোসেন নামে এক সক্রিয় দালালকে হাতেনাতে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। এ ঘটনার পর অনিয়মের বিষয়টি নতুন করে জেলাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। একই সাথে সাধারণ মানুষদের সতর্ক করে জেলা প্রশাসনের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে অননুমোদিত আর্থিক লেনদেন এড়িয়ে চলার নির্দেশ জারি করা হয়েছে।

অবশ্য ঘুষ গ্রহণের এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এলএ শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সার্ভেয়ার দাবি করেন, কোনো সেবাপ্রার্থীকে হয়রানি, কখনো উৎকোচ নেয়া বা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত নন। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও বলছেন, ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে দেরি হওয়া ঘুষের সাথে মিলিয়ে দেখা ঠিক না। জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ, কাগজপত্রের অসঙ্গতি, উত্তরাধিকারসংক্রান্ত জটিলতা, মামলা-মোকদ্দমা, জমির শ্রেণী নির্ধারণসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার কারণেও ক্ষতিপূরণের টাকা ছাড়ে সময় লাগে।

বগুড়া জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান জানান, ক্ষতিপূরণ বণ্টনে কোনো প্রকার দুর্নীতি বা অবৈধ লেনদেনের সুযোগ নেই। কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী কিংবা দালালের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ মিললে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।