বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে থাকা এয়ারক্র্যাফটগুলোর মধ্যে ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে দু’টি বোয়িং-৭৩৭ উড়োজাহাজ এবং একটি কানাডার বোম্বাডিয়ার কোম্পানির তৈরি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ। এই তিনটি উড়োজাহাজের মধ্যে আমেরিকার বোয়িং কোম্পানির একটি ৭৩৭-৮০০ এয়ারক্র্যাফট প্রায় এক বছর ধরেই বিমানের হ্যাংগারে অযত্নে অবহেলায় পড়ে আছে। তবে অপর বোয়িং-৭৩৭ উড়োজাহাজ মাঝে মধ্যে ‘জোড়াতালি’ দিয়ে আকাশে উড়লেও সেটি দিয়ে কয়েক দিন ফ্লাইট চলার পর হঠাৎ করেই গ্রাউন্ডেড হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। একইভাবে দীর্ঘদিন ধরে কানাডার বোম্বাডিয়ার কোম্পানির তৈরি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজও দীর্ঘদিন ধরে গ্রাউন্ডেড হয়ে পড়ে আছে।
এভিয়েশনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একাধিক ব্যক্তি নাম না প্রকাশের শর্তে নয়া দিগন্তকে বলছেন, ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে ম্যানটেন্যান্সের ক্লিয়ারেন্স নিয়ে বোয়িং-৭৩৭ আকাশে উড়ার পারমিশন পেলেও এই এয়ারক্র্যাফট নিয়ে যাওয়ার পর ওই ফ্লাইটের পাইলট, কেবিনক্রুদের বেশির ভাগ সময় থাকতে হচ্ছে অজানা আতঙ্কের মধ্যে। ঝুঁকিতে থাকছেন এই ফ্লাইটের যাত্রীরাও। তাদের দাবি, সঠিক ম্যানটেন্যান্স সম্পন্ন করেই তারপর যেন কর্তৃপক্ষ ফ্লাইট চলাচল নিশ্চিত করে।
এসব বিষয়ে জানতে গত দু’দিন ধরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. সাফিকুর রহমানের সাথে বারবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে তার নির্দেশিত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র (জনসংযোগ কর্মকর্তা) বোসরা ইসলামের বক্তব্য নিতে তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনিও টেলিফোন রিসিভ করেননি। যদিও বিমানের নতুন নিয়োগ পাওয়া এমডি যোগদান করার পরই চিঠি দিয়ে তার অধীনস্থ সব শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দেশ দিয়েছেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সম্পর্কিত কোনো ধরনের তথ্য আদান প্রদানে কোনো মিডিয়ার সাথে কেউ কথা বলতে পারবেন না। যদি কোনো কথা বলতেই হয় তাহলে সেটি একমাত্র বলবেন শুধুমাত্র বিমানের জনসংযোগ বিভাগের দায়িত্বশীল মুখপাত্র।
গতকাল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গুরুত্বপূর্ণ শাখার একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি নিজেদের নাম না প্রকাশের শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে যতগুলো লিজ এবং ক্রয় করা উড়োজাহাজ রয়েছে তার মধ্যে দু’টি বোয়িং-৭৩৭-৮০০ এবং একটি ড্যাশ-৮ নিয়ে বিপাকের মধ্যে রয়েছে কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্টরা। দু’টি বোয়িং-৭৩৭ এর মধ্যে একটি হচ্ছে এসএএফএল এবং অপরটি হচ্ছে এসটুএএফএম মডেলের। এর মধ্যে বোয়িং-৭৩৭ (এএফএল) মডেলের উড়োজাহাজটি প্রায় এক বছর ধরেই বিমানের নিজস্ব হ্যাংগারে পড়ে আছে। আসলে এয়ারক্র্যাফটটি যে কবে নাগাদ আবার আকাশে উড়বে সে ব্যাপারে কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না। তারা বলছেন, আরেকটি ৭৩৭-৮০০ (এসটুএএফএম) মডেলের উড়োজাহাজ বিমানের বহরে থাকলেও সেটি বেশির ভাগ সময় জোড়াতালি দিয়ে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটের বিভিন্ন গন্তব্য ফ্লাইট চলাচল করছে। এই এয়ারক্র্যাফট নিয়ে পাইলটরা টেকঅফ করার পরই ওই ফ্লাইটের পাইলট, কেবিনক্রুদের থাকতে হচ্ছে আতঙ্কে। তারপরও তারা