ঈদ মানেই আনন্দ। ঈদের শিক্ষা মানুষকে মানবিক মানুষে পরিণত করে। এর মাধ্যমে ধনী-গরিবের বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থার বার্তা আছে। কিন্তু অনেকক্ষেত্রে এর প্রতিফলন দেখা যায় না। ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র কিছু মানুষের অসামাজিক কর্মকাণ্ড ঈদের আনন্দ মøান করে দেয়। আত্মকেন্দ্রিকতা ঈদের উদ্দেশ্য নয়। আনন্দকে সবার মধ্যে বিলিয়ে দেয়াই এর মূল লক্ষ্য। কাজেই আপনাকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত না থেকে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়াই মানবতার লক্ষণ।
মুসলমান সমাজে দু’টি ঈদ- ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এ দ্বিবিধ ঈদ ধর্মীয় উৎসব। অর্থনৈতিক, সামাজিক প্রেক্ষাপটে ঈদুল আজহার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এর মাধ্যমে সামাজিক-সাংস্কৃতিক উপাদানের বিস্তারণ ঘটে। সবার প্রতি সমান অধিকারের বিধান ইসলাম ধর্মে আছে। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আদর্শ চর্চার পথ সুগম করার উপায় এটি। সমাজে স্থিতিশীলতা ও বৈষম্য দূর করার পন্থা। কিন্তু বর্তমানে একটি সুষম সমাজ বিনির্মাণে ঈদুল আজহা কতটা অবদান রাখছে- সে বিষয়টি প্রশ্নসাপেক্ষ।
ঈদ, সংস্কৃতির একটি বড় উপাদান। ঈদ মানে উৎসব, ঈদ মানেই আনন্দ। মুসলমানরা আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়া হিসেবে বিভিন্ন রীতি অনুশীলন করে থাকেন। ঈদ তার মধ্যে অন্যতম। এ আনন্দ ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয় বরং সামাজিক। আর ঈদের উৎসবও সার্বজনীন। তাই ঈদের আনন্দ-উৎসবে সব মুসলিমের অধিকার আছে। ঈদ ও আজহা দু’টিই আরবি শব্দ। ঈদ এর অর্থ উৎসব বা আনন্দ। আজহার অর্থ ত্যাগ বা উৎসর্গ করা। আর এজন্যই কোরবানির ঈদকে ‘ঈদুল আজহা’ বলা হয়। অন্য দিকে ‘কোরবানি’ শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো নৈকট্য অর্জন করা, কারো কাছাকাছি যাওয়া। পারিভাষিক অর্থে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট পশু জবাই করাকে কোরবানি বলে। সব ভেদাভেদ ও মানবীয় হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে দলবেঁধে ঈদের নামাজ আদায় করে পারস্পরিক আলিঙ্গনের পর পশু কোরবানির মাধ্যমে এক মহাউৎসব পালিত হয়, যা সমাজে ভাতৃত্বপূর্ণ সহাবস্থান সৃষ্টি করে।
‘ঈদ’ উৎসবের সূচনা হয়েছে হিজরি দ্বিতীয় সন অর্থাৎ ৬২৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে। জাহেলিয়া যুগে আরবের মক্কায় ‘উকায মেলা’ এবং মদিনায় ‘নীরোজ’ ও ‘মিহিরগান’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অশ্লীল আনন্দ-উল্লাস করা হতো। মদিনায় আগমনের পর মহানবী সা: মুসলমানদের জন্য এসব ক্ষতিকর ও অশ্লীলতামুক্ত স্বতন্ত্র আনন্দ-উৎসবের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। এ জন্য তিনি মুসলমানদের নির্মল আনন্দ উৎসব করতে বছরে দু’টি ঈদ উৎসবের প্রবর্তন করেন। একটি ‘ঈদুল ফিতর’ বা রোজার ঈদ অন্যটি ‘ঈদুল আজহা’ বা কোরবানির ঈদ।
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন, ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানির বিধান নির্ধারণ করে দিয়েছি, যাতে তারা ওই পশুদের জবাই করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। আর তোমাদের প্রতিপালক তো এক আল্লাহই, তোমরা তারই অনুগত হও।’ (সূরা হজ : ৩৪)। মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম (আ:) ও তার পুত্র হজরত ইসমাইল (আ:) এর ঐতিহাসিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কোরবানি ইবাদতের মর্যাদা লাভ করেছে। আল্লাহ ইবরাহিমকে (আ:) পরীক্ষা করার জন্য স্বীয় পুত্রকে কোরবানি করতে বললেন, তখন কোনো সংশয় তথা বিনা প্রশ্নে নিজ স্নেহাস্পদ সন্তানকে কোরবানি করার জন্য প্রস্তুত হন। কিন্তু আল্লাহর আদেশে দুম্বা কোরবানি হয়ে যায়। তারপর থেকে পশু কোরবানির রেওয়াজ চালু হয়। মানবজাতিকে একনিষ্ঠ শিক্ষা দেয়াই হলো এর মর্মার্থ।
