‘আমার ক্লাসের বন্ধুদের সবারই স্মার্টফোন আছে। শুধু আমারই নেই। স্কুলে গেলে সবাই আমাকে জ্বালায়। ওদের বাবা-মা ওদেরকে অনেক ভালোবাসে। আমার বন্ধুরা যখন যা চায়, বাবা-মা তা-ই কিনে দেয়। তোমরা আমাকে একটুও ভালোবাসো না। কখনো আদরও করো না। কোনো কিছু চাইলেও দাও না। আমি আর তোমাদের কোনো কিছুই খাব না। আজ থেকে স্কুলেও যাব না!’ কাঁদোকাঁদো স্বরে বলল পলাশ।
মা চামেলি বেগম ঘরের বারান্দায় বসে হাতের কাজ করছিলেন। তিনি কাজ থামিয়ে ছেলেকে কাছে টেনে নিলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত স্বরে বললেন, ‘বাবা, আমার খুব ভালো ছেলে, রাগ করো না। তুমি তো এখনো ছোট। আর কিছু দিন ধৈর্য ধরো। যখন হাইস্কুল পাস করে কলেজে যাবে, তখন আমি তোমাকে একটি ভালো স্মার্টফোন কিনে দেবো, ইনশাআল্লøাহ। এখন ফোন দিলে তোমার পড়াশোনার ক্ষতি হবে। মনোযোগ কমে যাবে। নানা রকম গেমেও আসক্ত হয়ে যেতে পারো। তাছাড়া তোমার বাবার হাতের অবস্থাও এখন ভালো না।
কিন্তু পলাশ মায়ের কোনো কথাই শুনল না। তার মোবাইল ফোন চাই-ই চাই।
অভিমান করে সে নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
ক্ষেতের আঁইল ধরে হাঁটতে লাগল সে। মাঝে মাঝে উদাস চোখে আকাশের দিকে তাকায়। আজ তার কিছুই ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে, মনের আকাশেও যেন মেঘ জমেছে আজ তার।
তখন বর্ষাকাল। আকাশে মেঘের আনাগোনা। কখনো টুপটাপ বৃষ্টি, আবার হঠাৎ রোদের ঝিলিক। চারপাশের মাঠঘাট বৃষ্টির পানিতে থইথই করছে।
আবার বৃষ্টি শুরু হলো। পলাশ দৌড়ে রাস্তার পাশের একটি বড় গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়াল। সেখানে দাঁড়িয়ে সে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ধরতে লাগল। বৃষ্টির সাথে খেলতে খেলতে তার মন কিছুটা হাল্কা হয়ে গেল। এমন সময় তার চোখ পড়ল পাশের পানিভরা জমির দিকে। মনে হলো জমির আঁইল ঘেষে পানির নিচে কিছু একটা নড়ছে। কৌতূহলী হয়ে একটু এগিয়ে গেল সে। দেখে অবাক হয়ে গেল পলাশ।
একটি মা ইঁদুর বারবার পানিতে ডুব দিচ্ছে। তারপর মুখে করে ছোট ছোট ছানাদের তুলে এনে নিরাপদ জায়গায় রাখছে। বৃষ্টির পানিতে ইঁদুরের গর্ত ডুবে গেছে। নিজের জীবন বিপন্ন করেও মা ইঁদুরটি তার সন্তানদের এভাবে বাঁচানোর চেষ্টা করছে।
দৃশ্যটি দেখে পলাশের বুক কেঁপে উঠল।
হঠাৎ তার নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে গেল। অসুস্থ হলে মা সারারাত জেগে থাকে তার পাশে। নিজের কষ্ট ভুলে ছেলের যতœ করে। বাবা-মা কত কষ্ট করে সন্তানের জন্য! মায়ের কথা ভাবতেই পলাশের চোখে জল এসে গেল।
সে মনে মনে ভাবল-
‘মা তো ঠিকই বলেছেন। সামনে আমার পরীক্ষা। এখন স্মার্টফোন পেলে পড়াশোনার ক্ষতি হবে। আমি যদি ভালো রেজাল্ট না করি, তাহলে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন কীভাবে পূরণ হবে আমার?’
নিজের ভুল বুঝতে পারল পলাশ।
সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল-
‘আর কখনো মায়ের কথার অবাধ্য হব না। মায়ের সাথে রাগ করব না। মন দিয়ে পড়াশোনা করব। বাবা-মায়ের কথা শুনব।’
মুহূর্তেই তার মন ভালো হয়ে গেল। সব অভিমান ভুলে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল পলাশ।