চাকরি রক্ষার স্বার্থে বাধ্য হয়ে ফ্লাইট নিয়ে বিভিন্ন গন্তব্য যাচ্ছেন বলে মনের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আর এই বিষয়টি পাইলট কেবিনক্রুদের মধ্যে দীর্ঘদিন থেকেই ওপেনলি বলাবলি হচ্ছে বলে বিমানের বলাকা ভবন সূত্রগুলো জানিয়েছে। গতকাল বিমানের প্রকৌশল বিভাগের একাধিক সূত্র নয়া দিগন্তকে বলেন, ফ্লাইট শিডিউল ঠিক রাখার জন্য বিমান কর্তৃপক্ষ প্রকৌশল বিভাগকে এয়ারক্র্যাফট দ্রুত ম্যানটেন্যান্স করতে বলেন এবং শিডিউল ঠিক রাখতে বলেন। তখন ইঞ্জিনিয়াররা এয়ারক্র্যাফটের ত্রুটি সেরে ফ্লাইট চলাচলের উপযোগী করে ক্লিয়ারেন্স দিয়ে দিচ্ছেন। তবে এক সপ্তাহ না যেতেই ওই এয়ারক্র্যাফট আবারো টেকনিক্যাল হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ। তারা বলছেন, এই এয়ারক্র্যাফট নিয়ে পাইলট কেবিনক্রুরা ফ্লাইটে গেলে তাদের মধ্যে ভয় কাজ করে। অনেকে ফ্লাইটে যেতে অনীহাও প্রকাশ করে। শুধু পাইলট কেবিনক্রু নয়, সাথে সাথে যাত্রীরাও ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। এক প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেন, ধরুন বোয়িং-৭৩৭ (এএফএম) ফ্লাইট নিয়ে দিল্লি অথবা ব্যাংকক গেল। সেটি যে সেখানে যাওয়ার পর টেকনিক্যাল হয়ে যাবে না বা সমস্যায় পড়বে না এর কোনো গ্যারান্টি নাই। এখন কর্তৃপক্ষ এই এয়ারক্র্যাফট দিয়ে অভ্যন্তরীণ রুট চট্টগ্রাম, সিলেটসহ অন্যান্য রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছেন। একই অবস্থা বিমানের বহরে থাকা কানাডার তৈরি এসটুএজিআর মডেলের ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজেরও। এটিও প্রায় এক বছর ধরে বিমানের হ্যাংগারে পড়ে আছে। এখন গ্রাউন্ডেড হওয়া ওই এয়ারক্র্যাফট থেকে পার্টস খুলে এখন অন্য এয়ারক্র্যাফটে লাগানো হচ্ছে বলে তারা জানান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে মোট ২১টি এয়ারক্র্যাফট রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি এয়ারক্র্যাফট হচ্ছে বোয়িং কোম্পানির বোয়িং-৭৩৭-৮০০। এর মধ্যে দু’টি (এসটু-এএইচও এবং এসটু-এএইচভি) বিমানের নিজস্ব কেনা। বাকি চারটি লিজে আনার পর বিমান কর্তৃপক্ষ দু’টি (এসটু-এএফএল ও এসটু-এএফএম) লিজ পিরিয়ড শেষে কিনে নেয়। এই দু’টি এয়ারক্র্যাফট ২০১০ সালে লিজে নিয়েছিল। আর বাকি দু’টি (এসটু-এইকিউ এবং এইডব্লিউ) এখনো লিজে চলছে। গতকাল বিমানের প্রকৌশল বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, এয়ারক্র্যাফটের ম্যানটেন্যান্স সমস্যা বিমানে লেগেই আছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে তারা বলছেন, উড়োজাহাজ আকাশে যতক্ষণ উড়ার কথা তারচেয়ে বেশি চলছে। রেস্ট পাচ্ছে কম। এর মধ্যে টুকটাক সমস্যা যেমন, উড়োজাহাজের ভেতরে সিটের হাতল ভাঙা, কোথাও স্কসটেপ দিয়ে জোড়া লাগিয়ে চলাচল করছে। ফ্লাইটে এসব সমস্যা প্রতিনিয়ত বিদ্যমান থাকায় প্রায় সময় যাত্রীদের গালিগালাজ শুনতে হচ্ছে পাইলট এবং যাত্রীদের সেবা দেয়া কেবিনক্রুদের। এসব বিষয়গুলো কর্তৃপক্ষের এখনই গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত এবং প্রকৌশল বিভাগের দায়িত্বশীলদের এয়ারক্র্যাফটগুলোর সঠিক এবং যথাযথ সি চেক এবং ডি চেক সম্পন্ন করেই যেন তারপর ফ্লাইটের শিডিউল নির্ধারণ করা হয়। তাহলে আর বারবার গ্রাউন্ডেড হওয়ার সমস্যায় পড়তে হবে না বিমান কর্তৃপক্ষকে। পাশাপাশি পাইলট, কেবিনক্রু ও যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রাও নিশ্চিত হবে এবং বিমানের সুনাম বাড়বে বলে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।



