বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সামনে চ্যালেঞ্জ

নতুন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ

নাসির উদ্দিন চৌধুরী
Printed Edition

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে নতুন করে পুনর্গঠন করা হয় কমিশন

সরকার গঠনের প্রায় তিন মাস অতিবাহিত হওয়ার পর পুনর্গঠন করা হয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এবার কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়েছেন খ্যাতনামা চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট মো: মাসুদ খান। ৪ জুন খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে থাকা কমিশনের পদত্যাগের পর সরকার মো: মাসুদ খানকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব প্রদান করেন। তার নেতৃত্বে একই সাথে নিয়োগ দেয়া হয় চার কমিশনারকে যারা একটি কমিশনের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন দিক ও বিভাগে অভিজ্ঞ। ওইদিনই কমিশন তাদের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।

২০১০ সালের পুঁজিবাজার বিপর্যয়ের পর বিভিন্ন মেয়াদে তিনজন চেয়ারম্যান এ দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের মধ্যে দুইজন অধ্যাপক খায়রুল হোসেন ও অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পেয়ে প্রায় ২১ মাস এ দায়িত্ব পালন করা খন্দকার রাশেদ মাকসুদ ছিলেন একজন ব্যাংকার। প্রথম দুইজন রাজনৈতিক সরকারের সময় নিয়োগ পেয়ে তিন মেয়াদেরও বেশি সময় এ দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু এরা দুইজনের কেউই ২০১০ সালের বিপর্যয় পরবর্তী পুঁজিবাজারকে আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে পারেননি। উপরন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছত্রছায়ায় নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অনৈতিক সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে এক প্রকার ধ্বংসস্তূূপে পরিণত করে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে নতুন করে পুনর্গঠন করা হয় কমিশন। ওই সময় রাষ্ট্রীয় পটপরিবর্তনের পর পুঁজিবাজার সংস্কারের বিষয়টিই ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের মাথায়। কমিশন বিভিন্ন সংস্কার কমিটির মাধ্যমে প্রথম থেকেই বিভিন্ন আইনি সংস্কারে মনোযোগ দেয়। বেশ কয়েকটি বিধিবিধানে পরিবর্তনও আনা হয়। আর এটা করতে গিয়ে তারা কোম্পানির তালিকাভুক্তির মতো পুঁজিবাজারের আসল কাজটিই করতে পারেনি। তাদের মেয়াদে একটিও কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। এদিক থেকে কমিশন ছিল পুরোপুরি ব্যর্থ। আর তাদের পরিবর্তন আনা বিধানগুলোও স্টেকহোল্ডারদের একটি অংশের মনঃপূত না হওয়ায় বাজারে দীর্ঘসময় ধরে নেতিবাচক প্রভাব ছিল। এ কারণে বিনিয়োগকারীসহ বেশিরভাগ স্টেকহোল্ডারদের দাবি ছিল কমিশনের পরিবর্তন। অবশেষে ৪ জুন পুনর্গঠন করা হয় কমিশন।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বর্তমানে পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অনেকটা তলানিতে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য নতুন কমিশনের সামনে রয়েছে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। কমিশন কি এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে পুঁজিবাজারকে তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে পারবে?

কমিশনের সামনে এ মুহূর্তে প্রধান চ্যালেঞ্জ কী তা জানতে চাইলে বিশিষ্ট পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, কমিশনের সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ভালো কোম্পানি বাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বাজারের গভীরতা বাড়ানো। এ মুহূর্তে আমাদের পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা হাতে গোনা। বিনিয়োগ করার মতো ভালো কোম্পানি না থাকলে ভালো বিনিয়োগকারী আসবে কেন? বিগত সময়গুলোতেও অনেক কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলেও তার সিংহভাগই এখন অনেকটা অস্তিত্বহীন। অনেকগুলোরই উৎপাদন বন্ধ। কিন্তু বছরের পর বছর এরা বিভিন্ন উপায়ে টিকে আছে। এসব কোম্পানি নিয়েই এখন বাজারে কারসাজি হয়; কিন্তু কারো কিছুই করার থাকে না।

তিনি আরো বলেন, বর্তমান চেয়ারম্যান একজন করপোরেট ব্যক্তিত্ব। তিনি বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজ করেছেন। তিনিই জানেন এসব কোম্পানিকে কিভাবে পুঁজিবাজারে আনা সম্ভব। প্রথম দিন তিনি যে কথাগুলো বলেছেন, পুঁজিবাজারকে দেশী-বিদেশী সব ধরনের বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নিয়ে আসা এবং দীর্ঘমেয়াদে এটিকে দেশের শিল্প ও সেবা খাতের পুঁজির উৎস হিসেবে পরিণত করা। এ কাজগুলো করার প্রথম শর্তই হচ্ছে ভালো কোম্পানির তালিকাভুত্তি যেখানে দেশী- বিদেশী সব ধরনের বিনিয়োগকারী বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায়।

ঢাকা ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম মনে করেন, নতুন কমিশনের সামনে প্রধানত তিনটি চ্যালেঞ্জ। প্রথমটি হলো পুঁজিবাজারকে টেকসই করে গড়ে তোলা। যেকোনো পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজার তার স্বাভাবিক আচরণ ধরে রাখবে। বর্তমানে যে শর্টটাইম ট্রেডিং ও শর্টটাইম মুনাফা লাভের যে সংস্কৃতি সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে পুঁজিবাজারকে বের করে আনতে হবে। পুঁজিবাজার হওয়া দরকার বিনিয়োগের জায়গা। এখান থেকে মানুষ লাভবান অবশ্যই হবে, কিন্তু তা একটি স্বাভাবিক আচরণ মেনে হতে হবে।

দ্বিতীয়ত, তিনি মনে করেন, বাজারের সাপ্লাই সাইড তথা ভালো কোম্পানির অন্তর্ভুক্তি। ভালো শেয়ারের মাধ্যমে বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি করা না গেলে দেশী বা বিদেশী ভালো কোনো বিনিয়োগকারী আপনি আশা করতে পারেন না। আপনি ভালো পণ্যের নিশ্চয়তা দিতে না পারলে কেউ তা কিনবে না। তৃতীয়ত, তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন গুড গভর্নেন্স (সুশাসন)। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, পুঁজিবাজার কর্তৃপক্ষ এবং লিস্টেড কোম্পানিগুলো তিন জায়গায়ই সুশাসনের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে; তা না হলে মুখে যত সুন্দর কথাই বলা হোক না কেন ভালো পুঁজিবাজার অধরা রয়ে যাবে।

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বিশিষ্ট পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ড. মোহাম্মদ মুসা নতুন কমিশন নিয়ে বলতে গিয়ে বলেন, নতুন চেয়ারম্যান একজন করপোরেট ব্যক্তিত্ব। বড় বড় প্রতিষ্ঠানে তার কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি একজন সজ্জন ব্যক্তি। তবে পুঁজিবাজার একটি টেকনিক্যাল জায়গা। বাজারের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরাই কমিশনে থাকা ভালো। অতীতের সরকার শিক্ষকদের এনে এটা চালাতে চেয়েছে কিন্তু পারেনি। কারণ অ্যাকাউন্টসের চেয়ে এখানে ফিন্যান্সের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদেরই এ জায়গায় ভালো করার কথা। এখন কমিশন সব স্টেকহোল্ডারদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে একটি ভালো পুঁজিবাজার উপহার দিতে পারলে বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিন ধরে লালন করা প্রত্যাশা পূরণ হবে।