‘ভোগে নয়, ত্যাগেই সুখ’- এই নীতি কোরবানির মাধ্যমে পরিস্ফুট হয়। বৃহত্তর জনকল্যাণে ব্যক্তিস্বার্থ বিলিয়ে দেয়ার শিক্ষা দেয় এই কোরবানি। ত্যাগ ও ব্যক্তিস্বার্থ বিসর্জন দেয়া ব্যতীত সমাজ ও সভ্যতা বিনির্মাণ সম্ভব হয়নি কোনোকালে। প্রতীকী কোরবানি হিংসা-বিদ্বেষ ও ভেদাভেদের দেয়ালের কালো পার্থর চুর্ণ করতে সম্প্রীতি ও সহনশীল শিক্ষা দেয়- শোষণমুক্ত সমাজ গঠনে তা কার্যকর ভূমিকা রাখে। ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত প্রতি বছর ঈদুল আজহা আমাদের মধ্যে ফিরে আসে। স্বার্থপরতা পরিহার করে মানবতার কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করা কোরবানির মহান শিক্ষা। মানবিক মূল্যবোধে উদ্ভাসিত ঈদুল আজহা হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-ক্রোধকে পরিহার করে সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় আত্মনিবেদিত হতে আমাদের উদ্বুদ্ধ করে। কোরবানির যে মূল শিক্ষা তা ব্যক্তি জীবনে প্রতিফলিত করে মানব কল্যাণে ব্রতী হওয়ার মাধ্যমে মহান আল্লাহ রাব্বুল আল আমিনের সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ সম্ভব। বিশ্বাসী হিসেবে সে চেষ্টায় নিমগ্ন থাকা প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য। উৎসব সকল ভেদরেখা অতিক্রম করে মানুষকে পারস্পরিক শুভেচ্ছাবোধে উদ্বুদ্ধ করে। মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয় ভ্রাতৃত্বের নিবিড় বন্ধন। সকল দ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, প্রতিহিংসার বিষকে দূরীভূত করে সম্প্রীতির এক স্বর্গীয় অনুভূতি মানুষের মধ্যে জেগে ওঠে। ঈদুল আজহার আত্মত্যাগের শিক্ষা ও আদর্শ বাস্তবজীবনে প্রতিফলিত হয়ে শান্তিপূর্ণ সামাজিক সহাবস্থান নিশ্চিত করতে তাই সহায়ক।
ঈদুল আজহা মানুষের হৃদয়ে আত্মত্যাগের শিক্ষাকে প্রোথিত করে মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে বিশেষ অনুপ্রেরণা দিয়ে থাকে। প্রতি বছর ঈদ মুসলমানদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্প্রতির সংযোগ-মোহনায় দাঁড় করিয়ে সামাজিক মানবতাবোধের শক্তিতে বলীয়ান করে। কোরবানি মুসলমানদের সব কর্মের উদ্দেশ্য ও নিয়ত সম্পর্কে সুস্পষ্টতা দেয়। ঈদুল আজহার সাথে আর্থসামাজিক উন্নয়নেরও বিশেষ সম্পর্কও পরিলক্ষিত হয়। কোরবানি ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ ও খামার ব্যবসায়ীরা বিশেষ পুঁজি বিনিয়োগ করে থাকেন। শুধু ঈদ পূর্ববর্তী এক সাপ্তাহে পশু ও কোরবানির সরঞ্জামাদি ক্রয়-বিক্রয় ও পশুপরিবহন ইত্যাদি খাতে দেশে কয়েক হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়। বিত্তবান মুসলমানদের থেকে দান-সদকার মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের অর্থ নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে হাতবদল হয়। ফলে দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চারিত হয়। ঈদুল আজহা উদযাপনে অর্থনীতিতে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ, শিল্প উপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটে।
ঈদুল আজহার অনেক সময় আমাদের মধ্যে লৌকিকতায় রূপ নেয়। সমাজের কিছু মানুষ লোক দেখানোর জন্য কোরবানির নামে বাহাজ করে। কে কত বেশি টাকার কোরবানি দিয়ে নাম কামাই করবে- তা নিয়ে উন্মাত্ততায় লিপ্ত হয়। এতে করে কোরবানির সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বিঘিœত হয়। অনেকেই আত্মীয়স্বজন, গরিব-অসহায়দের কোরবানির গোশত বিলিয়ে না দিয়ে ফ্রিজে সব গোশত ভরে রাখে। তাতে যোজন দূরে থাকে বিত্তহীনদের হক। কোরবানির নামে এমন পরিহাসে বৈষম্যমূলক সমাজের চিত্র ফুটে ওঠে। কিছু মানুষ গরিব মানুষের অধিকার আদায় না করে ঈদের আনন্দ করতে দেশ ছেড়ে পাড়ি জমান সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, নেপাল, ভুটানসহ বিভিন্ন দেশে। ধনী-দরিদ্রের এ বৈষম্য ঈদ উৎসবের ঐক্য-ভাতৃত্ববোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ঈদের উৎসব উদযাপনের জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উৎসব ভাতা পেলেও দিনমুজুর, কৃষক, রিকশাচালকসহ নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ এসব ভাতা-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অধিকন্তু অন্যান্য পেশার লোকজন কয়েক দিন ঈদের ছুটি ভোগ করতে পারলেও কৃষক-দিনমজুরদের কাজ করতে হয় উৎসবের দিনেও। এ দিকে ঈদের আগে বেতন-বোনাস না পাওয়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনেক শ্রমিক-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের ঈদ উৎসবকে মøান করে। এ ছাড়া বেতনভাতা না পাওয়া (নন-এমপিও) শিক্ষক এবং বেকারদের ঈদ উৎসবের আনন্দ উপভোগ অপূর্ণ থাকে। অন্য দিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার কারাগারে বন্দী এবং নিপীড়িত নেতাকর্মীদের পরিবারের ঈদ কাটে নিরানন্দে। এ ছাড়া হত্যা-খুন-গুম হওয়া পরিবারে ঈদ আনন্দের পরিবর্তে বেদনা নিয়ে আসে। প্রিয়জনদের অনুপস্থিতিতে ঈদের আনন্দ-উল্লাসে তাদের কষ্টের মাত্রা আরো বাড়ে। অধিকন্তু ঈদ পূর্বাপর দুর্ঘটনা ও সহিংসতায় নিহত-আহতদের পরিবারে ঈদের আনন্দের পরিবর্তে বিষাদের ছায়া নেমে আসে। আর ঈদকেন্দ্রিক চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই-রাহাজানি, প্রতারণা-জালিয়াতির ভুক্তভোগীদের ঈদ কাটে চরম দুঃখে। প্রতি বছর দেখা যায় ঈদের আগে কল-কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমিকেরা বেতনভাতার জন্য আন্দোলনে নামে। চরম দারিদ্র্য-ক্লিষ্ট জনগণের জীবনে নেমে আসে বিষাদের ছায়া। ঈদের আনন্দ উপভোগ করার অধিকার সবার। কিন্তু দরিদ্র মানুষ এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। দিনের দিনে আনন্দ তো দূরের কথা দুমুঠো অন্নসংস্থান হয় না অনেকের। পথশিশুরা ব্যস্ত থাকে ছোট-খাটো কাজে। তারা ঈদের সুফল ভোগ করতে পারে না।
দেশের মানুষের শুভেচ্ছা জানান রাজনৈতিক নেতারা। তারা দেশ ও দশের কল্যাণ কামনায় বার্তা প্রেরণ করেন। কিন্তু এর ভিন্নতা লক্ষ করা যায় আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য ও আচরণে। সৌহার্দ্যরে এ পবিত্র উৎসবের দিনেও তারা রাজনৈতিক বিদ্বেষমূলক আচরণ করেন। জাতীয় ঐক্যের বদলে তাদের কণ্ঠে অনৈক্যের সুর ধ্বনিত হয়ে থাকে! সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা জাতিকে আরো হতাশ করছে। রাজনৈতিক এ দুরবস্থার কারণে পবিত্র ঈদের জাতীয় ঐক্য চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে। একদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধŸগতি, সর্বস্তরের দুর্নীতি, রাস্তাঘাটের বেহালদশা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, আর্থসামাজিক বৈষম্যের কারণে এমনিতেই সাধারণ মানুষের ঈদের আনন্দ সীমিত হয়েছে। অন্য দিকে জাতীয় নেতাদের রাজনৈতিক অনৈক্যের কর্মসূচি ঈদের আনন্দকে আরো ম্লান করে দিয়েছে।
সুষম ও বৈষম্যহীন সমাজগঠনে ঈদুল আজহার বিধান মেনে চলা অত্যাবশ্যক। ব্যক্তিগত জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে এ অনুশীলন প্রয়োজন। ইইলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনের জন্য এর নীতি পালনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। সমাজে নীতি ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় কোরবানির তাকওয়া অর্জন করতে হবে। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যমে জীবনকে পরিশুদ্ধ করে মানব কল্যাণে আত্মনিয়োগের বিকল্প নেই। মানুষের মাঝেই স্রষ্টার অস্তিত্ব বিদ্যমান- এ বাণী আত্মস্থ করা প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান ও নীতির পক্ষে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পারে ইসলামী মূল্যবোধকে জাগ্রত করতে। এ বোধ অসাম্প্রদায়িক ও সহনশীল জাতি গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। সমাজ থেকে কদর্য উপাদান বিতাড়িত করে সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠায় করতে পারলেই ঈদুল আজহার কোরবানির সারতা অনুধাবিত হবে।



