জনতার কাছে পৌঁছাতে ‘উঠানের রাজনীতি’ এনসিপির

হাসান আলী
Printed Edition
বদলগাছীতে ‘উঠানে রাজনীতি’ কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখছেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন : নয়া দিগন্ত
বদলগাছীতে ‘উঠানে রাজনীতি’ কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখছেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন : নয়া দিগন্ত

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট থেকে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। শুরুর দিকে দলটি দেশের ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেললেও কয়েক মাসের মধ্যেই সেই জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ে। এই ভাটার অন্যতম কারণ হিসেবে দলটির নেতাকর্মীরা প্রান্তিক ভোটার তথা তৃণমূলের মানুষের কাছে না পৌঁছে ঢাকাকেন্দ্রিক রাজনীতিকে চিহ্নিত করেছে। দল হিসেবে নতুন এবং নেতারা সবাই তুলনামূলকভাবে রাজনীতিতে নবীন ও কম অভিজ্ঞ হওয়ায় আরো নানান সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। সেই সীমাবদ্ধতা কাটাতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন চেষ্টা শুরু করেছেন দলটির নেতাকর্মীরা। প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে গত কয়েকদিনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলা ও উপজেলায় পথসভাও করেছেন তারা। এরই ধারাবাহিকতায় এবার আরো কাছাকাছি পৌঁছাতে নতুন এক পদ্ধতি বেছে নিয়েছে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে দলের বার্তা পৌঁছে দিতে এবার দলটি ‘উঠানের রাজনীতি’ শুরু করেছে। ঈদ উপলক্ষে দলটির শীর্ষ নেতারা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকা এবং অন্য নেতারাও তাদের নিজস্ব এবং পাশের এলাকাগুলোতে উঠান বৈঠকের মাধ্যমে মানুষকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এই বৈঠকগুলোতে মূলত তারা গণহত্যাকারী দল হিসেবে আ’লীগের বিচার, দ্রুত সংস্কার, নির্বাচন কমিশন বাতিলসহ নিজেদের দলীয় এজেন্ডাগুলো নিয়ে জনমত তৈরির চেষ্টা করছেন।

এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন উঠানের রাজনীতি নিয়ে বেশ সরব হয়ে কাজ করছেন। তিনি এ নিয়ে বলেন, এনসিপির রাজনীতি এখন মানুষের উঠানে। এসি রুমে যে কণ্ঠস্বর পৌঁছায় না, তার বা তাদের কণ্ঠস্বর রাজনীতির কেন্দ্রে আনার প্রয়াসই এই গণসংলাপ ‘উঠানের রাজনীতি’। পুরনো রাজনৈতিক দলের নেতারা তৃণমূলকে শুধু ভোট ব্যাংক মনে করে। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে জনগণের কাছে তারা পৌঁছান পাঁচ বছরে একবার, ভোট চাইতে, সাথে থাকে অসংখ্য মিথ্যা প্রতিশ্রুতি। গত ১৫ বছর অবশ্য তাও প্রয়োজন হয়নি। আমরা তাদের কাছে গিয়েছি, রাজনৈতিক বক্তব্য দিইনি। উঠানে বসে তারা কি রাজনীতির কথা ভাবেন, তা বুঝতে চেষ্টা করেছি। তাদের সমস্যা শুনেছি। তারা প্রশ্ন করেছেন, আমরা জবাব দিয়েছি। সড়ক অবকাঠামো, চিকিৎসা, কৃষি, শিক্ষা ও বেকারত্ব সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা ও দাবি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বহুবার সরকার পরিবর্তন হয়েছে, তবে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। এনসিপির এই মানুষগুলোর ভাগ্য পরিবর্তনের রাজনীতি করতে হবে। একই উঠানে বসে সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলার এই যে অভ্যাস, এটিই হবে নতুন রাজনীতির সূচনা, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত। ‘উঠানের রাজনীতি’ একটি ধারাবাহিক কর্মসূচি, যার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে জনগণের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন ও মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করবে। এতে করে রাজনীতি হবে আরো স্বচ্ছ, দায়বদ্ধ ও জনমুখী।

গতকালের কর্মসূচির অভিজ্ঞতা জানিয়ে এনসিপির এই যুগ্ম আহ্বায়ক আরো বলেন, ‘উঠানের রাজনীতি’ নিয়ে আমরা গিয়েছিলাম নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর উপজেলার ফাজিলপুর ইউনিয়নের কর্মকার পাড়ায়। যেখানে ৬০-৭০ ঘর পাহান জাতিগোষ্ঠীর বসবাস। সকাল থেকে তারা অপেক্ষা করেছে, ঢাকা থেকে নেতা আসবেন, এনসিপি নামের নতুন রাজনৈতিক দলের নওগাঁর সংগঠকরা আসবেন। রাজনৈতিক বক্তব্য দেবেন। তারা চিন্তিত কোথায় বসতে দেবেন কী সমাচার। নেতারা আসলেন, তাদের কাছাকাছি বসলেন, কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিলেন না, তাদের সমস্যা শুনলেন- এটা তাদের কাছে অকল্পনীয়। নির্বাচন ছাড়া তাদের কাছে কেউ আসেনি, তারা ছিলেন শুধুই ভোট ব্যাংক। তিনি বলেন, এনসিপি এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন চায়। জনগণকে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার মাধ্যমে রাজনীতিবিদদের আমরা প্রশ্ন করা শেখাব। চাঁদাবাজির অর্থ দিয়ে আর ভোট কিনতে পারবেন না। বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদরা, রাজনীতির ধারা পরিবর্তন হবে। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বুঝতে না পারলে সামনের পথটা আপনাদের জন্য কঠিন হবে। জনতার রাজনীতিই জিতবে।

পথসভার পাশাপাশি নিয়মিত উঠান বৈঠক করছেন দলটির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ডা: তাসনিম জারা, সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়কারী আব্দুল হান্নান মাসউদ, যুগ্ম সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল আমিনসহ নেতারা। এই ধরনের কর্মসূচি সামনেও চলমান থাকবে এবং এর মাধ্যমে জনগণের আরো কাছাকাছি যাওয়া সহজ হবে বলেই প্রত্যাশা দলটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের।